জেলে গেলেন রাগীব আলী

বিশেষ প্রতিনিধি, সিলেট থেকে
সিলেটে দেবোত্তর সম্পত্তির তারাপুর চা-বাগান দখলে জালিয়াতি ও সরকারের এক হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ মামলায় আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে ভারতে পালানো সিলেটের বিতর্কিত শিল্পপতি রাগীব আলী অবশেষ ধরা পড়েছেন। বৃহস্পতিবার সকালে ভারতের করিমগঞ্জ ইমিগ্রেশন পুলিশ তাঁকে আটক করে। সিলেটের বিয়ানীবাজারের শেওলা স্থলবন্দর দিয়ে তাঁকে বাংলাদেশের পুুলিশের কাছে হস্তান্তর করলে তাঁকে দুটো মামলার পলাতক আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ।
সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজ্ঞান চাকমা জানান, রাগীব আলীকে ভারতের করিমগঞ্জ ইমিগ্রেশন পুলিশ আটক করে বাংলাদেশ পুলিশকে অবহিত করে। পরে তাঁকে হস্তান্তর করা হলে সিলেট মহানগর হাকিম আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিলে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হয়।
সিলেটের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মিসবাহউদ্দিন সিরাজ জানান, রাগীব আলীর বিরুদ্ধে বিচার চলমান থাকা সিলেটের মহানগর মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হাজির করা হলে তাঁর পক্ষের আইনজীবীরা জামিন আবেদন করেন। আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারকের দায়িত্বে থাকা সিলেটের অতিরিক্ত বিচারিক হাকিম বেগম উম্মে সরাবন তহুরা জামিন আবেদন না মঞ্জুর করে জেলে পাঠানোর নির্দেশ দেন। রাতে রাগীব আলীকে  
কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
ভারতে রাগীব আলীকে আটক ও হস্তান্তর প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে সিলেটের বিয়ানীবাজার থানার পুলিশ জানায়, করিমগঞ্জের পুলিশ সুপার পিআর করের নেতৃত্বে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) একটি দলসহ বিপুল সংখ্যক ভারতীয় পুলিশ তাঁকে নিয়ে ভারত-বাংলাদেশের শূন্যরেখায় (নো-ম্যান্স ল্যান্ড) পৌঁছান। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের সঙ্গে বিএসএফ সংক্ষিপ্ত একটি পতাকা বৈঠক করে। পতাকা বৈঠক শেষে বেলা ২টা ৪০ মিনিটে রাগীব আলীকে বিয়ানীবাজার থানার ওসি চন্দন কুমার চক্রবর্তীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ সময় বিজিবির একটি দল রাগীব আলীকে ঘিরে রাখে।
রাগীব আলীকে হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় উপস্থিত থাকা কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ওপারে রাগীব আলীর হাতকড়া না থাকলেও বাংলাদেশের পুলিশ তাঁকে হাতকড়া পরিয়ে গাড়িতে তোলে। রাগীব আলী হাতকড়া না পরাতে পুলিশকে অনুরোধ করেন। তিনি তখন বলেন, ‘এইটা (হাতকড়া) লাগবে না, আমি তো পালাবো না…’ বলে আপত্তি জানান। তাঁর আপত্তি না শুনে পুলিশ হাতকড়া পরিয়ে গাড়িতে তোলে।   
ইমিগ্রেশন পুলিশ সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার ভারতীয় সময় বেলা পৌনে ১১টার দিকে রাগীব আলী ভারতের করিমগঞ্জ ইমিগ্রেশনে গেলে কর্তব্যরতরা ভিসার মেয়াদ নেই জানিয়ে প্রথমে তাঁকে আটকে রাখেন। এর প্রায় আধা ঘন্টা পর বাংলাদেশের জকিগঞ্জ ইমিগ্রেনের মাধ্যমে ভারতীয় পুলিশ অবহিত হয় রাগীব আলীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে এবং তিনি পালিয়ে ভারতের করিমগঞ্জে আত্মগোপন করেছেন। তখন তাঁকে বাংলাদেশে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি হিসেবে আটক করা হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা ঝুকিপূর্ণ হওয়ায় তাঁকে করিমগঞ্জ-জকিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পাঠাতে পারেনি ভারতীয় আইনশৃংখলা বাহিনী।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইমিগ্রেশন পুলিশের একজন সদস্য জানান, রাগীব আলীকে দ্রুত বাংলাদেশে প্রেরণে করিমগঞ্জ পুলিশ আগ্রহী ভূমিকা পালন করে। করিমগঞ্জ ইমিগ্রেশনে রাগীব আলীর উপস্থিতির সময় ৫-৬জন ভারতীয় অভিবাসী-আইনজীবী তাঁর সঙ্গে ছিলেন। ওই আইনজীবীরা ইমিগ্রেশন আইনের নানা বিষয় তুলে ধরে তাঁকে দ্রুত বাংলাদেশে পাঠাতে সেখানকার পুলিশকে তাগাদা দেওয়ায় দ্রুত পাঠানো হয়।  
রাগীব আলীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় তাঁর ঠিকানা সিলেটের বিশ্বনাথ হওয়ায় বিয়ানীবাজার থানাপুলিশ পরে বিশ্বনাথ থানাপুলিশে হস্তান্তর করে। বিকেল চারটা ৪০ মিনিটের দিকে কড়া পুলিশ পাহারায় রাগীব আলীকে মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হয়।
গত ১০ আগস্ট রাগীব আলীর সঙ্গে ভারতে পালানো তাঁর ছেলে আবদুল হাই তিন মাস পর গত ১২ নভেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জ ইমিগ্রেশন হয়ে দেশে ফেরার সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। বাবার সঙ্গে দুটো মামলায় আবদুল হাই দ্বিতীয় আসামি।
আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিলেটে দেবোত্তর সম্পত্তির তারাপুর চা-বাগানের জায়গায় বিধি বহির্ভূতভাবে স্থাপনা নির্মাণ করায় ১৯৯৯ সালের ২৫ আগস্ট ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত তৎকালীন সংসদীয় স্থায়ী কমিটি তদন্ত করে সত্যতা পায়। পরবর্তীতে সংসদীয় উপকমিটি চা-বাগানে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থার নেওয়ার সুপারিশ করে। এ সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন সিলেট সদর ভূমি কমিশনার এসএম আবদুল কাদের বাদী হয়ে সিলেট কোতোয়ালি থানায় দুটো মামলা করেন। পরবর্তীতে এ মামলা উচ্চ আদালত থেকে স্থগিত করা হয় এবং পুলিশ তদন্ত করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছিল।
১৯ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ দেবোত্তর সম্পত্তির তারাপুর চা-বাগান পুনরুদ্ধারে রায় দেন। এতে ওই দুটো মামলা সক্রিয় করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়। উচ্চ আদালতের এ নির্দেশনার বিষয়ে গত ১৬ মার্চ সরকারি কৌঁসুলির (পিপি) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সিলেটের মুখ্য মহানগর হাকিম তদন্তের নির্দেশ দেন।
পুলিশের বিশেষায়িত শাখা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) পুনঃতদন্ত করে ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিলে চাঞ্চল্যকর দুই মামলার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১০ আগষ্ট দুজনের বিরুদ্ধে আদালতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলে ওই দিন সন্ধ্যায় রাগীব আলী ও আবদুর হাই পালিয়ে ভারতে চলে যান।
মামলার অপর চার আসামির মধ্যে রাগীব আলীর মেয়ে রোজিনা কাদির ও মেয়ের জামাতা আবদুল কাদির পলাতক রয়েছেন। ভুয়া আমমোক্তারনামার মাধ্যমে তারাপুর চা বাগানের দেবোত্তর সম্পত্তির সেবায়েত সাজা রাগীব আলীর আত্মীয় দেওয়ান মোস্তাক মজিদ গত ১০ অক্টোবর আদালতে আত্মসমর্পণ করে বর্তমানে কারাবন্দী। অভিযুক্ত অপর আসামি তারাপুর চা-বাগানের দেবোত্তর সম্পত্তির সেবায়েত পংকজ কুমার গুপ্ত বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।
মহানগর মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে বিচার চলমান এ দুই মামলার মধ্যে মন্ত্রনালয়ের স্মারক জালিয়াতির মামলার ১৪ জন সাক্ষীর মধ্যে আটজনের সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। আত্মসাৎ মামলাটি আদালতে অভিযোগ গঠনের শুনানির পর্যায়ে রয়েছে।
মহানগর হাকিম আদালতের অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি (এপিপি) মাহফুজুর রহমান জানান, গ্রেপ্তারের পর গত ১৮ নভেম্বর রাগীব আলীর ছেলে আবদুল হাইকে আদালতে হাজির করা হলে তাঁর পক্ষের আইনজীবীরা জালিয়াতির মামলায় পুনরায় সাক্ষ্য গ্রহণের আবেদন করেন। আদালত তা মঞ্জুর করে ৪ ডিসেম্বর মামলার আটজন সাক্ষীকে পুনরায় সাক্ষ্য দেওয়ার তারিখ ধার্য করেন। একই তারিখে আত্মসাৎ মামলার অভিযোগ গঠনের শুনানি হওয়ার কথা বয়েছে।
উল্লেখ্য, সিলেট নগরের পাঠানটুলার উপকণ্ঠে ৪২২ দশমিক ৯৬ একর জায়গা নিয়ে গড়ে ওঠা তারাপুর বাগান পুরোটাই দেবোত্তর সম্পত্তি। ১৯৯০ সালে ভুয়া সেবায়েত সাজিয়ে বাগানটির দখল নেন রাগীব আলী। সেখানে তাঁর ও স্ত্রীর নামে মেডিকেল কলেজ ও নার্সিং কলেজ স্থাপন করেন। হাসপাতাল এলাকার আশপাশের চা-বাগানের জায়গা বিক্রি করেন রাগীব আলী। সেখানে ৭১৫টি প্লটে বাসাবাড়ি রয়েছে।
উচ্চ আদালতের রায়ে তারাপুর চা-বাগান দখল করে গড়ে ওঠা সব স্থাপনা ছয় মাসের মধ্যে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এ নির্দেশনায় সিলেটের জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়ায় গত ১৫ মে চা-বাগানের বিভিন্ন স্থাপনা ছাড়া ৩২৩ একর ভূমি সেবায়েত পঙ্কজ কুমার গুপ্তকে বুঝিয়ে দেয় জেলা প্রশাসন। রায়ের পরবর্তী নির্দেশনা বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসন মেডিকেল কলেজ, হাসপাতালসহ সব অবৈধ স্থাপনা স্থাপনা সরাতে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে।
গণবিজ্ঞপ্তির ওপর আপত্তি জানিয়ে পাঠানটুলা এলাকার স্থায়ী বাসিন্দাদের একটি পক্ষ উচ্চ আদালতে রিট করলে সেটি শুনানির পর্যায়ে রয়েছে বলে জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়।