স্টাফ রিপোর্টার
দিরাই উপজেলার গোড়ামারা সাতপাখিয়া প্রকাশিত জারলিয়া নদী জলমহাল দখলকে কেন্দ্র করে বন্দুকযুদ্ধের তিনজন নিহতের ঘটনায় বন্দুকের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলছেন এলাকার লোকজন। সংঘর্ষের পর ওই জলমহালে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বুধবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ।
সংঘর্ষের সময় উভয় পক্ষ অবৈধ বন্দুক ব্যবহার করছে বলে দুই পক্ষেরই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। তবে মালিকানা বন্দুকের পাশাপাশি ১৫-১৬টি অবৈধ বন্দুক সংঘর্ষে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন জলমহালের সাব ইজারাদার দাবিদার যুবলীগ নেতা একরার হোসেন।
পুলিশ ও একাধিক সূত্রে জানা যায়, পুরো ঘটনাটি ঘটেছে বৃহৎ জলমহাল দখল ও মহালের জেলেদের থাকার ঘর (খলাঘর) দখলকে কেন্দ্র করেই। এই জলমহালের দখল ও দখল ঠেকানোকে কেন্দ্র করে গত কয়েক দিন ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছিল উভয় পক্ষ। এর আগে গত ২৬ ডিসেম্বর দুই পক্ষের লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল। সেদিনের সংঘর্ষেও বন্দুক ব্যবহার করা হয়েছিল। মঙ্গলবার বেলা ১১ টায় সাব ইজারাদার যুবলীগ নেতা একরার হোসেনের পক্ষ ও গোড়ামারা সাতপাখিয়া প্রকাশিত জারলিয়া নদী’র বন্দোবস্তধারী দক্ষিণ নাগেরগাঁও মৎস্যজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ধনঞ্জয় দাসের পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে জলমহালের ইজারাদার ধনঞ্জয় দাসের পক্ষের লোকজন লাইসেন্স করা দুইটি বন্দুক ব্যবহার করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার বেশ কয়েকজন লোক জানান, ১৪২০ বাংলা থেকে ১৪২৫ বাংলা পর্যন্ত ৫ বছর মেয়াদে উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতাধীন গোড়ামারা সাতপাখিয়া প্রকাশিত জারলিয়া নদী’র বন্দোবস্তধারী দক্ষিণ নাগেরগাঁও মৎস্যজীবী সমিতি। জলমহাল ইজারা নেয়ার পর সমিতির লোকজনের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছিল। সমিতির সাধারণ সম্পাদক উমেশ দাস জলমহালটি হাতিয়া গ্রামের বাসিন্দা যুবলীগ নেতা একরার হোসেনের কাছে সাব ইজারা দিয়ে দেন। এ ঘটনায় উমেশ দাসকে সমিতি থেকে বহিস্কার করা হয় এবং ধনঞ্জয় দাসকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। পরে আবার নিজেদের ঝামেলা মিটিয়ে নেয় সমিতির লোকজন। কিন্তু একরার হোসেন সাব ইজারা পাওয়ার দাবি নিয়ে জলমহাল দখল করার চেষ্টা করেন। অন্যদিকে সমিতির লোকজন ঐক্যবদ্ধ হয়ে একরার হোসেনকে প্রতিরোধ করে। দখল-বেদখল করাকে কেন্দ্র করেই এই হতাহতের ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়দেরও অভিযোগ, জলমহালে বন্দুক যুদ্ধের সময় লাইসেন্স করা বন্দুকের পাশাপাশি অবৈধ বন্দুক ব্যবহার হয়ে থাকতে পারে। গত ২৬ ডিসেম্বর বন্দুক যুদ্ধের পর ওই এলাকার সকল বন্দুক জব্দ না করায় দিরাই থানা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলছেন তারা।
জলমহালের সাব ইজারাদার যুবলীগ নেতা একরার হোসেন বলেন,‘আমি ওই জলমহালের সাব ইজারাদার। সমিতির সাধারণ সম্পাদক উমেশে দাসের কাছ থেকে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে ১৪২০ বাংলা থেকে ১৪২৫ বাংলা পর্যন্ত ৬ বছরের জন্য আমি ইজারা নিয়েছি। আমার চুক্তিনামা এখনও বাতিল হয়নি। চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও কমিটির পরিবর্তন হলেও চুক্তির মেয়াদকাল বহাল থাকবে।’
তিনি আরো বলেন,‘চুক্তির প্রথম বছর আমি নিরাপদেই মাছ আহরণ করেছি। পরের বছর থেকেই আওয়ামী লীগ নেতা দিরাই পৌরসভার বর্তমান মেয়র মোশারফ মিয়া ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ রায় আমার কাছে ভাগ চায়। এ নিয়ে একাধিক শালিস বৈঠকও হয়। তাদেরকে কিছু ভাগও দেয়া হয়। কিন্তু এবার মোশারফ মিয়া ও প্রদীপ রায় পুরো জলমহালটি দখল করতে চায়। মঙ্গলবার তারা হাতিয়ার আহাদ মিয়া, কুলঞ্জের মাসুক মিয়া, টংঘরের মোস্তফা মিয়া ও পৌরসভার মেয়র মোশারফ মিয়ার বন্দুকসহ আরো ১৫-১৬টি অবৈধ বন্দুক নিয়ে জলমহালে আক্রমণ করে লুটপাট চালায়। বন্দুকের গুলিতে তিনজন খুন হয়। আরো ১১ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন। আমি ন্যায় বিচারে জন্য থানায় মামলা দায়ের করব।’
সাতপাখিয়া প্রকাশিত জারলিয়া নদী’র বন্দোবস্তধারী দক্ষিণ নাগেরগাঁও মৎস্যজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ধনঞ্জয় দাস বলেন,‘একরার হোসেন জোর করে আগের সেক্রেটারী উমেশের কাছ থেকে চুক্তিনামায় স্বাক্ষর নিয়েছিল। সেই চুক্তিনামা আদালতের মাধ্যমে বাতিল করা হয়েছে। একরার হোসেন এখন বন্দুক দেখিয়ে জোর করে জলমহাল দখল করতে চায়। গত মাসে একবার চেষ্টা করেছিল। সর্বশেষ মঙ্গলবার একরার হোসেন, তার ভাই-ভাতিজা বন্দুকসহ নানা ধরনের অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়।’
দিরাই পৌরসভার মেয়র মোশারফ মিয়া বলেন,‘একরার হোসেনের সব অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট। আমরা শুনেছি একরার হোসেন বন্দুক নিয়ে তার দলবল সহ জলমহালে গুলি করেছে। আমি ওই জলমহালের মালিক নই, আমি এই বিষয়ে কিছুই জানি না। আমি বন্দুক নিয়ে জলমহালে যাই নি। মঙ্গলবার আমার পৌরসভায় সকাল থেকে পরিষদের সভা চলছিল। আমি ওখানে যাই কীভাবে ?’
পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ জানান, সংঘর্ষে ইজারাদার সমিতির পক্ষে মাসুক মিয়া ও গোলাম মোস্তফা নামের দুই জনের বন্দুক ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। বন্দুক দুইটি জব্দ করা হয়েছে । দু’টি বন্দুকই পরীক্ষা করা হবে। উভয় পক্ষ থানায় মামলা দায়ের করবে বলে জানিয়েছেন। যদি কোন পক্ষই মামলা দায়ের না করে তাহলে পুলিশের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হবে। এছাড়া সংঘর্ষে অন্য কোন অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে কিনা তা তদন্ত করে দেখা হবে। ’
উল্লেখ্য, মঙ্গলবার দিরাই উপজেলার গোড়ামারা সাতপাখিয়া প্রকাশিত জারলিয়া নদী’র দখল নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে বন্দুকের গুলিতে এক পক্ষের ৩ জন নিহত ও বেশ কয়েক জন আহত হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের গায়ে বন্দুকের গুলির চিহ্ন রয়েছে। নিহতরা হলেন, তাজুল ইসলাম (৩২), শাহারুল মিয়া (২৮), ও উজ্জ্বল মিয়া (২৫)। নিহত তাজুল হাতিয়া গ্রামের সানউল্লা’র ছেলে। শাহারুল ইছাক আলীর ছেলে ও উজ্জ্বল মিয়া আমান উল্লাহ’র ছেলে। শেষ দুইজনই আকিলনগর গ্রামের বাসিন্দা। এছাড়া বন্দুকের গুলিতে আরো ১১ জন আহত হয়। আহতরা বর্তমানে সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন। ’


