কুমার সৌরভ
(পূর্ব প্রকাশের পর)
(২)
টমটমে চড়ে পথ চলতে গিয়ে মনটা যারপরনেই খারাপ হয়ে গেল রাস্তার হতশ্রী অবস্থা দেখে। এই যে এত বড় একটি দর্শনীয় জায়গা শিলাইদহে যাওয়ার রাস্তা এটি, তা মনে করার কোন জো নেই। আমার কাছে মনে হলো এই রাস্তাটি যেন আমার চির চেনা। ঠিক সুনামগঞ্জ-দোয়ারাবাজার রাস্তার মতোই সারা অঙ্গে ক্ষত নিয়ে ‘নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান’ ব্রতে দীক্ষিত হয়ে জনসেবায় দাঁড়িয়ে আছে। শিলাইদহ কুঠিবাড়িটি কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালি উপজেলায় অবস্থিত। গড়াই তীর থেকে ৬/৭ কিলোমিটারের দূরত্ব। রাস্তার অবস্থা এতোটাই খারাপ যে এই ৭ কিলোমিটার জায়গা পেরোতে আমাদের দেড় ঘণ্টা লেগে গেল। এই শিলাইদহে প্রতি দিন শত শত দর্শনার্থী আসেন। শিলাইদহ কুঠি বাড়িটি সরকারের সংরক্ষিত ঐতিহ্যিক স্থাপনা। এই স্থানটিকে ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ উভয় বাংলাসহ বিশ্ব সাহিত্যাঙ্গনের। এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যাওয়ার রাস্তাটির এমন করুণ দশা জাতি হিসাবে নিশ্চয়ই আমাদেরকে লজ্জিত করবে সন্দেহ নেই। যা হোক পথের ধূলি গায়ে মেখে আপন মাটির গন্ধ শুঁকে একটা সময়ে কুঠিবাড়ির সীমানায় পৌঁছে গেলাম। সেদিন শুক্রবার ছিল। তাই প্রচুর দর্শনার্থী। কুঠি বাড়ির মূল প্রবেশপথের বাইরে বিশাল যে আঙ্গিনা সেখানে মেলার মত আবহ। স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে প্রচুর দোকানপাট। হস্তশিল্প, কাপড়, শিশুদের খেলনা, বইয়ের দোকান মিলিয়ে এক প্রাণের মেলা যেন এই আঙ্গিনা। প্রচুর লোকজন সেখানে। সকলেই এসেছেন সময় হলে কুঠিবাড়িতে ঢুকবেন বলে। পুরো আঙ্গিনা জুড়েই বড় বড় গাছের সমাহার। ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়। মৃদুমন্দ হাওয়া বইছে। পথক্লান্তি ও শ্রান্তি দূর হয়ে গেল এই রবি-আঙ্গিনায় ঢুকে। কুঠিবাড়ির সামনে যেয়ে দেখি প্রবেশদ্বার বন্ধ। শুক্রবার বিধায় একটু আগেভাগেই মধাহ্নবিরতি শুরু হয়ে গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেল প্রবেশদ্বার খুলবে ঠিক দু’টোয়। দু’টো বাজতে এখন আরও এক ঘণ্টা বাকি। অসুবিধা নেই, আঙ্গিনার মেলায় অনায়াসে কাটিয়ে দেয়া যাবে এই একটি ঘণ্টা। এক ঘণ্টা কেন, শিলাইদহের যে কোন প্রান্তে বসে নিরবে কাটিয়ে দেয়া যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ভাবের জগতের সাথে যাদের লেনাদেনা রয়েছে তাদের জন্য এমন জায়গা আদর্শস্বরূপ। এই শিলাইদহ এলাকাটি ছিলো রবীন্দ্রনাথের জমিদারির অন্তর্গত একটি অঞ্চল। যেমন ছিলো পাবনার শাহজাদপুরে । রাজশাহীর পতিসরে। জমিদারী দেখভালের জন্য আসতেন তিনি এখানে, এ কথা যেমন সত্য; তেমন সত্য হলো পদ্মাচুম্বিত এই অঞ্চলটি বিশেষভাবে রবীন্দ্রমানসকে প্রভাবিত করেছিল। উদার প্রকৃতি বিস্তৃত শস্যশ্যামল সবুজ আর সরল মানুষজন বিশেষভাবে তাঁর মনকে টেনেছিল। তিনি এখানে আসলে মনে শান্তি অনুভব করতেন। তাই বারে বারে দু’দ- জিরোনোর জন্য চলে আসতেন শিলাইদহে। ১৮৯২ থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত বহুবার কবি এসেছেন এইখানে। শিলাইদহকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি আত্মীয়বলয়ও গড়ে উঠেছিল। তাঁর দুই বোনের বিয়ে হয়েছিল কুষ্টিয়া অঞ্চলে (দুর্গাপুর ও জয়রামপুর)। এখানে আসায় লাভ হয়েছে এই, জমিদার রবীন্দ্রনাথ গণমানুষের স্বরূপের সন্ধান পেয়ে যান। শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসরে তিনি অন্তরঙ্গভাবে মিশেছেন মানুষের সাথে। তিনি পল্লী বাংলার ভিতরকার প্রকৃত অবস্থাটিও জানার সুযোগ পান এতে। জমিদারি ব্যবস্থার ভিতরে থেকেও তিনি প্রজা-সাধারণের সাথে মিশেছেন গভীরভাবে। জানতে চেয়েছেন কী তাদের সমস্যা। সমস্যা শুনে নিজের মত করে এর সমাধানের পথ বের করার নিরন্তর চিন্তা করেছেন। তিনি দেখতে পেলেন, সমাজ কত ধরনের মন্দ প্রপঞ্চ দ্বারা আক্রান্ত। একই সাথে তিনি অনুভব করলেন সনাতনী কৃষি ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো। এখানে এসে যেমন তিনি মানুষে মানুষে ভেদাভেদ দেখে ব্যথিত হয়ে ছিলেন তেমনি কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ব্যাপারেও মনোযোগী হন। কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার, সমবায় ব্যবস্থাপনার প্রয়োগ, পল্লী ব্যাংক স্থাপন; এমনসব জনহিতকর কাজের দৃষ্টিভঙ্গি লাভ করেন তিনি পূর্ববঙ্গ ঘুরেই। শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে রবিঠাকুরের এমন কৃষিবান্ধব কীর্তির নানা নিদর্শন এখনও সংরক্ষিত রয়েছে, যা আমরা নিজ চোখে দেখে ধন্য হয়েছি। তিনি লিখলেন‘ ভূমির সত্ত্ব ন্যায়ত জমিদারের নয়- সমবায় নীতি অনুসারে চাষের ক্ষেত্র একত্র করতে না পারলে কৃষির উন্নতি হতে পারেনা, চাষীকে জমির সত্ত্ব দিলেই সে সত্ত্ব পর মুহূর্তেই মহাজনের হাতে গিয়ে পড়বে। তার দুঃখ বাড়া বৈ কমবেনা।’ তিনি এই লক্ষ্যে প্রথমে শিলাইদহে পরে শ্রীনিকেতনে বৈজ্ঞানিক প্রথায় উচ্চ ফলনশীল চাষের কথা ভেবেছিলেন। তাঁর নিজের কথায়-‘বাবার নির্দেশ অনুসারে আমি কৃষির উন্নতির নানাবিধ চেষ্টায় উঠে পড়ে লাগলুম। শিলাইদহ কুঠিবাড়ি সংলগ্ন কতক জমি খাস করে নিয়ে বৈজ্ঞানিক প্রথায় একটি আদর্শ কৃষিক্ষেত্র প্রতিষ্ঠা করলুম। আমেরিকা থেকে কয়েকটি যন্ত্রপাতি আনিয়ে সেখানে তার পরীক্ষা চলতে লাগল। চাষীরা ধান ছাড়া অন্য ফসলের চাষ করে না দেখে ঐ অঞ্চলের Rottation crop করে দু’একটা Money crop করা যায় কিনা তার পরীক্ষা হতে লাগল। আমেরিকা থেকে ভাল ভূট্টার বীজ আনলুম। চাষীদের আলু ও টমেটোর চাষ সেখানে হলো।’ সুতরাং বুঝাই যায় কবি রবীন্দ্রনাথের সমাজ মানস গড়ে তোলার তীর্থভূমি রূপে অনবদ্য ভূমিকা রেখে শিলাইদহ নিজেও মহীয়ান হয়েছে। রবীন্দ্রজীবনের পুনর্পাঠ করি মনে মনে এই কুঠিবাড়ির প্রাঙ্গণে বসে। এখানে রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ সোনার তরী, চিত্রা, চৈতালী; ছোটগল্প- কঙ্কাল, শান্তি, সমাপ্তি, ফেল, শুভদৃষ্টি, নষ্টনীড়; নাটক- গোড়ায় গলদ, চিত্রাঙ্গদা, রাজা অচলায়তন ইত্যাদি। প্রকৃতির অপরূপ রূপে মোহিত কবি এখানে বসেই রচনা করেছেন বহু গান। এই শিলাইদহেই তিনি শুরু করেছিলেন গীতাঞ্জলী কাব্যগ্রন্থের অনুবাদ কাজ।
রবীন্দ্র আঙ্গিনায় অপেক্ষার সময় অবশেষে শেষ হয়ে এলো। ঘড়িতে বেজে গেল দুপুর ২ টা। আমরা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ২০ টাকা মূল্যমানের তিনখানি টিকেট কেটে ভিতরে ঢুকে গেলাম। ছুটির দিন বিধায় প্রচুর দর্শনার্থী। প্রবেশদ্বারে বলা যেতে পারে গা ঘেষাঘেষি ভিড়। আমরা প্রবেশপথ ডিঙ্গিয়ে ভিতরে চলে আসলাম। কুঠিবাড়িটি প্রায় ৩৩ একর জায়গাজুরে বিস্তৃত। পুরো বাড়িটি ঢেউখেলানো আকৃতির পাকা দেয়ালঘেরা। মূল কুঠিবাড়িটি প্রবেশদ্বার পেরিয়ে অন্তত একশ গজ দূরে। প্রায় আড়াই একর জায়গাজুরে বিস্তুৃত কুঠিবাড়িটি। কুঠিবাড়ির পুরো এলাকা সবুজে ঘেরা। নানা জাতের গাছ। আম, কাঠাল, জাম, জামরুল, তাল গাছ। বেশ কতকগুলো আম ও কাঠাল গাছ দেখলাম, যেগুলো রবিঠাকুরের আমলের বলে গাছের গায়ে সাঁটানো টিনের ফলকে লিখা রয়েছে। বাড়ির চতুর্দিকে এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত অনেকগুলো পাকা সড়ক দ্বারা সংযুক্ত। সড়কগুলো খুবই পরিচ্ছন্ন। মাঠের ঘাষগুলো যত্নে কাটা। বুঝা যায় কুঠিবাড়িটিতে যত্নের কোন ঘাটতি রাখেনি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ। বাড়ির বাম পাশে বিশাল পুকুর। পুকুরের চার পারেই অনেক বৃক্ষ। দুইটি বড় বড় ঘাট দুই দিকে। পুকুরে একটি নৌকা বাঁধা রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ এখানে আসলে যে পদ্মাবোট ব্যবহার করতেন এটি তারই প্রতিরূপ। ঠিক আমাদের দেশে এখন বড় আকারের যে ইঞ্জিননৌকাগুলো দেখা যায় সেরকম। পুকুরপাড়ের একটি বকুল গাছের নীচে দাঁড়িয়ে আমরা ছবি তুললাম। ছবি তোলার সময় মনে হলো এই বকুল তলায় বসে রবীন্দ্রনাথ একটা সময়ে কাব্যদেবীর উপাসনা করতেন দিনের পর দিন। বকুলের মনমাতানো গন্ধে আকুল কবি লিখেছেন কত গান। ঝরা বকুলের বেদনা অন্তরে ধারণ করে তিনি গেয়েছেন কত না আক্ষেপের সঙ্গীত। পুকুরের চার পাশ ঘুরে ঘুরে দেখলাম। অনেককে দেখলাম পুকুরের জলে নেমে ছবি তুলছেন। পুকুরপার থেকে এসে পুরো বাড়িটি ঘুরে দেখলাম। নিসর্গের এক অনুপম উপমা যেন এই বাড়িটি। প্রকৃতি কতোটা মানুষের নিকটবর্তী হতে পারে রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি এর বড় উদাহরণ। কুঠিবাড়ির পিছনের দিকে একটি একতলা দালানঘর । সম্ভবত বাড়ির কর্মচারীদের থাকার ঘর ওটি। কুঠিবাড়ির একপ্রান্তে রয়েছে স্থায়ী দুইটি মঞ্চ। তাঁর জন্মজয়ন্তীকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর তিনদিনের মহা আয়োজনে এইসব মঞ্চ ও পুরো কুঠিবাড়ি উৎসবমুখর হয়ে উঠে। দেশ-বিদেশ থেকে এখানে আসেন বহু রবীন্দ্র অনুরাগী গুণীজন।
নিজ সাহিত্য-জীবনে শিলাইদহের প্রভাব রবীন্দ্রনাথ নিজেই স্বীকার করেছেন। একটি পত্রে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমার যৌবন ও প্রৌঢ় বয়সের সাহিত্য রস সাধনার তীর্থস্থান ছিল পদ্মা প্রবাহ চুম্বিত শিলাইদহ পল্লীতে’। হিসাব করে দেখলাম শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথের শেষ পদক্ষেপ পড়ার পর শত বছর অতিক্রমের আর মাত্র ৫ বছর বাকি। শত বছরেও রবীন্দ্রপ্রভাব বাঙালি মানসে এতটুকু ম্লান হয় নি। এই প্রভাব আরও সুদীর্ঘ মেয়াদ চলতেই থাকবে। এমন তীর্থস্থানে এসে আমাদের জীবনের অপূর্ণতা কিছুটা ঘুচল বলেই মনে হল। আঙ্গিনার এক পুরনো আম গাছের তলায় পাকা বেদীতে বসে জিরোতে বসলাম। দেখলাম গাছটির গায়ে লিখা রয়েছে এটি রবিঠাকুরের স্পর্শধন্য। আমরা অতিবৃদ্ধ গাছটির গায়ে হাত বুলালাম। মনে হলো এক স্থিতধী প্রাচীন জ্ঞানবৃক্ষের তলায় আমরা বসে আছি কয়েকজন অবোধ শিশু। শীতের অপরাহ্ন আলস্যের চাদর গায়ে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসার জন্য মধাহ্নের আশ্রয় ছেড়েছে তখন। সমাগত অপরাহ্ন আমাদের ডাকছে রবিঠাকুরের বসারঘর, শয়নকক্ষ, লিখার টেবিল, বসার চেয়ার, তাঁর ব্যবহৃত সেই কাঠের দেরাজ সব সব কিছু। মন থেকে কে জানি বলে উঠল, আসছি..গুরুদেব..। (চলবে)


