বাঁধে পিআইসি কাজ করেছে ৯২ শতাংশ!

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের হাওরে ফসলডুবির পর পাউবো, ঠিকাদার ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি’র) দুর্নীতি’র বিরুদ্ধে হাওরজুড়ে আন্দোলন ও প্রতিবাদ করলেও পাউবো কাজের অগ্রগতির প্রতিবেদন নিয়ে লুকোচুরি করেছিল। হাওর রক্ষা বাঁধের বিগত দুই অর্থবছরের কাজের কোটি কোটি টাকার প্রকল্পে ঠিকাদাররা কাজ না করায় ইতিমধ্যে ১৫ জন কর্মকর্তা এবং ঠিকাদারসহ ৬১ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। বিগত বছরের ঠিকাদার ও পিআইসি’র কাজে অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত চলছে বলে ইতিপূর্বে জানিয়েছেন দুদক’র দায়িত্বশীল কর্মকর্তাগণ। তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করে পিআইসি’র কাজের অগ্রগতি প্রতিবেদন রোববার পেয়েছেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা মালেক হোসেন পীর। গত ৯ এপ্রিল অর্থাৎ হাওরডুবির পর উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট পাউবো’র সাময়িক বরখাস্ত হওয়া এবং দুর্র্নীতির দায়ে গ্রেপ্তার হওয়া তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী আফছর উদ্দিন ঐ প্রতিবেদনে পিআইসি’র ২৩৯ টি প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি ৪ টি প্রকল্প ছাড়া সব কটিতেই দেখিয়েছেন ৭০ থেকে ৯২ শতাংশ! এই অগ্রগতি প্রতিবেদন ‘হাস্যকর’ বলে দাবি করেছেন কৃষক নেতারা।
প্রতিবেদনে যে চারটি প্রকল্পের কাজ ৭০ শতাংশের নিচে অগ্রগতি দেখানো হয়েছে- সেগুলো হলো ধর্মপাশা উপজেলার গুরমার হাওর উপ-প্রকল্পের ১ কিলোমিটার বাঁধের ভাঙা বন্ধকরণ ও মেরামত কাজ। অগ্রগতি দেখানো হয়েছিল ৬৫ শতাংশ। বরাদ্দ ছিল ৭ লাখ ২১ হাজার টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ছিলেন চামরদানী ইউপি চেয়ারম্যান জাকিরুল আজাদ মান্না। একই উপজেলার চন্দ্রসোনার তাল হাওর উপ-প্রকল্পের ডুবন্ত বাঁধের ভাঙা      
বন্ধকরণ এবং মেরামত কাজে বরাদ্দ ছিল ৫ লাখ ৪১ হাজার টাকা। কাজের অগ্রগতি দেখানো হয়েছে ৬০ শতাংশ। প্রকল্প চেয়ারম্যান ছিলেন সুখাইড় রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের ইউপি সদস্য রানু আক্তার। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার করচার হাওর উপ-প্রকল্পের ডুবন্ত বাঁধের ভাঙা বন্ধকরণ ও মেরামত কাজে বরাদ্দ ছিল ৫ লাখ ২৭ হাজার টাকা। কাজের অগ্রগতি দেখানো হয়েছিল ৬৮ শতাংশ। প্রকল্প চেয়ারম্যান ছিলেন ফতেপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য হাবিবুর রহমান।
জামালগঞ্জ উপজেলার শনির হাওর উপ-প্রকল্পের কম্পার্টমেন্টাল বাঁধের ভাঙা বন্ধকরণ ও মেরামত কাজে ব্যয় উল্লেখ করা হয়েছে ৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা। অগ্রগতি উল্লেখ করা হয়েছে ৫০ শতাংশ। এই প্রকল্পের প্রকল্প চেয়ারম্যান ছিলেন বেহেলী ইউনিয়নের ইউপি সদস্য আব্দুল বাতেন।
দুদকের দুর্নীতির মামলায় আটক মো. আফছর উদ্দিন হাওর ডুবির পর গত ৯ এপ্রিল উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট এই প্রতিবেদন দাখিল করেন। ঐ প্রতিবেদনে আরেকটি তথ্যে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী উল্লেখ করেছেন, ডিসেম্বরেই পিআইসিগুলো কাজ শুরু করেছিল।
কাজ কম হওয়া পিআইসি চেয়ারম্যানের ৩ জন রোববার দাবি করেছেন,‘তারা পুরোপুরি কাজ করেছেন, কেন পাউবো কাজ কম দেখালো, তারা জানেন না।’ পিআইসি চেয়ারম্যান রানু আক্তার অসুস্থ্য থাকায় তাঁর স্বামী মঞ্জুর আলী দাবি করলেন,‘আমার স্ত্রী পুরো কাজ করেছেন।’
ধর্মপাশার চামরদানী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান প্রভাকর তালুকদার পান্না বলেন,‘জাকিরুল আজাদ মান্না গুরমার হাওরের ভাঙায় কোন কাজই করেননি। কাজ হচ্ছে না দেখে স্থানীয় কৃষকরা কিছু মাটি ফেলেছিল, কিন্তু প্রথম ধাক্কায়ই ঐ ভাঙন দিয়ে পানি ঢুকে হাওরের ফসল ডুবে যায়।’
জেলা সিপিবি’র সভাপতি চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন,‘কেবল হাস্যকর নয় গণমানুষকে বোকা বোঝানো এবং যারা কিছুটা বোঝে তাদেরকে ভেড়া-ছাগল মনে করা ছাড়া আর কিছুই নয়। একটি লুটেরাগোষ্ঠী অবহেলিত জনপদকেই তাদের লুটের ক্ষেত্র মনে করে। রাষ্ট্রযন্ত্রও তাদেরকেই পৃষ্ঠপোষকতা দেয়।’ তিনি দাবি করেন, ডিসেম্বরে কোন পিআইসি-ই কাজ শুরু করেনি।
কৃষক সংগ্রাম সমিতির কেন্দ্রীয় আইন বিষয়ক সম্পাদক খায়রুল বাশার ঠাকুর খান বলেন,‘পিআইসি কখনোই ৫০ ভাগের বেশি কাজ করে না। ৫০ শতাংশ কাজ করলেই জনগণ ১০০ শতাংশ ধরে নেন। এগুলো মিথ্যা কথা, জনগণকে বোকা মনে করেই এরকম হাস্যকর প্রতিবেদন দেয়।’
পাউবো’র বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বখর সিদ্দিক ভুইয়া বলেন,‘ঠিকাদার ও পিআইসি’র বিগত বছরের কাজের অগ্রগতি-অনিয়ম তদন্তের জন্য কমিটি হয়েছে। পানি শুকানোর পর তদন্ত করেই ব্যবস্থা নেবে কমিটি।’