শোকাবহ আগস্ট এবং বঙ্গবন্ধু থেকে জননেত্রী

মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে  (তাঁর দুই কন্যা ব্যতীত) হত্যার মাধ্যমে একটি বীর জাতির বীরত্ব গাঁথার ইতিহাসকে ম্লান করা হলো।  বাঙালি জাতিসত্ত্বায় কালিমা লেপন করা হলো। বিশ্বকে এমনভাবে বিস্মিত করা হলো যেন বাংলাদেশকেই হত্যা করা হলো। কারণ বিশ্ববাসীর কাছে বঙ্গবন্ধুই ছিল বাংলাদেশ। আসলেই তাই। ঐতিহাসিকভাবে যেমন এটি  সত্য যে বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে বাংলাদেশের জন্ম হত না, তেমনি সত্য যে বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশ।   
 ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টে  বাঙালির জাতির জনককে হত্যার প্রতিক্রিয়ায় ফিদেল কাস্ট্রো বললেন, ‘শেখ মুজিবের মৃত্যুতে বিশ্বের শোষিত মানুষ হারাল তাদের একজন মহান নেতাকে, আমি হারালাম একজন অকৃত্রিম বিশাল হৃদয়ের বন্ধুকে।’  ব্রিটিশ এম পি জেমস লামন্ড লিখলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডে বাংলাদেশই শুধু এতিম হয়নি বিশ্ববাসী হারিয়েছে একজন মহান সন্তানকে।’ একটি পশ্চিম জার্মান পত্রিকা লিখল, ‘শেখ মুজিবকে চতুর্দশ লুইয়ের সাথে তুলনা করা যায়। জনগণ তার কাছে এত প্রিয় ছিল যে লুইয়ের মত তিনি এ দাবী করতে পারেন  যে আমিই রাষ্ট্র।’  বাঙালির স্বাধীনতা বিরোধী হেনরি কিসিঞ্জারও তার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায়  বললেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের মত তেজী এবং গতিশীল নেতা আগামী বিশ বছরের মধ্যে এশিয়া মহাদেশে আর পাওয়া যাবে না।’
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা  সাংবাদিক আহমদ  ছফার বইয়ের শেষ কয়েকটি লাইন  এখানে উদ্ধৃত না করলেই নয়, ‘আজ থেকে অনেক দিন পরে হয়তো কোনো পিতা তার শিশু পুত্রকে বলবেনÑ জানো খোকা, আমাদের দেশে এমন একজন মানুষ জন্ম নিয়েছিলো যার দৃঢ়তা ছিলো, তেজ ছিলো আর ছিলো অসংখ্য দুর্বলতা। কিন্তু মানুষটির হৃদয় ছিলো, ভালোবাসতে জানতেন। দিবসের উজ্জ্বল সূর্যালোকে যে বস্তু চিকচিক করে জ্বলে তা হলো মানুষটির সাহস। আর জ্যোস্নারাতে রূপোলি কিরণ ধারায় মায়ের স্নেহের মতো যে বস্তু           
আমাদের অন্তরে শান্তি এবং নিশ্চয়তা বোধ জাগিয়ে তোলে তা হলো তার ভালবাসা। জানো খোকা তার নাম? শেখ মুজিবুর রহমান।’
কিন্তু বেঈমান আর বর্বর কাপুরুষরা ভুলে গিয়েছিল বঙ্গবন্ধু একটি চেতনা, একটি মানচিত্র, বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশ। এই চেতনার কখনও  মৃত্যু হতে পারে না,  তাই এই মানচিত্রও বিলিন হবার নয় এবং শেখ মুজিবুর রহমানেরও কখনো মৃত্যু হবার নয়।  তিনি জীবিত  আছেন কোটি কোটি  বিশ্ববাসীর  হৃদয়ে, এবং বিশ্বাসঘাতকদের  উত্তরসুরী  আর তাদের কতিপয় অনুসারীরা ব্যতীত প্রায় সকল বাঙালির হৃদয়ে। খ্যাতিমান সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায় সকলের প্রাণের কথা লিখলেন অনবদ্য চয়নে,   “যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান
ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।
দিকে দিকে আজ অশ্রুমালা রক্তগঙ্গা বহমান
তবু নাই ভয় হবে হবে জয়, জয় মুজিবুর রহমান।“  
বঙ্গবন্ধু অমর তার আদর্শের মধ্যে এবং পলিটিকাল স্কুল অফ থটের মধ্যে। যতদিন তার স্কুলটি টিকে থাকবে বাঙালি জা্তসিত্ত্বা ও বাংলাদেশ নামক মানচিত্রটিও বিশ্ব দরবারে উজ্জল নক্ষত্রের মত জ্বলজ্বল করবে। আর তাই বঙ্গবন্ধুর পলিটিকাল স্কুলটিকে টিকিয়ে  রাখার জন্য বুকে পিতা-মাতা-ভাই-পরিবার হারানোর অসামান্য কষ্ট নিয়ে  বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালের ১৭ মে রাজনীতিবিদ হিসাবে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত প্রচ- আন্দোলন সংগ্রাম এবং ত্যাগ তিতিক্ষার  মধ্য দিয়ে  ১৯৯৬ সালে প্রথম রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসেন।  যেমন পিতা তেমন কন্যা। জননেত্রী তার অসামান্য  ত্যাগ ও নেতৃত্বে  দেশে  মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্বাধীনতার  মূল্যবোধ  ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেন এবং দেশ ও জাতির কল্যাণে,  আধুনিক ও ক্রম উন্নত এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ায় অসামান্য অবদান রাখেন। তিনি বিশ্ব শীর্ষ দশ নেতৃত্বের অন্যতম।  ভারতের  প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার  সাহসিকতা,  ত্যাগ ও নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ‘কেউ কল্পনা করতে পারেন, এক পরিবারের ১৬ জন মানুষকে হত্যা করে ফেলার পরেও বেঁচে থাকা এক মেয়ে সোনার বাংলার স্বপ্নকে সফল করতে লড়াই করে চলেছেন।’  তার এই লড়াইয়ে ১৯৯২-৯৩-৯৪-৯৫-৯৬ সময়ে ঢাকা কলেজের সাউথ হোস্টেল  ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের ছাত্র হিসেবে রাজপথের সংগ্রামে সামান্যতম অংশীদার হিসেবে এবং কর্মজীবনে বিশ্ববিদ্যালয়ে   গবেষণা, উন্নয়ন ও গবেষণা কর্মসূচীর সমন্বয় এবং শিক্ষকতার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর চেতনা ও  নেত্রীর সাধনার পথে একজন  সামান্য কলম সৈনিক হিসেবে গর্ব বোধ করি। আমি মনে করি এখন  সময় এসেছে বঙ্গবন্ধু পরিষদ করার পাশাপাশি  নেত্রীর  সাধনার পাশে মুল ধারার  রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার। কারণ আজকের পোস্ট ক্যাপিটালিস্ট তথ্যভিত্তিক ও নলেজ বেইসড ওয়ার্ল্ডে আমাদের আগামীর  নেতৃত্ব আসবে হার্ভার্ড  ও লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিকস গ্র্যাজুয়েটদের থেকে। বঙ্গবন্ধুর প্রতি অনুরাগী  ও জননেত্রীর  শিক্ষিত  ও তরুণ সৈনিকদেরকেই এই নতুন বিশ্বব্যবস্থায় হাল দরতে হবে। সুবিধাবাদী ও ভোগবাদীদের আধিক্য কমিয়ে  বঙ্গবন্ধুর চেতনা ও  নেত্রীর সাধনার  ফল অব্যাহত রাখতে এবং  বঙ্গবন্ধুর পলিটিকাল স্কুলের মানদ- বা উচ্চতা বজায় রাখতে এটি জরুরি ।   
পরিশেষে ১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডিতে শহীদ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর পরিবারের ও অন্যান্য শহীদের প্রতি জানাই বিন¤্র শ্রদ্ধাঞ্জলি, এবং ২১ আগস্টে জননেত্রীর  উপর বর্বরোচিত হামলার তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করি। পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করি  বঙ্গবন্ধুর মহান অবদানকে। তাঁর  দূরদর্শী,  সাহসী  ও অবিসংবাদিত নেতৃত্বে ৫৮-এর আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, ৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন ও  ৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন থেকে  ৬৯ সালে বিশাল গণঅভ্যুত্থানের সূচনা হয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই ৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামীগের নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে।   তাঁর ৭ই মার্চের ভাষণই হল বাঙালির মুক্তির ও স্বাধীনতার সনদ। বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এবং কালজয়ী রাজনৈতিক দিক নির্দেশনা।  
বঙ্গবন্ধুর বিচক্ষণতায়, ৭ মার্চের অনুপ্রেরণায় এবং তাঁর মহান নেতৃত্বে বাঙালি হেঁটে গেছে ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ও ১৬ ডিসেম্বরে বিজয়ের সূর্য দীঘল পথে। আজ আমাদের  প্রতিশ্রুতি হোক তাঁর ৭ মার্চের ভাষণ থেকে,  তাঁর যাপিত জীবন ও রাজনৈতিক আদর্শ থেকে শিক্ষা নেয়া এবং তাঁর মহান ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টাকারীদের প্রতিহত করা। বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির পিতাকে হারানোর শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গঠনে আত্মনিয়োগে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, জয়তু  জননেত্রী শেখ হাসিনা।।  
লেখক:গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। আহ্বায়ক বঙ্গবন্ধু পরিষদ, সুনামগঞ্জ জেলা।