সুনামগঞ্জের চার লোককবি স্মরণে জেলা শিল্পকলা একাডেমি ও জেলা প্রশাসনের আয়োজিত চার দিনের ‘হাওর পাড়ের উৎসব’ এ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রস্তাবনা তুলেছেন জেলা প্রশাসক। তিনি চার দিনই আলোচনাসভায় আগত বিশিষ্টজনদের উদ্দেশ্যে অনুরোধ জানিয়েছেন, সুনামগঞ্জকে দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী ঘোষণা করার বিষয়ে সহযোগিতা করার জন্য। জেলা প্রশাসক যে দাবিটি বরেণ্য ও গুরুত্বপূর্ণ অতিথিবৃন্দ সমীপে তুলে ধরলেন সেটি জেলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যপ্রিয় প্রতিটি মানুষের প্রাণের দাবি। আমরা কৃতজ্ঞ জেলা প্রশাসকের প্রতি যে, তিনি জেলাবাসীর হৃদয়ের মর্মমূল থেকে এই দাবিটি তুলে এনে রাষ্ট্রীয় বিশিষ্টজনদের কানে পৌঁছে দিয়েছেন। ব্র্যান্ডিং বিষয়ক একটি নতুন বিষয়বস্তু সাম্প্রতিককালে সকলের সামনে উঠে এসেছে। যদিও এই ব্র্যান্ডিং বিষয়টি মূলত একটি বাণিজ্যিক পরিশব্দ। কিন্তু এখন এই শব্দটি বাণিজ্যিক পরিসীমা পেরিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রে স্থান করে নিয়েছে। সরকারিভাবে ইদানীং প্রতিটি জেলার জন্য একটি ব্র্যান্ড নাম দেওয়া হচ্ছে। জেলার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যকে বিবেচনায় নিয়ে হচ্ছে এই নামাকরণ। সুনামগঞ্জকে বলা হচ্ছে ‘হাওরকন্যা’। হাওরের চাইতে আর বড় কোন সত্য নেই জেলার জন্য। জেলার জীবন ও জীবিকা প্রধানত হাওরনির্ভর। অবধারিতভাবে সংস্কৃতির জায়গাটিও এই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সাগরসম হাওরগুলোই। সুতরাং যখনই পৃথিবীর নানাপ্রান্তে ‘হাওরকন্যা সুনামগঞ্জ’ শব্দটি উচ্চারিত হবে তখন জেলার একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য সকলের কাছে পরিষ্কার ফুটে উঠবে। এরই প্রাসংগিক পরিণতি হতে পারে জেলা প্রশাসনের দাবিকৃত সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে সুনামগঞ্জকে স্বীকৃতি দানের মধ্য দিয়ে।
বাংলাদেশ তথা বাংলাভাষী লোকজনের, বিশেষ করে গাননির্ভর লোকজ শিল্প বলতে, প্রধানত এখন সুনামগঞ্জের লোকজ, বাউল, মরমীয়া, বৈষ্ণবীয় ধারার গানগুলোকেই বুঝানো হয়। এই কথাটি বরেণ্য বাউল লালন শাহকে স্মরণে রেখেই বলা যায়। এখন সারা বিশ্বে বাঙালি সংস্কৃতি তথা বাংলার লোকজ গান বলতে এই সুনামগঞ্জের রাধারমণ, হাছন, করিম, দূর্ব্বিণ, গিয়াস উদ্দিন প্রমুখের গানই বুঝায়। হাওরের উদারতায় গড়ে উঠা সজল প্রকৃতির উর্বর গর্ভে এখানে যে অমূল্য পদকর্তার জন্ম হয়েছে তা এককথায় অভূতপূর্ব, অনন্য। প্রতিটি জেলারই নিজস্ব কিছু সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কিন্তু সুনামগঞ্জের মতো এমন সকল কূল উপচানো গানের প্রাবাল্য আর কোথাও নেই। কি বাণীর গভীরতা, কি সুরের বৈচিত্র্য, কি ভাবের বিশালতা, কি দরদি গায়কিয়ানা; সবকিছু মিলিয়ে আজ বাংলা লোকগান বলতেই বিশ্ব বাঙালি এই সুনামগঞ্জের গানকেই বুঝে থাকেন। এই জেলার রাধারমণ, হাছন, করিমকে নিয়ে প্রতিদিনই আন্তর্জাতিক আগ্রহ ও চর্চার পরিমাণ বাড়ছে। সুতরাং এমন বৈশিষ্ট্যম-িত, এমন অমূল্য সঙ্গীতের বিশাল অঞ্চলকে সাংস্কৃতিক রাজধানী ঘোষণা করার দাবি খুবই যৌক্তিক। এর মধ্য দিয়ে বাংলা সংস্কৃতির প্রসার ও বিশ্বায়নের বিষয়টি আরও গতিশীল হবে।
আমাদের দেশে বাণিজ্যিক রাজধানী বলতে চট্টগ্রামকে, আধ্যাত্মিক রাজধানী বলতে সিলেটকে বুঝানো হয়। একইভাবে সুনামগঞ্জের পরিচিতিটিও সাংস্কৃতিক রাজধানী অভিধায় অভিষিক্ত হওয়াটা কেবল যৌক্তিকতাকেই মেনে নেয়া। আজ জেলা প্রশাসক যে দাবিটি কণ্ঠে তুলে ধরেছেন তা হয়ে উঠেছে সকলের মনের কথা। দেশের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে আমরা অনুরোধ জানাই, একটি অঞ্চলের অনন্যসাধারণ বৈশিষ্ট্যকে স্বীকৃতি দানের মাধ্যমে অত্যন্ত শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ বাঙালি সংস্কৃতির বিশ্বায়নে এগিয়ে আসুন দ্রুত।

