অ্যাড. মো: আমিরুল হক
আমি ব্যথিত কিন্তু বিস্মিত হইনি। আমি লজ্জিত কিন্তু মেনে নিতে বাড়াবাড়ি করিনি, যার জন্য এই ব্যথা, এই লজ্জা যার কাছে আমি লজ্জিত, ক্ষমা প্রত্যাশী। তার সাথে আমার কোন সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। তার সাথে সব কিছুই উল্টা রথে চলেছি হয়তো। যেমন ধর্মীয় মতাদর্শে, রাজনৈতিক মতাদর্শে ছিলাম উল্টা পথে। সব কিছুর পরও আমি তাকে বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান সহ একজন জাতীয় নেতা হিসাবে মানতাম। সেই তিনিই গত কিছুদিন আগেও আমাদের মাঝে ছিলেন, আর রবিবার এই সময়ে আমাদের কর্মস্থল আদালত প্রাঙ্গণ ত্যাগ করে গেলেন। তবে হাস্যজ্জল মুখে গাড়ির সিটে বসে নয়, গেলেন নি:শব্দে কফিনে করে। পেশাগতভাবে প্র্যাকটিস না করলেও তিনি ছিলেন আমাদের স্বগোত্রীয় ভাই। আমাদের আইনজীবী সমিতির চলমান প্রথা হিসাবে অদ্যবধি চালু আছে যে, আমি কিংবা আমার মত যে কোন মধ্যবিত্ত শ্রেণী বা সর্ব ক্যাটাগরীর একজন আইনজীবী যদি কাল মারা যেতেন তাহলে আজ আদালতের কাজ বন্ধ থাকত এবং ডেথ রেফারেন্স হত কিন্তু অ্যাড. সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জন্য আমরা তা করতে পারিনি, যদিও আমার মত ক্ষমতাহীন অনেক আইনজীবীর ইচ্ছা ছিল, যদিও কোন আদালতে মূলত সরব কাজ ছিল না। তথাপিও আমরা ঐ নেতার জন্য আখেরী সুযোগটা সর্বশেষ সম্মাননা দিতে ব্যর্থ হয়েছি সে ক্ষেত্রে বাধার প্রাচীর হিসাবে ব্যবহৃত হল স্থানীয় বারের সংবিধান। তিনি অ্যাডভোকেট সাথে ছিল অসংখ্য উপাধি, তিনি জাতীয় নেতাই ছিলেন না, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের যে সংবিধানÑ এর রচয়িতাদের একজন ছিলেন। আমাদের ব্যবহৃত আইনের মাঝে তার স্পর্শ আছে অনেক ক্ষেত্রে। সংবিধান যা একটা জাতি কিংবা সমাজের পথ প্রদর্শক হিসাবে সমাদৃত কিন্তু যার সৃষ্টি মানুষেরই প্রয়োজনে। কিন্তু সংবিধান মানুষের প্রয়োজনে সৃষ্টি হলেও সে আজ তার মর্যাদা রাখতে সম্পূর্ণ রূপে ব্যর্থ হয়ে কতিপয় স্বার্থন্বেষী মানুষের স্বার্থের হাতিয়ার রূপে পরিচিতই বেশী। তাই এক জীবনের সমস্ত হাহাকার বুকে নিয়ে আমি অস্পষ্ট চিৎকার করে বলি, দোহাই আমাদের সংবিধানের দরকার নাই, যদি না সেটা স্বপ্ন পূরণ করতে পারে। সবিধানের রচয়িতাদেরই একজন যখন চলে গেলেন, স্পর্শের বাহিরে তৎক্ষণাৎই তাকে অপ্রয়োজনীয় ভেবে পূর্ণ সম্মান দিতে ব্যার্থ হলাম। সংবিধানেরই দোহাইয়ে এই সংবিধান ব্যবহার করে সরকার গঠন করে আর ক্ষমতায় গিয়ে ভিন্ন মতাবলম্বীদের নাম নিশানা মুছতে যায়। আমার ধর্মীয় অনুশাসনে যে কোন মানুষ মরে গেলে তার সম্পর্কে সমালোচনা নিষিদ্ধ, আলোচনা শ্রেয়। তিনি দেশের এজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ছিলেন, এটি আমার মূল্যায়ন নয় বরং তিনি ছিলেন সুনামগঞ্জী, সেখানেই আমার দায়। আর তাই আমি ব্যথিত, তার জন্য একটি দিন উৎসর্গ করলে এমন কোন ক্ষতি ছিল কি? আমি ব্যথিত হই, শেখ মুজিব কে বঙ্গবন্ধু বলতে যারা সংকোচতা করেন, জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধে অবদান যারা অস্বীকার করেন, ব্যথিত হই যখন দেখি মানুষের কল্যাণে নিবেদিত সাইফুর রহমান স্যারের নাম মুছার অপচেষ্টা করা হয়। ব্যথা পেয়েছিলাম সুরমা ব্রীজের উদ্বোধনের দিনই যখন আসপিয়া চাচাকে বারের বারান্দায় একা বসে থাকতে দেখি, আর আজকের ব্যথায় আমায় মনে করিয়ে দেয় আমাদের সব সংকীর্ণতার কথা, যেগুলো বাদ দিতে পারলে রাজনীতি, সমাজনীতি অন্য রকম সুন্দর হতে পারত। সমাপনী বক্তব্যে বলতে চাই সিলেট বিভাগের সিলেটিদের উদ্দেশ্যে ‘আমাকে জানাইও যদি তোমাদের সন্ধানে থাকে’ সেই সব ব্যক্তিত্বÑ বরুণ রায়, সাইফুর রহমান, সামাদ আজাদ, হুমায়ূন রশিদ এদের মত কোন নেতৃত্ব আছে কি? আসবে কি? আমি পাই না।
লেখক: আইনজীবী
- ‘শিক্ষাকে মুনাফা তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবেন না’
- চালের ব্যাপক মূল্য বৃদ্ধি দ্রুত বাজার নিয়ন্ত্রণ জরুরি


