১৯৫২ সনের পর ইতোমধ্যে ৬৫ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। সময়ের এই বিশাল পরিসরে সামাজিক রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ঘটেছে বহু যুগান্তকারী ঘটনা। কিন্তু এতসব সত্বেও মহান একুশের যে চেতনা বাঙালি হৃদয়ে প্রোথিত তার এতটুকু ম্লান হয় নি। আজও আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি… গানের সুরে রক্তে দোলা দেয়, প্রাণে শিহরণ তুলে, আবেগে ভারাক্রান্ত করে প্রতিটি বাঙালিকে। বাঙালি জাতিসত্বা ও একুজ আজ এক ও অবিভাজ্য সত্বায় পরিণত হয়েছে। বাঙালি ইতিহাসে এমন এক কালজয়ী দিবস আজ। আমাদের প্রাণের অর্ঘে সাজানো হৃদয়ের ভালবাসায় সিক্ত মহান শহীদ দিবস যা এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত; সেই মহান একুশের প্রভাতে আমরা অমর ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি জানাই অশেষ শ্রদ্ধা।
বাঙালি জাতিসত্বার প্রথম উন্মেষের চিহ্ন ভাষা আন্দোলন। জাতি হিসেবে নিজেদের পরিচয়ের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে একুশ। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার প্রগতিশীল যে চেতনা তার নাম একুশ। একুশের কালজয়ী চেতনাই পরবর্তী সময়ে আমাদের নিয়ে গেছে স্বাধীকার স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে। ভাষার প্রশ্নে বাঙালির ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে না পারা গেলে অবধারিতভাবেই পরবর্তী রাজনৈতিক স্তরগুলো অতিক্রম করা হয়ে উঠত বরফ শীতল দীর্ঘ পথ অতিক্রমের মতো দুঃসাধ্য। তাই ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমরা নিজেদের খুঁজে ফিরি একান্তভাবে। আমরা বসন্তের রঙে রঙিন হওয়ার পাশাপাশি ভিতরের গর্বটুকুকেও শাণিত করি। ভাষা আন্দোলন মাতৃভাষার প্রশ্নে গড়ে উঠলেও এটির বহুমাত্রিক প্রকাশ ও গুরুত্ব একইসাথে এই জাতির প্রেরণার উৎস। এমন এক দিবসকে সামনে রেখে আমরা বাঙালি এবং বিশ্ব মানবতার প্রতি জানাই আমাদের অকৃত্রিম ভালবাসা।
৬৫ বছরে বাংলা ভাষার মর্যাদার প্রশ্নে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। যে সব জায়গায় এখনও বাংলাকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করা যায় নি সেখানেও কাজ চলছে। উচ্চ শিক্ষা ও উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষা চর্চার বিষয়ে দায়িত্বশীলরা খুব সজাগ। সুতরাং বাংলা মায়ের গরবিনি সন্তানরা নিজ ভাষাকে অবহেলা করছে, এমন অভিযোগ উঠানোর কোন ফুরসৎ এখন আর নেই। তবে বাংলা ভাষাকে আরও সমৃদ্ধ এবং আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার কাজ করে যেতে হবে আমাদের। একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উপরই বর্তেছে এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে অবহেলা করার অর্থ হবে ঐতিহাসিক মূঢ়তা মাত্র।
সাহিত্য-সংস্কৃতির মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের ভূমিকাটি ক্রমশ গৌণ হয়ে উঠছে কিনা পাশাপাশি এই জায়গায় পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান মুখ্য হয়ে উঠছে কিনা এমন একটি প্রশ্ন ইদানীং উঠা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠার অনেক সংগত কারণও রয়েছে বৈকি। আমরা অবাক বিষ্ময়ে লক্ষ্য করছি বিগত বছর কয়েক যাবৎ কেন জানি সাহিত্যক্ষেত্রে আমরা প্রায় বন্ধ্যা সময় পারি দিচ্ছি। সৃষ্টি হচ্ছে না মহৎ কোন কবিতা, উপন্যাস, নাটক, গল্প কিংবা অনুবাদ সাহিত্য। আর ঠিক এই জায়গায় পশ্চিমবঙ্গের সক্রিয়তা অনেক বেশি লক্ষণীয়। বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করতে হবে আমাদের। বাংলা একাডেমি যে গ্রন্থমেলার আয়োজন করে চলেছে তা ক্রমশ জৌলুষ হারাচ্ছে। মনোযোগ আকর্ষণে ব্যর্থ হচ্ছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের। বরং আমাদের বইয়ের বাজার ক্রমশ ভারতীয় লেখকদের দখলে চলে যাচ্ছে। দেশপ্রেমিক এবং আত্মমর্যাদার প্রশ্নে এই জায়গায় আমাদের ভীষণ পীড়িত করে।
প্রতিটি একুশ আসে নতুন উদ্দীপনা নিয়ে। একুশের মধ্য দিয়ে আমরা যে নির্মল বায়ুতে প্রাণ জুরাই তার রেশ ধরে সর্বত্র আত্মজাগৃতির বিকাশ ঘটুক ব্যাপকভাবে এই আমাদের কামনা।

