আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম-৬- নৌকা বাওয়া মরদ লোকের কাম

স্বপন কুমার দেব
হুমায়ুন আহমেদের ‘অয়োময়’ নাটকটি দীর্ঘ দিন বিটিভিতে ধারাবাহিকভাবে প্রচারিত হয়েছিল। সব বয়সের ও সব ধরণের দর্শকরা অতি আগ্রহ নিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো নাটকটি উপভোগ করেছেন। যেমন কাহিনীর বৈচিত্র ও বাঁধন, তেমনি অভিনয়। একটি এপিসোডে একটি বিশেষ পটভূমিতে নৌকা বাওয়ার দৃশ্যে একটি গান গাওয়া হয়েছে। যার প্রথম লাইন ‘নৌকা বাওয়া মর্দ (মরদ) লোকের কাম’। নাটকের অন্যতম নায়ক ছোট মির্জাকে (আসাদুজ্জামান নূর) ইঙ্গিত করে বিশেষ গানটির সঙ্গে নৌকা বাওয়ার দৃশ্যটি চিত্রায়িত হয়। তবে নৌকা বাওয়া বেশ শক্তির ও কৌশলের কাজ এ কথা সত্যি। এখন তো বৈঠার দিন প্রায় শেষ। সবই ইঞ্জিন নৌকা। যেন ‘মন মাঝি তোর বৈঠা নে রে আমি আর বাইতে পারলাম না’। সাদা কিংবা রঙিন পাল তোলা নৌকা, জলের মধ্যে বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, দাঁড় টানার ছন্দময় টান, সব মিলিয়ে ছিল এক মধুর ব্যঞ্জনা। নৌকা মূলত গ্রামের বাহন হলেও আমাদের এই শহরে একদা নৌকার অভাব ছিল না। ছোট শহর। একপাশে বহ্তা সুরমা নদী। অন্যদিকে দিগন্ত বিস্তৃত হাওর। শহরকে দু’ভাগ করে দিয়ে মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া খাল। পুকুর, ডোবা, খোলা প্রান্তর কিছুরই অভাব নেই। কাজেই বর্ষার আগমনে শহরের চারদিক জলে টইটুম্বুর। মাঝে মাঝে শহরের রাস্তাঘাটেও জল। যেন জলের রাস্তা। জলের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে আশপাশ সব নৌকায় নৌকায় জট লেগে যেতো। তখনই শহরের কিশোর তরুণদের মহা আনন্দ। নৌকা বওয়ার সুযোগ যেন হাতের মুঠোয়। নানা ধরণের নৌকা ছিল। ছই তোলা, পানসি, আচ্ছাদন বিহীন খোলা নৌকা ইত্যাদি হরেক রকম। সেই সময় সুনামগঞ্জ শহরে শনিবার ও বুধবার দুই দিন ছিল বাজার বার বা হাট বার। হাটবারে আশপাশের এলাকা থেকে লোকজন বাজার করতে খোলা নৌকা নিয়ে শহরে আসতেন। মামলা মোকদ্দমার লোকজন আসতেন ছই তোলা নৌকা নিয়ে। এতে রান্না করে খাওয়া দাওয়া সহ রাত্রিবাসও হতো নৌকায়। পানসি নৌকাতে জমিদার শ্রেণির লোকেরা আসতেন। শহরের যে কোন জায়গায়ই নৌকা ভিড়িয়ে রাখার অনেক জায়গা ছিল। লোকজন সকালের দিকে নৌকা ভিড়াত আর বাজার শেষ করে আসতে আসতে বিকাল হয়ে যেতো। নৌকা চুরির উপদ্রব ছিল না। লগি পুঁতে নৌকা দড়ি দিয়ে বেঁধে সবাই বাজারে চলে যেতেন। এই সুযোগে কিশোর তরুণেরা এমনকি স্কুল ফাঁকি দিয়ে হলেও পছন্দ মতো খোলা নৌকায় উঠে কচুরিপানা ঠেলে হাওরে ভেসে যেতো। লগি বৈঠা সবই থাকতো নৌকায়। সেই নৌকা বাওয়ার আনন্দ বুঝি কোন কিছুর সঙ্গে তুলনা করা যায় না। নৌকার পেছনের গলইয়ে বৈঠা ধরে ভারসাম্য রক্ষা করাই ছিল আসল কাজ। ভাসমান নৌকার ধর্ম হলো ঘুরতে ঘুরতে এলোমেলো হয়ে যাওয়া। ডাইনে বায়ে পানির মধ্যে বৈঠা চালিয়ে নৌকা সোজা রেখে বাইতে থাকলেই নৌকা সামনে চলতে থাকে। দাঁড় থাকলে তো কথাই নেই। সাধারণত দুই দাঁড় একসঙ্গে টানলেই নৌকা বেশ দ্রুত গতিতে এগিয়ে যায়। নৌকা বাওয়ার মধ্যে যেমন ছিল আনন্দ তেমননি কৃতিত্ব। যেমন পরিশ্রম হতো প্রচুর তেমনি লাগতো খিদে। নৌকা বাওয়া একটি উন্নত মানের ব্যায়াম। আধুনিক যুগে রোয়িং ক্লাবগুলিতে তা স্বীকৃত। নৌকার মালিকরা বাজার থেকে ফিরে আসার আগেই তরুণ-কিশোরেরা নৌকা নিয়ে ফিরে আসতো। আবার দেরি হলেও মালিকরা কিছু মনে করতেন না। তারা জানতেন দুষ্টু ছেলেদের কাজ, কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসবে। একটা অলিখিত বোঝাপড়া ছিল দুই পক্ষের মধ্যে। নৌকায় কলের গান বা গ্রামোফোন রেকর্ডে নিয়ে গান বাজানো ছিল অনেকেরই নেশা। মাঝ দরিয়ায় বৈঠা থামিয়ে চালিয়ে দেওয়া হতো রেকর্ড। দিকভ্রান্ত হয়ে নৌকা ভাসতে থাকে আর সঙ্গে চিরচেনা কোন গান আর সুর। উপরে খোলা আসমান। নিচে দরিয়া। দেহমনে অজানা পুলক। হয়তো অজানা কারো উদ্দেশ্যে প্রথম প্রেম নিবেদন। নৌকা নিয়ে শহুরে আর গ্রামের ছেলেদের মধ্যে অনেক পার্থক্য ছিল। গ্রামের ছেলেরা পরিবেশের কারণে ছোটবেলা থেকেই নৌকা বাওয়ায় পটু হয়ে যেতো। এমনকি গ্রামের মেয়েরাও নৌকা বাইতে পারতো। এখন গ্রামগুলি প্রায় শহর হয়ে গেছে। ইঞ্জিন নৌকায় লগি বৈঠা লাগে না। ভট ভট আওয়াজে পরিবেশ দুষিত হয়ে গেছে। গতি কয়েকগুণ বেড়ে গেলেও অথবা দূরের গন্তব্য নিকটে আসলেও সেই পরিবেশ বান্ধব নৌকা চড়ার নির্মল আনন্দ ও অনুভূতি ম্লান হয়ে গেছে। বলা যায় আগের নৌকা যুগ আর ফিরবে না।
লেখক: সিনিয়র আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক।