বিশেষ প্রতিনিধি
‘আমরা আগে দিনও ৩-৪শ টাকা কামাই করতে পারতাম। অকন ট্রাক্টার চলনে ৫০ থাইক্কা ১০০ টেকার বেশী করন যায় না। সব মাল (বালি-পাথর) ট্রাক্টারে লইয়া যায়গি। আমরার বইয়া থাকন লাগের হারাদিন। আমরা বউ-বাইচ্ছারারে কিতা কইরা পালতাম। পৌরসভায় বাধা দিয়েও কোন কাম হয়না। ’
শহরে ট্রাক্টর দিয়ে বালি-পাথর পরিবহন করায় কাজ হারিয়ে এভাবে কথাগুলো বলছিলেন শহরতলীর বাহ্মনগাঁও গ্রামের ঠেলাগাড়ি শ্রমিক আরিফ আলীর ছেলে নূর হোসেন (৪০)। গতকাল বুধবার বেলা ১১ টায় সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘর পয়েন্টের মাছ বাজারের পশ্চিমে রাস্তার পাশে বসেছিলেন নূর হোসেন। তার পাশে বসা ছিলেন শহরের হাছননগরের মর্তুজ আলী (৪৫), দোয়ারাবাজার উপজেলার মান্নারগাঁও গ্রামের শ্রমিক আঞ্জব আলীসহ আরো ৩ জন ঠেলাগাড়ি শ্রমিক। শুধু তারাই নয়, শহরে ট্রাক্টর দিয়ে মালামাল পরিবহন করায় সব ঠেলাগাড়ি শ্রমিকের পরিবারের একই দশা বলে জানালেন তারা।
ওই ঠেলাগাড়ি শ্রমিকরা যখন কাজ না পেয়ে রাস্তায় বসে সময় কাটাচ্ছিলেন তখন পাশ দিয়ে বিকট শব্দ করে রাস্তা
কাঁপিয়ে একের পর এক ট্রাক্টর বালি-পাথর নিয়ে ষোলঘর নদীর পাড় থেকে শহরের বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশ করছিল।
শহরের বনানীপাড়া, আলীপাড়া, মাহমুদপুর, বিলপাড়, ঘোলঘর, কাজির পয়েন্ট, ময়নার পয়েন্ট, বিহারি পয়েন্ট, ধোপাখালী, হাছননগর, নবীনগর, ওয়েজখালী, মল্লিকপুর ট্রাক্টরের নিরাপদ রুট হিসাবে দাঁড়িয়েছে। এসব এলাকার রাস্তার পাশের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, বাসা-বাড়ির সবাই অতীষ্ট।
এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জ ট্রাফিক পুলিশের ইন্সপেক্টর সামছুল ইসলাম বলেন,‘ শহরে আগের চেয়ে ট্রাক্টর চলাচলের পরিমাণ অনেক কমে গেছে। ট্রাফিক পুলিশ সব সময় তৎপর রয়েছে। মল্লিকপুর-ওয়েজখালী এলাকায় এসব ট্রাক্টর শতভাগ নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। তবে ষোলঘর এলাকায় হয়তো মাঝে মধ্যে দুই একটা ঢুকে পড়ে। বুধবার বিকালে ষোলঘর পয়েন্ট থেকে একটা আটক করা হয়েছে। আমরা যখনই খবর পাই আটক করি। পূর্ব শহর এলাকায় খোঁজ খবর নিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। ’
জানা যায়, বাংলাদেশ মোটরযান আইনে ট্রাক্টর রাস্তার কোন যানবাহনের আওতাভুক্ত নয়। এসব যানের নেই কোন রেজিস্ট্রেশন নম্বর, চালকদেরও নেই কোন লাইসেন্স। সরকার এসব যানবাহন থেকে কোন ধরনের রাজস্বও পায় না। তবুও দাপটের সাথে চলছে শহরে এগুলো।
শহরে ট্রাক্টর চলাচল নিয়ে সাবেক জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম ও সাবেক পুলিশ সুপার মো. হারুন অর রশিদের সময়ে জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভায় বিষয়টি নিয়ে জোরালোভাবে আলোচনা হয়েছিল। সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল সকাল ৮ টা থেকে রাত ৮ টা এই সময়টুকুতে শহরে ট্রাক্টর চলাচল করতে পারবে না। ওই সভার সিদ্ধান্ত কিছুদিন বাস্তবায়ন হয়েছিল। কিন্তু কিছু দিন যেতে না যেতেই আবারও শুরু হয় ট্রাক্টরের দাপট। একদিকে যেমন ট্রাক্টরের কারণে কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়ছেন শ্রমিকরা অন্যদিকে শহরবাসীও ট্রাক্টরের বিকট শব্দে অতীষ্ট হয়ে পড়েছেন। সাধারণ মানুষের দাবি ট্রাফিক পুলিশ কঠোর হস্তে এসব যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করলে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হত না।
কাজীর পয়েন্ট ও ষোলঘরের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, ট্রাক্টরের বিকট শব্দ ও ঘনঘন আসা-যাওয়ার উপদ্রবে আমরা অতীষ্ট। পৌরসভার পক্ষ থেকে কেউ বাধা নিষেধ করে না। আমাদের ধারনা ট্রাফিক পুলিশও ট্রাক্টর রোধে উদাসীন। নাহলে কিভাবে কয়েক মিনিট পরপর একটা ট্রাক্টর আসা-যাওয়া করে।
ঠেলা গাড়ি শ্রমিক আঞ্জব আলী বলেন,‘ ভাই আমরা মহা বিপদ আছি। আমরা কোন কাম-কাজ নাই। দেখইন্না সব রাস্তাত বইয়া রইছি। ট্রাক্টার আমার কান্দাবায় মাল লইয়া যায়। যেখানও ট্রাক্টরে নিত পারে না, হেইখান আমরা যাই। কেউ ঠেকাত না পড়লে আমরারে ডাকে না।’
ষোলঘরের গৃহিনী মানি দাস বলেন,‘ ট্রাক্টরের বিকট শব্দে আমরা অতীষ্ট হয়ে পড়েছি। দিন-রাত সব সময়ই এসব গাড়ি বালি-পাথর নিয়ে চলাচল করছে। যখন রাস্তা দিয়ে আসা-যাওয়া করে রাস্তার সাথে বাসা-বাড়ি কাঁপে। যাওয়ার সময় রাস্তায় বালি-পাথর ফেলেও যায়।’


