প্রকাশিত তথ্য মোতাবেক জেলার হাওরগুলোতে ফসল রক্ষার জন্য বিভিন্ন বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য নিয়োগকৃত ঠিকাদার ও পিআইসি’র অধিকাংশ কাজই ছিল চরম দুর্নীতিপূর্ণ। তারা নাম কা ওয়াস্তে কাজ করিয়ে বরাদ্দের পুরো টাকা লুপাটের খায়েশে মত্ত ছিলেন তারা। এবার বাঁধ নির্মাণে সরকারের বরাদ্দকৃত ৫৯ কোটি টাকাই নামমাত্রও কাজে না লেগে ব্যক্তি বিশেষের পকেট ভারী করার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে বলে কৃষক ও সচেতন মহলের অভিমত। কোন বাঁধই পানির প্রাথমিক ধাক্কা সামলতে পারে নি। অভিজ্ঞতায় দেখা যায় প্রতিবছরই বাঁধ নির্মাণে অনুরূপ দুর্নীতি হয়ে থাকে। হাওরবাসীর অভিমত- রাষ্ট্র, সরকার ও সমাজের কিছু ক্ষমতাবান ব্যক্তি যারা ঠিকাদার, পিআইসি, প্রকৌশলী, আমলা, জনপ্রতিনিধি নামে পরিচিত তাঁরা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে এই বাঁধ দুর্নীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকেন। তাই এই হাওর দুর্নীতির কোন বিচার হয় না কখনও। ফসল হানির ব্যাপকতা পেলে এইসব ক্ষমতাধররা ভোল পালটিয়ে সাময়িক কৃষক দরদী বনে গরম গরম কথা বলে কৃষকদের ক্ষোভকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। আর বিস্মৃতিপ্রবণ জাতি হিসেবে খ্যাত বাঙালি সহজ-সরল কৃষক সমাজ কিছুদিন পরই ভুলে বসেন নিজেদের ক্ষতির কথা। এভাবেই চলে আসতে দেখছি আমরা বছরের পর বছর। গতবছরও বাঁধ ভেঙে ফসল হানির ব্যাপকতা ছিলো। স্থানীয় জেলা প্রশাসন লোকদেখানো একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করেছিলেন। কিন্তু ওই তদন্ত কমিটি কী তদন্ত করেছে আর কী রিপোর্ট দিয়েছে তা কেউ জানে নি। জনগণ জানতে পারে নি কোন দুর্নীতিবাজ ঠিকাদার-পিআইসি’র বিল আটক করা হয়েছিলো কিনা, কাউকে কোন ধরনের শাস্তি দেওয়া হয়েছিলো কিনা। সংগতকারণেই সকলেই স্থির বিশ্বাস করেন যে গতবছর কোন ঠিকাদার-পিআইসি’র বিল আটকে থাকে নি। এবারও মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নেওয়া এইসব ঠিকাদার-পিআইসি’র কেশাগ্র কেউ স্পর্শ করবে না বলেই ভুক্তভোগী মহল মনে করেন। মানুষের কান্না-আহাজারিকে চাপা দিতে এবারও লোক দেখানো তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে আর কিছুদিন পরই ওই কমিটি হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে। একটি জনপদের লক্ষ লক্ষ মানুষের মুখের অন্ন লুণ্ঠনকারীরা এই ভাবে দিনের পর দিন এস্টাব্লিশম্যান্টের সহায়তায় পার পেয়ে যাবে এমনটি কাম্য নয়। তাই এবার হাওরে হাওরে গণতদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশের একটি আওয়াজ উঠেছে। এতে ঠিকাদার-পিআইসি-পাউবো মিলে কী পরিমাণ দুর্নীতি করেছে তার একটি চিত্র সকলের কাছে স্পষ্ট হবে। এরকম গণতদন্তের ফলাফল সরকার এড়িয়ে যেতে পারবে না।
হাওর দুর্নীতির এই গণতদন্ত কীভাবে হতে পারে? কোন ধরনের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বদলে স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য নৈতিকতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে এই কমিটি গঠন করতে হবে। কমিটির ব্যক্তিদের হতে হবে অভিজ্ঞ। তারা পাউবো থেকে প্রতিটি বাঁধের প্রাক্কলন সংগ্রহ করে বাস্তবে কতটুকু কাজ হয়েছে তার তথ্য উদঘাটন করবেন। এজন্য তাঁরা বাঁধ এলাকার কৃষকদের স্বাক্ষপ্রমাণ গ্রহণ করে লিখিত বিবরণ তৈরি করবেন। গণতদন্ত কমিশন কত টাকা বরাদ্দের বিপরীতে কত টাকার কাজ হয়েছে আর কত টাকা লুপাট হয়েছে তার হিসাব করবেন। তাঁদের পর্যবেক্ষণে প্রাপ্ত প্রতিবেদন গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করে সরকারের দায়িত্বশীলদের নিকট দাখিল করবেন। ওই গণতদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে সরকারের উপর সামাজিক চাপ বাড়াতে সামাজিক উদ্যোগকে সংগঠিত করতে হবে। এর বাইরে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার প্রার্থনার বিষয়টিও সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা উচিৎ। যতক্ষণ পর্যন্ত জনগণের ভিতর থেকে এই সামাজিক প্রতিরোধের জায়গাটি প্রবল না হবে ততদিন পর্যন্ত দুর্নীতির মহামারীকে রোধ করা সম্ভব হবে না।

