বিশেষ প্রতিনিধি ও আবু হানিফ, দিরাই
সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) উপ-নির্বাচনের প্রচারণা শেষ। সুনামগঞ্জ, সিলেটসহ দেশের রাজনীতি সচেতনদের নজর প্রয়াত জাতীয় নেতা ৮ বারের সংসদ সদস্য সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের নির্বাচনী এলাকা দিরাই-শাল্লার দিকে। শেষ মূহূর্ত (২৮ মার্চ সকাল ৮ টা পর্যন্ত) পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেনসহ কেন্দ্রীয় ও জেলা নেতৃবৃন্দ নৌকার পক্ষে প্রচারণায় ছিলেন। অন্যদিকে, এই নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ছায়েদ আলী মাহবুব হোসেন রেজু’র পক্ষে আওয়ামী লীগের একটি ক্ষুদ্রাংশ এবং জেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক নাছির উদ্দিন চৌধুরী প্রকাশ্যে প্রচারণা চালানোয় প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ যে অবস্থার তৈরি হয়েছিল প্রচারণার মাঝামাঝি পর্যায়ে এখন সেই জায়গায়ও ভাটা পড়েছে। প্রচারণাপর্বের শেষ সময়ে নাছির চৌধুরীসহ বিএনপি নেতৃবৃন্দকে রেজুর পক্ষে তেমন সক্রিয় দেখা যাচ্ছে না। এরকম অবস্থায় ৩০ মার্চের নির্বাচনে জয়া সেনগুপ্তার জয়ের পাল্লাই ভারী বলে মনে করছেন অনেকে।
তবে নির্বাচনে দুই প্রার্থীই জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। যদিও স্থানীয় রাজনীতিবিদদের একটি বড় অংশের দাবী এই আসনে ১৯৭০’র নির্বাচন থেকে শুরু করে বরাবরই বিপুল ভোটের ব্যবধানে সুরঞ্জিত জয়ী হয়েছেন। একবার (১৯৯৬ সালে) দলীয় কোন্দলের শিকার হয়ে মাত্র ৫০০ ভোটের ব্যবধানে নাছির উদ্দিন চৌধুরী’র কাছে হেরেছিলেন সুরঞ্জিত। পরে আবার উপ-নির্বাচনে পার্শ্ববর্তী নির্বাচনী এলাকা আজমিরিগঞ্জ-বানিয়াচং থেকে এমপি নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টাও হয়েছিলেন সুরঞ্জিত। এবার সুরঞ্জিতের মৃত্যুর পর ভোটারদের সহানুভূতি আরও বেশি এই পরিবারের প্রতি। তাঁর স্ত্রী উচ্চ শিক্ষিত বিনয়ী ড. জয়া সেন গুপ্তার প্রতিও দিরাই-শাল্লার অনেকেরই ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে। সব মিলিয়ে নির্বাচনী হিসাব নিকাশে ড. জয়ার পাল্লাই ভারী বলছেন নির্বাচনী এলাকার বিশিষ্টজনেরা।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের মৃত্যুর পর এই আসনের উপ-নির্বাচন ঘোষণা করা হয়। নির্বাচনে অংশ গ্রহণের জন্য আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চান- প্রয়াত জাতীয় নেতা সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের স্ত্রী ড. জয়া সেন গুপ্তা, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান, আব্দুস সামাদ আজাদের পুত্র আজিজুস সামাদ ডন, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ছাত্রনেতা তালেব উদ্দিনের ভাই অ্যাড. শামছুল ইসলাম, যুক্তরাজ্য আওয়ামী আইনজীবী সমিতির নেতা ব্যারিস্টার অনুকূল তালুকদার ডাল্টন, শাল্লার সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অবনী মোহন দাস ও প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতা শামছুল ইসলাম। ড. জয়া সেন গুপ্তাকে মনোনয়ন দেবার পর আজিজুস সামাদ ডন ছাড়া মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সকলেই শেষ মূহূর্তে হলেও ড. জয়া সেন গুপ্তার পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন।
এই আসনে জাসদ (ইনু), জাসদ (আম্বিয়া), জাপা ও স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ ৫ জন মনোনয়ন দাখিল করলেও নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত দল না হওয়ায় বাছাইয়ে জাসদ (আম্বিয়ার) মনোনীত প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়। পরে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে জাপা ও জাসদ (ইনু) মনোনীত প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। জাসদের মনোনয়ন প্রদানকারী দুই প্রার্থী এবং জাপার প্রার্থীও ড. জয়া সেন গুপ্তাকে ভোট দেবার আহ্বান জানিয়েছেন। এই অবস্থায় নির্বাচনে ড. জয়া সেন গুপ্তার পাল্লাই ভারী। তবে বিএনপি’র নাছির উদ্দিন চৌধুরী এবং স্থানীয়ভাবে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমানের ঘনিষ্টজন হিসাবে পরিচিত দিরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আলতাব উদ্দিনসহ দলের একটি ক্ষুদ্রাংশ স্বতন্ত্র প্রার্থী ধনকুবের ছায়েদ আলী মাহবুব হোসেনকে সমর্থন দেওয়ায় নির্বাচন কিছুটা হলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা পূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
অবশ্য জেলা বিএনপি’র সভাপতি নাছির উদ্দিন চৌধুরী প্রচারণার মধ্য পর্যায়ে নৌকায় ভোট না দিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে ভোট দেবার কথা বলেছেন। আবার দিরাই বিএনপি’রই অপরাংশ (জেলা বিএনপি’র সাবেক সহসভাপতি শহীদ চৌধুরী’র অংশ) এক তরফা নির্বাচনে বিএনপি’র ভোটারদের কোনভাবেই অংশ না নেবার আহ্বান জানিয়েছে। এই অংশের নেতা দিরাই উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক, পৌর বিএনপি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির মঙ্গলবার বিকালে বলেছেন, ‘নাছির উদ্দিন চৌধুরী স্ববিরোধিতা করছেন, দলকে বিতর্কিত করছেন, বিএনপি নেতা কর্মীরা তাঁর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে।’
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমন বলেছেন,‘জেলা আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ট আলতাব উদ্দিনসহ সংগঠনের একটি ক্ষুদ্র অংশ প্রচারণায় শেষ সময় পর্যন্ত প্রকাশ্যে নৌকার বিরোধিতা করেছে। আমরা অনেক চেষ্টা করেও তাদের ফেরাতে পারিনি। ইনশাল্লাহ্ এসব প্রতিবন্ধকতায় নৌকার বিজয় ঠেকানো যাবে না। অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে এবার বেশি ভোট পেয়ে ড. জয়া সেন গুপ্তার নৌকা বিজয়ী হবে।’
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান বলেন,‘আলতাব উদ্দিন, লাভলুসহ কয়েকজন প্রকাশ্যে নৌকার বিরোধিতা করলেও জাহাঙ্গীর একরার এরা কারোরই প্রচারণায় অংশ নেয়নি। দিরাইয়ের বিতর্কিত নেতা প্রদীপ ও মোশারফের জন্য কিছু কর্মী বিরোধিতা করছে। শেষ মূহূর্তে শাল্লায় আমি সমাবেশ করায় দলীয় প্রার্থীর অবস্থা অনেক ভাল হয়েছে। ইনশাল্লাহ্ নৌকা বিজয়ী হবে।’
এই উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী’র নির্বাচন সমন্বয়কারী সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক বলেছেন,‘কোন ষড়যন্ত্র, সাম্প্রদায়িক প্রচারণা দিয়ে দিরাই-শাল্লায় নৌকার বিজয় ঠেকানো যাবে না। মানুষ জননেত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের প্রতি আস্থাশীল, প্রয়াত নেতা সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। বিধায় জয়া সেন গুপ্তা লক্ষাধিক ভোট বেশি পেয়ে বিজয়ী হবেন ইনশাল্লাহ্’।
এদিকে, দিরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি স্বতন্ত্র প্রার্থী ছায়েদ আলী মাহবুব হোসেন রেজু’র সমর্থক আলতাব উদ্দিন বলেছেন,‘যে যাই বলেন না কেন। সিংহ মার্কার জয়ের ব্যাপারে আমরা আশাবাদী।’
আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ড. জয়া সেন গুপ্তা জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন,‘নির্বাচিত হলে আমি আমার স্বামীর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার চেষ্টা করবো। আমার স্বামী যেমন দিরাই-শাল্লার মানুষের সুখে-দুঃখে দাঁড়িয়েছেন। ঠিক তেমনি দাঁড়াবো আমিও। আওয়ামী পরিবারকে ঐক্যবদ্ধ করে জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করবো।’ তিনি অন্য প্রার্থী’র বিরুদ্ধে শেষ মূহূর্তে টাকা ছড়ানোর অভিযোগ তুলেছেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. ছায়েদ আলী মাহবুব হোসেন রেজু বলেন,‘৩৫ বছর প্রবাসে কাটিয়েছি। বাকী জীবন দিরাই-শাল্লাবাসীর সঙ্গে কাটাতে চাই। দিরাই-শাল্লাবাসী আমাকে নির্বাচিত করলে আমি অবহেলিত এলাকার উন্নয়ন আগে করবো। শিক্ষা-দীক্ষা নিয়ে কাজ করে এমন অনেক উন্নয়ন সংগঠন আছে, পিছিয়ে পড়া থাকা এলাকার শিক্ষার মানন্নোয়নের জন্য আমি তাদের সঙ্গে এবং বেকারদের কর্মসংস্থানের জন্য আমি বিভিন্ন শিল্প গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করবো।’
সিলেটের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা, দিরাই-শাল্লা উপ-নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা এসএম আজহারুল হক বলেন,‘দিরাই-শাল্লায় একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার সকল উদ্যোগ আমাদের রয়েছে। বিজিবি- র্যাবের টহল শুরু হয়েছে। কোথাও টাকা ছড়ানোর বিষয়টি ধরা পড়লে কিংবা কোন ভোটারও যদি প্রমাণসহ ধরে দেন, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বৃহস্পতিবার এই আসনের উপ-নির্বাচনে ২ লাখ ৪৬ হাজার ১৩১ জন ভোটার ১১০ টি কেন্দ্রে ভোট দেবেন।


