বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি মহান স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করেছে। শৃঙ্খলমুক্তির দিনটিতে সারাদেশে ছিল নানা আয়োজন। ২৫ মার্চের কালরাতের দুঃখবহ স্মৃতির দিনটি পেরিয়ে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহর থেকেই শুরু হয়েছিল নানা আয়োজন, নানা অনুষ্ঠান। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধানমণ্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে ওই সময়ের ইপিআরের ওয়্যারলেসের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এরপর দীর্ঘ ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। ২৬ মার্চ ইংরেজিতে ঘোষণা করা সেই বার্তায় বঙ্গবন্ধু দখলদার পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনীকে প্রতিরোধ ও বিজয় না আসা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। অবশ্য এর আগেই ৭ মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) তিনি স্বাধীনতার ডাক দেন এবং অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য সারা জাতিকে আহ্বান জানান।
স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশ ৪৫ বছর অতিক্রম করেছে। পাকিস্তানি বাহিনী মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস সময়ে ৩০ লাখ মানুষকেই শুধু হত্যা করেনি, তারা দেশের অবকাঠামো ধ্বংস করেছে, ধ্বংস করেছে দেশের অর্থনীতিও। সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে বাংলাদেশ উঠে দাঁড়িয়েছে। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করে বলেছিলেন, অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া স্বাধীনতা ফলপ্রসূ হয় না। স্বাধীনতার পর কয়েক দশক ধরে আমরা অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছি। দরিদ্র দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে নিম্ন আয়ের দেশে পৌঁছেছি অনেক আগেই। মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার চেষ্টায় আমরা সচেষ্ট রয়েছি। বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পেরেছে। নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর যে প্রচেষ্টা তা সফল হবে, এমন প্রত্যাশা দেশ-বিদেশের বিশ্লেষকদের।
স্বাধীনতার অর্থ শুধু শৃঙ্খলমুক্তি নয়। স্বাধীনতার রয়েছে বহুমাত্রিকতা। অর্থনৈতিক মুক্তির মধ্য দিয়ে অন্যান্য ক্ষেত্রে সাফল্য লাভের পথ তৈরি হয়। শিক্ষা খাতে, স্বাস্থ্য খাতে আমাদের সাফল্য চোখে পড়ার মতো। দেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। কমেছে শিশুমৃত্যু এবং প্রসূতিমৃত্যুর হার। বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। চাল উৎ্পাদনে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি। তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতি উল্লেখযোগ্য। খেলাধুলা, বিশেষ করে ক্রিকেটে বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে গ্রাহ্যতা অর্জন করেছে। এসব ক্ষেত্রে আমরা আরও এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রায় নিয়োজিত আছি।
অনেক সাফল্যের পরেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রত্যাশিত ফল লাভ থেকে পিছিয়ে রয়েছে। এ কথা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না, সুসংহত গণতন্ত্রই স্বাধীনতার বহুমাত্রিক বিকাশকে নিশ্চিত করে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার জন্য অপরিহার্য। মহান মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার ছিল শোষণমুক্ত, ন্যায়নীতি ও সুশাসনভিত্তিক সমাজ নির্মাণ। এসব ক্ষেত্রে আমাদের আরও দূরত্বের পথ অতিক্রম করতে হবে। উদারনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশকে এমন পর্যায়ে উন্নীত হতে হবে যেখানে মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি মানবিক-সাংস্কৃতিক ধারা বিকশিত হবে। নতুন প্রজন্মকে স্বাধীনতার সুফল পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

