এনাম আহমেদ
(২য় পর্ব)
ভাল ভাল উপলক্ষ থাকায় এবার রাশিয়া যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করলাম অনেক আগে থেকে। প্রস্তুতি বলতে টাকা জমানো। এবারের উৎসবের তারিখ ছিল ১৪-২২ অক্টোবর। ভেনু রাশিয়ার রাজধানী মস্কো থেকে পশ্চিম-দক্ষিণে ১৬২২ কিলোমিটার দূরত্বে পর্যটন ও অলিম্পিক নগরী সোচিতে। ইচ্ছে ছিল যুব উৎসবের পরে রাশিয়ার আশে পাশে আরও কয়েকটি দেশ ঘুরে আসা। ইউরোপে অবস্থানরত বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয় স্বজনদেরও আহবান জানালাম এই সময় সম্ভব হলে রাশিয়ায় চলে আসার জন্য। এতে তাদের রাশিয়া ভ্রমণও হল আবার আমাদের একটি পুনর্মিলনিও হল। অনেকে আসার প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে রণে ভঙ্গ দেন। শুভাকাঙ্খিরা অক্টোবরের শেষের দিকে মস্কোর তাপমাত্রা শূন্যের নিচে থাকার আশংকায় ঐ সময় ঠান্ডাজনিত সমস্যার জন্য মস্কো না যাওয়ার উপদেশ দেন। কারণ প্রায় ক্ষেত্রেই আমি দেশের ঠান্ডাই সহ্য করতে পারি না। অন্তত ৮ মাস দেশে জ্যাকেট পড়ে ঘুরাই। ঠান্ডার আশংকায় আমি একই সঙ্গে উদ্বিগ্ন ও আনন্দিত। প্রথমটির কারণ সঙ্গত। এর আগে বেশ কিছুদিন ইউরোপে ছিলাম। সেই থাকাটা মোটেও সুখকর ছিল না। ঠান্ডার যন্ত্রণায় দুই দফায় ২ সপ্তাহ ইংল্যান্ডের সুইনডন হাসপাতালে ছিলাম।
দুই দিন আইসিইউ তে। ভয়ংকর নিউমোনিয়া, রীতিমতো যমে মানুষে টানাটানি। এক্ষেত্রে মানুষ জিতলেও যমকে মোটেও পরাজিত বলা যাবে না। যম আমার জীবন বের করতে না পারলেও জীবনাশংকায় ইউরোপ থেকে বের করে দিয়েছে ঠিকই। এ ক্ষেত্রে যমে মানুষে ইংরেজীতে যাকে বলে ডরহ রিহ ংরঃঁধঃরড়হ । সেই থেকে ঠান্ডায় যমের ভয়ে জমে যাই। আর আনন্দের কারণ হলো, নতুন দেশ দেখবো, মরতে যদি হয় মরবো। মাত্র ১৫ দিন ১৫টি শীতের কাপড় একসঙ্গে পড়ে মস্কোয় টিকতে পারবো না। এটা হতে পারে না। সুতরায় যাওয়াটাই সই। ঠান্ডার কথা আর লিখব না। কেউ বিশ্বাস করে না। ভাবখানা এমন এ তো ঠান্ডা বলবেই।
কাগজপত্রে প্রস্তুতি শুরু হল মার্চ থেকে। আমরা পাসপোর্টের ফটোকপি পাঠালাম বাংলাদেশের এন.পি.সি (জাতীয় প্রস্তুতি কমিটি) তে। বিশ্ব ছাত্র যুব উৎসব উপলক্ষে ‘উফডি’ আন্তর্জাতিক প্রস্তুতি কমিটি (আই.ও.সি) গঠন করে। অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকটি দেশ নিজ নিজ দেশে জাতীয় প্রস্তুতি কমিটি গঠন করে। বাংলাদেশের জাতীয় প্রস্তুতি কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম.এম আকাশ। কো-চেয়ারম্যান বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি হাসান হাফিজুর রহমান সোহেল। সদস্য সচিব যুব ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক হাফিজ আদনান রিয়াদ। আমাদের ই-মেইল এ রাশিয়ান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একের পর এক মেইল আসতে লাগল। বিভিন্ন প্রশ্নমালা তৈরী করে উত্তর চাওয়া হল। আমরা কোন কোন খাবার খেতে চাই? আমাদের পোশাকের সাইজ কত? এই জাতীয় প্রশ্ন। আমরাও উÍত্তর দিতে থাকলাম। রাশিয়া ক্রমশ: আমাদের কাছে আসতে থাকলো। জুলাই মাসে ধানমন্ডির রাশিয়ান সংস্কৃতি কেন্দ্রে উৎসবে অংশগ্রহণে আগ্রহীদের নিয়ে একটি প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ২য় প্রস্তুতি সভাটি হয় আগস্টে। এতে আমাদের জানানো হয় ২০৩ জন উৎসবে যাওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন। এছাড়া সরাসরি অনলাইনে অনেকে আবেদন করেছেন। জানানো হল পুরো সেপ্টেম্বর মাস ধানমন্ডির রাশিয়ান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র আমাদের বিনা ভাড়ায় ব্যবহার করতে দিবে। সেখানে উৎসবের সেমিনারে আমরা কে কি বক্তব্য রাখব, বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উদীচী কোন কোন গান গাইবে সেগুলোর মহড়া দেয়া হবে। প্লেনের টিকেটগুলো আগেই কেটে ফেলতে পারলে খরচ কিছুটা কম পড়বে বলেও জানানো হল। সর্বোপরি রাশিয়া রাশিয়া হাওয়া নিয়ে ঢাকা থেকে হাওর পাড়ে ফিরে এলাম।
কিন্তু হায়! ঘটে গেল আন্তর্জাতিক দুর্যোগ। হঠাৎ করে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানাল, ৩৫ উর্ধ্ব কাউকে উৎসবে আসার জন্য ভিসা দেবে না। শীতল একটি ¯্রােত আমাদের মেরুদ-ের উপর দিয়ে বয়ে গেল। সুনামগঞ্জে বসে রাশিয়ার ঠান্ডা অনুভব করলাম। রাশিয়া যাওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিলাম। পরিচিত সবাইকে জানিয়ে দিয়েছিলাম, আমি যাচ্ছি। এমন কী স্পর্শকাতর আত্মীয় স্বজনদেরও। অধিক শোকে বরফ হয়ে গেলাম। অথচ যে সংগঠন এই উৎসব আয়োজন করেছে, তারা বয়স নিয়ে কোন প্রশ্ন তুলেনি। মহা সমস্যা দেখা দিল। বাস্তবতা হল আমরা বাংলাদেশের বেশীর ভাগই বয়সের ভারে ধরা খেলাম। তাদের কে বুঝাবে যে, আমাদের দেশের কিশোর, যুবক হতে শুরু করে ৩৫ বছরের পর। দেখা গেল এ সমস্যা শুধু বঙ্গ দেশীয় নয়। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলংকারও একই সমস্যা। শুরু হল উপমহাদেশীয় বিক্ষোভ। আই.ও.সি’র সাথে ঘন ঘন মিটিং হতে থাকলো রাশিয়ার নীতি নির্ধারকদের। ৩/৪ দিন এভাবে চললো। সর্বশেষে খবর জানার জন্য কেন্দ্রীয় কমিটিকে বিরক্ত না করে ফোন করলাম সিলেটে অবস্থানরত কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য পিনাক রঞ্জন দেবনাথকে। তিনি বলেন, ‘ভাই আমি কি করব, আমার নিজের বয়সই তো ৪০, তবে ধৈর্য্য ধরুন, বরফ গলতে শুরু করেছে।’
বরফ গলার কোন লক্ষণ দেখা দিল না বরং আমরা বরফ হতে শুরু করলাম। নিজেকে হালকা করার জন্য নানান বাহানা খুঁজেতে থাকলাম। বেশী ঠান্ডা, পেশায় অনেক ব্যস্ত, সময় নেই ইত্যাদি প্রচার করতে শুরু করলাম।
এবং গোপনে পিনাকের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলতে থাকলাম। খবর পেলাম যারা অনলাইনে সরাসরি আবেদন করেছে তাদের ইতোমধ্যে ভিসা দিয়ে দিয়েছে রাশিয়া। এবার পুরোপুরি আশা ছেড়ে দিয়ে পেশায় মনযোগ দিলাম। রাশিয়া নেয়ার জন্য ধার করে আনা লাগেজ ও ওভারকোট স্ব স্ব ব্যক্তির কাছে শুকনো মুখে ফেরত দিয়ে এলাম। ২২ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে পিনাক ফোন করে বললো, ভাই দারুন খবর! সীমিত পরিসরে ৩৫ উর্ধ্বদের রাশিয়া ভিসা দেবে, আপনি প্রস্তুত হোন। আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, প্রস্তুতি আমি ইতোমধ্যে ফেরত দিয়ে এসেছি। তোমাকে ও তোমার রাশিয়ান সরকারকে আর বিশ্বাস করা যায় না। পরের দিন রাতে সে ফোন করে বলল, ভাই প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় মেইল চেক করেন। অফার লেটার আসা শুরু হয়ে যেতে পারে আজ রাত থেকেই। তাকে তাচ্ছিল্যের ভাব দেখিয়ে সারারাত ল্যাপটপের সামনে বসে থাকলাম। ভোর ৫টায় আর টিকতে না পেয়ে ল্যাপটপের উপরই গড়িয়ে পড়লাম। প্রকৃতির নির্মম পরিহাস, সম্ভবত তখনই অফার লেটারটি আমার ল্যাপটপে এসে গড়িয়ে পড়ল। ভোর ছ’টায় পিনাকের ফোনে কাঁচা ঘুম ভাঙল। না, শুধু ঘুম না, ল্যাপটপও ভাঙল। পিনাক অত্যন্ত উচ্ছসিত হয়ে বলল, ভাই আমার অফার লেটার এসেছে। আপনারটা ? জানালাম, আমার ভাঙ্গা ল্যাপটপে রাশিয়ার অফার। এ অফার আমি রাখব কোথায় ?
অফার লেটার আসার পরও বিনা উস্কানীতে উপর্যুপুরি বিভিন্ন প্রশ্ন সম্বলিত তুফানের মতো ই-মেইল আসতে থাকলো। আমরাও তুফানের মতো উত্তর দিলাম। এক পর্যায়ে বলা হল পাসপোর্ট ও অফার লেটার প্রিন্ট করে ঢাকায় এসে রাশিয়ান এম্বেসী ফেস করার জন্য ঢাকা যাওয়ার আগে লাগেজ ও ওভারকোট আবার ধার করে আনলাম। একদিনে আমরা সবাই এম্বেসীতে যেতে পারিনি। সম্ভবত ২৫ তারিখে আমরা ৩৩জন এম্বেসীতে গেলাম। রাশান এম্বেসী গুলশান ২ এ। আমাদের বলা হল সকাল ৮টায় এম্বেসীতে আসতে। আমাদের কারো কারো আসতে সকাল ১০টা বেজে গেল। আমাদের আগে অন্তত: ১৫/২০ জন স্টুডেন্ট অ্যাম্বেসীতে ইন্টারভিউ দিল। তাদের কাছ থেকে জানলাম ভিসা দিবে কিনা সেটা তারা পরে জানাবে। আমরা সবাই প্রস্তুত হতে সাড়ে ১১টা বেজে গেল। ওদিকে ইন্টারভিউ এর সময় ১২টা পর্যন্ত। মাত্র আধ ঘন্টায় ৩৩ জনের ইন্টারভিউ নেয়া সম্ভব না। অ্যাম্বেসী আমাদের অনেক সহায়তা করল। কারো ইন্টারভিউ নিল না। সবার পাসপোর্ট রেখে দিল। জানাল ১ অক্টোবর আমাদের পাসপোর্টগুলো ফেরত দেবে। পাসপোর্ট নিতে নিজেকে আসতেও হবে না। প্রতিনিধি হিসাবে যার নাম লিখে দেব, তার কাছেই নাকি পাসপোর্ট ফেরত দেবে। এদিকে রাশান সরকারও নাকি আমাদের জন্য বিশেষ ছাড় দিয়েছেন। আমাদের কাছ থেকে অ্যাম্বেসী কোন ফিস নেয়নি। আবার আমাদের স্বাস্থ্য বীমাও লাগেনি। এতে আমাদের বেশ কয়েক হাজার টাকা বেঁচে যায়। তবে ফিরে আসার আগ মুহূর্তে কর্মকর্তারা জানালেন আসল কথা। রাশিয়া থেকে তাদের কাছে আমাদের ভিসা দেয়ার কোন নির্দেশনা আসেনি। নির্দেশনা না পেলে তারা খালি পাসপোর্ট ফেরত দেবে। আবারো ঐতিহাসিক রাশান অনিশ্চয়তায় পড়লাম। রাশিয়া মারাত্মক ঠান্ডা দেশ। ঠান্ডার কথা অনিশ্চয়তায় লিখব না।
পাষানে বুক বেঁধে সুনামগঞ্জে ফিরে এলাম। ১ অক্টোবর পাসপোর্ট দেবে। অক্টোবর বিপ্লবের উত্তেজনা অনুভব করলাম। রাশিয়া যাচ্ছি কি যাচ্ছি না নিকটজন জিজ্ঞেস করলে উদাস হয়ে যাই। উত্তর দেই “ আমি অপার হয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায় !’ আবারও লাগেজ ফেরত দিতে গেলাম। পথে বন্ধু বান্ধব ধরে বলল, দুই দিন পর পর লাগেজ নিয়ে এদিক ওদিক, কি ব্যাপার ? জানালাম, শুধু যাওয়া-আসা, শুধু স্রোতে ভাসা—— আপাতত রবীন্দ্রনাথ ছাড়া উপায় নেই। (চলবে)


