হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের প্রচ্ছদ কাহিনি

ধ্রুব এষ
হুমায়ূন আহমেদ বই লিখেছেন ক’টা?
দুই শতাধিক।
আমি তাঁর বইয়ের প্রচ্ছদ করেছি ক’টা?
আড়াই শতাধিক।
কী করে?
সব বইয়ের প্রচ্ছদ তো আমি করিনি। কাইয়ূম চৌধুরী, খালিদ আহসান, আফজাল হোসেন, সমর মজুমদার, মাসুম রহমান, মাসুক হেলাল, মঈন আহমেদ, উত্তম সেনও করেছেন। তবে? আমি আড়াই শতাধিক প্রচ্ছদ কী করে করলাম?
পুনর্মুদ্রণ, সংকলন (শ্রেষ্ঠ উপন্যাস, হিমুসমগ্র, মিসির আলী সমগ্র, হুমায়ূন বিচিত্রা ইত্যাদি) মিলিয়ে। কথা বলি একটু। আমি তখন চারুকলার ছাত্র। প্রচ্ছদ করতে শুরু করে দিয়েছি। কাজ করি ‘খবরের কাগজে’ এবং ‘রহস্যপত্রিকা’য়। বিলুপ্ত এক প্রকাশক একদিন বলল ‘একটা বইয়ের প্রচ্ছদ করবেন?’
‘কী বই? উপন্যাস, না কবিতার?’
‘নাটকের বই।’                         ‘কার?’
‘যার, তিনি খুবই খিটখিটে টাইপের। পছন্দ না হলে প্রচ্ছদ নেবেন না।’
‘কে শুনি?’
‘হুমায়ূন আহমেদ।’
‘বইয়ের নাম দেন। পা-ুলিপি দেন। আমি প্রচ্ছদ করব।’
‘পছন্দ না হলে কিন্তু উনি বাতিল করে দেবেন।’
‘আগে তো করি প্রচ্ছদটা।’
পরদিন পা-ুলিপি দিয়ে গেল প্রকাশক। মঞ্চ নাটক ‘১৯৭১’। হুমায়ূন আহমেদের হাতের লেখা, ফটোকপি করা। পা-ুলিপি পড়লাম এবং একটা না, দুটো প্রচ্ছদ করলাম। কম্পিউটার গ্রাফিক্সের যুগ না তখন। অফসেটে বই, প্রচ্ছদ ছাপা হয়। ডিজাইন করতে হয় ম্যানুয়াল প্রসেসে। প্রচ্ছদ দুটো একদিন নিয়ে গেল প্রকাশক। পরদিন সন্ধ্যায়ই জানাল, একটাও হুমায়ূন আহমেদ পছন্দ করেন নি।
‘আপনি কি আর ডিজাইন করবেন?’
‘করব।’
করলাম। আরো দুটো।
এই দুটোও লেখকের পছন্দ হলো না।
আরো দুটো করলাম।
না। একদমই পছন্দ হচ্ছে না লেখকের।
আরো দুটো।
এই দুটোও ‘কিছুই’ হয়নি।
‘উনি আপনাকে দেখা করতে বলেছেন।’
দেখা করব।
পরদিন নিয়ে গেল সেই প্রকাশকই। অধ্যাপক হুমায়ূন আহমেদের অফিসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে। অনেকক্ষণ ধরে কথা বললেন লেখক। শেষ কথা, ‘শোনো ভাই, ১৯৭১-এর তো কয়েকটা প্রচ্ছদই তুমি করেছ। কোনোটাই আমার পছন্দ হয়নি। তুমি কি আর প্রচ্ছদ করবে?’
‘করব।’
জনান্তিকে প্রকাশককে বললাম, ‘দরকার হলে একশ’টা প্রচ্ছদ আমি করব। আমার ডিজাইন পছন্দ করতেই হবে স্যারকে।’
পরের ডিজাইনটা আঁকন-বাঁকন না, একেবারে কাগজ পুড়িয়ে করলাম। গ্লোসি আর্টপেপার পুড়িয়ে পুড়িয়ে ১৯৭১ টাইপটা বানালাম। টাইপের নিচে টুয়েন্টি ফাইভ পার্সেন্ট ব্ল্যাকে পা-ুলিপির কিছু অংশ। এটাই ডিজাইন।
প্রকাশক ডিজাইন নিয়ে গেল এবং…।
এটা হুমায়ূন আহমেদ পছন্দ করেছেন!!! আহ্! আমি তখন পড়ি ফোর্থ ইয়ারে। বাচ্চা-কাচ্চা মানুষই বলা যায়। কী যে খুশি হলাম! কী যে খুশী হলাম! মনে হলো সব রঙিন হয়ে গেছে!
বিশ-বাইশ বছর পর এক সন্ধ্যায়, ‘দখিন হাওয়ায়’ বসে শুনেছি, স্যারই বলেছেন, ১৯৭১-এর সিলেক্টেড ডিজাইটা স্যার দেখিয়েছিলেন এক বিখ্যাত আর্টিস্টকে।
‘প্রচ্ছদটা কেমন হয়েছে?’
‘ভালো।’
‘বাচ্চা একটা ছেলে করেছে। ধ্রুব এষ। চারুকলা ইনস্টিটিউটে পড়ে।’
‘এতো পোলাপান দিয়ে আপনার প্রচ্ছদ করানো ঠিক না, হুমায়ূন ভাই।’
‘কেন ঠিক না? আমার তো দরকার ভালো প্রচ্ছদ। সেটা কে করল, বাচ্চা না বৃদ্ধ, আমার তাতে কিছু যায় আসে না।’
বিখ্যাত সেই আর্টিস্টের নামও স্যার বলেছিলেন। সেটা আমি আর এখানে বললাম না।
আফসোস, সেই ১৯৭১-এর কোনো কপি আর আমার কাছে নেই। প্রকাশনা সংস্থা এবং প্রকাশক বিলুপ্ত। কয়েক বছর আগে অন্য একটা প্রকাশনা সংস্থা থেকে পুনর্মুদ্রণ হয়েছে বইটার। এই প্রচ্ছদটাও আমি করেছি। এটা আমার কাছে আছে।