১১ কোটি টাকার কাজে সব কিছুতেই নিম্নমান

বিশেষ প্রতিনিধি ও আশিক মিয়া
ছাতক-দোয়ারাবাজার উপজেলার চলাচলের একমাত্র সড়ক সংস্কার ও প্রশস্তকরণের কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় স্থানীয় লোকজনের চাপে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ছাতক- দোয়ারাবাজারের ১৪ কিলোমিটার সড়কের ১১ কিলোমিটারেই নিম্নমানের কাজ করা হয়েছে বলে দাবি এলাকাবাসীর। রোববার দোয়ারাবাজারের নৈনগাঁওয়ের পাশের ৩ কিলোমিটারের কাজ করার সময় এলাকাবাসী বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। সোমবার দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইদ্রিছ আলী বীরপ্রতীক ঘটনাস্থলে গিয়ে কাজের নিম্নমানের বিষয়ে সড়ক ও জনপথের নির্বাহী প্রকৌশলীকে জানান। নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সফিকুল ইসলাম কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। এই সড়কটিতে ১০ কোটি ৬৪ লাখ টাকার উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের দায়িত্বশীল প্রকৌশলী জানান, গত বছরের জুলাই মাসে ছাতক- দোয়ারাবাজার সড়ক প্রশস্তকরণের (১২ ফুট থেকে ১৮ ফুট করণ) কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়। সেপ্টেম্বর মাসে কার্যাদেশ পেয়ে অক্টোবর মাসে কাজ শুরু করেন সিলেটের ঠিকাদার ইউনুস এ- ব্রাদার্সের সুহেল মিয়া।
একটি ছোট সেতুসহ এই কাজে ১০ কোটি ৬৪ লক্ষ টাকা বরাদ্দ ছিল। ইতিমধ্যে সড়কের বেশিরভাগ কাজ ও সড়কের কারাইলগাঁও গ্রামের ছোট সেতুর কাজ করেছেন ঠিকাদার। সম্প্রতি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান দোয়ারাবাজারের নৈনগাঁওয়ের পাশে কাজ করা শুরু করলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ এলাকাবাসী কাজের মান দেখে ক্ষুব্ধ হন। রোববার বিকালে এলাকার কয়েক’শ মানুষ জড়ো হয়ে সড়কের নিম্নমানের কাজ দেখে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইদ্রিছ আলী বীরপ্রতীককে জানান।
সোমবার সকালে দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইদ্রিছ আলী বীরপ্রতীক কার্য এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলীকে মুঠোফোনে বিষয়টি জানান। নির্বাহী প্রকৌশলী উপজেলা পরিষদ   চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় লোকজনদের জানান, নিম্নমানের মালামাল দিয়ে কাজ করতে দেওয়া হবে না। কাজ আপাতত বন্ধ থাকবে।
 দোয়ারাবাজারের খামারপট্টি’র বাসিন্দা গুরুদাস দে বলেন,‘ দোয়ারাবাজারবাসী যোগাযোগ ভোগান্তিতে রয়েছেন। এরমধ্যে যে সড়কটি নিয়ে আমরা স্বপ্ন দেখছি, সেখানে যেভাবে নিম্নমানের কাজ হচ্ছে, একবছরও সড়ক টিকবে না। সড়কের কাজের বক্সকাটিংয়ে ৩ ইঞ্চি বালু ও ৩ ইঞ্চি পাথর দেবার কথা, দিচ্ছে ১ ইঞ্চি পাথর ৪ ইঞ্চি বালু, মেকাডামে ৮ ইঞ্চি পাথর দিয়ে কমপেক্ট করে ৬ ইঞ্চি করার কথা, করা হচ্ছে আড়াই থেকে ৩ ইঞ্চি। এমন অনিয়মের পর সড়ক টিকবে কীভাবে, আমাদের যোগাযোগের কষ্টই বা দূর হবে কীভাবে? সরকার বছরে বছরে নিশ্চয়ই এক সড়ক তৈরি করতে অর্থ দেবেন না।’
নৈনগাঁওয়ের আবুল মিয়া বলেন,‘সড়কের কার্পেটিংয়ে দেশী গালা ব্যবহারের কথা থাকলেও কম দামের ইরানী গালা ব্যবহার হচ্ছে। কার্পেটিং ৪০ মিলি করার কথা থাকলেও ১৬-১৭ মিলির উপরে কোথাও হয়নি। কার্পেটিংয়ে আধা ইঞ্চি পাথরের কোনা দেবার কথা থাকলেও শতকরা ২০ ভাগ আধা ইঞ্চি পাথর দিয়ে ৮০ ভাগ বালু দেওয়া হচ্ছে।  এই সড়ক টিকবে কীভাবে। পাথর দেওয়া হচ্ছে নিম্নমানের, রোলারের চাপায় পাথর গুড়া হয়ে যাচ্ছে, পুরো সড়কেই এভাবে কাজ হয়েছে, সড়ক ও জনপথের দায়িত্বশীল যারা কাজ দেখভালের দায়িত্বে আছেন, মনে হয়েছে তারাও ঠিকাদারের দায়িত্বপ্রাপ্ত দেখভালকারী।’ তিনি জানান, সড়কের কাজের জন্য রাখা নিম্নমানের পাথর এবং গালা সোমবার সকাল থেকে সরিয়ে নিচ্ছে ঠিকাদারের লোকজন।
দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইদ্রিছ আলী বীরপ্রতীক বলেন,‘কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় এবং স্থানীয় জনগণ বিক্ষুব্ধ হওয়ায় আমি সড়কের কাজের এলাকায় যাই এবং সড়ক ও জনপথের নির্বাহী প্রকৌশলীকে বিষয়টি জানানোয় তিনি কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।’
ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ইউনুস এ- ব্রাদার্সের প্রোপাইটার সুহেল মিয়া বলেন,‘গত অক্টোবর থেকে এই সড়কে কাজ চলছে। ফেব্রুয়ারিতে বন্যা হওয়ায় আমার অনেক ক্ষতি হয়েছে। একই স্থানে বার বার কাজ করতে হয়েছে। প্রথমে সড়কের প্রশস্তকরণের কাজের দরপত্র হয়েছিল। পরে পুন:প্রাক্কলনের মাধ্যমে মাঝখানের অংশটুকু ঢুকানো হয়েছে। হাতে কাজ করায় কাজের মান ১৯-২০ হতে পারে। আজকে (সোমবার) আমার লোকজন জানিয়েছেন, কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। আমি বলেছি অফিসের লোকজন যেভাবে বলেন, সেভাবেই বাকী অংশটুকু করে দেবার জন্য।’
সড়ক ও জনপথের সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সফিকুল ইসলাম বলেন,‘বিষয়টি আমার নজরে এসেছে, আমি কাজ বন্ধ রাখতে বলেছি। সরেজমিনে গিয়ে দেখবো প্রাক্কলনে যেভাবে যা উল্লেখ আছে, সেভাবে হচ্ছে কী-না। প্রাক্কলন মোতাবেকই কাজ করতে হবে।’