রোমেনা লেইস
কাকন বিবি খাসিয়া উপজাতির মহিলা। তার মূল বাড়ি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের নত্রাই নামক এক গ্রামে। গ্রামটি ভারত বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী। পাকিস্তান আমলে এক পশ্চিম পাকিস্তানি ই,পি,আর এর সদস্যের সাথে মন দেয়া নেওয়া চলছিল। তখনই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। কাকাই (পূর্বের নাম) চলে আসে পাকিস্তানে। খুঁজতে থাকে তার প্রেমিককে। সিলেট ও টেংরাটিলাতে গিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক ধর্ষিত হয়। এখানেই প্রতিশোধের স্পৃহা নিয়ে দেখা করে ছাতক এলাকার মুক্তিযোদ্ধা সাব সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন হেলালের সাথে। হেলাল সব কিছু জানার পর সেক্টর কমান্ডার মেজর মীর শওকত আলীর সাথে আলাপ করেন। প্রথম দিকে তাকে তারা বিশ্বাস করতে পারেননি। পরে ছাতক, দোয়ারাবাজার, টেংরাটিলার তথ্য আনার জন্য পাঠানো হত। বলা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্সের মাতাহরি যেভাবে নিজের ইজ্জত দিয়ে সব গোপন তথ্য আনতেন। পরে কাকন বিবি কমান্ডারদের বিশ্বাসে আসেন এবং তার অনেক তথ্য নিয়েই মুক্তিযোদ্ধারা অপারেশন করে কৃতকার্য হয়। পরে অনেক অপারেশনে সে অংশ নেয়।
শুক্রবার ভিক্ষে করতে করতে এক মহিলা পাকিস্তানীদের টেংরা ক্যাম্পের দিকে যাচ্ছে । শুক্রবার জুম্মার দিন। তখন আযানের সময়। রাস্তায় তাকে বন্দী করে ফেলল কয়েকজন পাকিস্তানী সৈন্য। সৈন্যরা তার সঙ্গে যে মুক্তিবাহিনীর যোগাযোগ আছে সেটা স্বীকার করানোর চেষ্টা করে প্রথমে। কিন্তু সেই মহিলার এক কথা-আমি আমার স্বামী আব্দুল মজিদ খানের খোঁজে ক্যাম্পে যাচ্ছি ।
এরপরই শুরু হয় তার উপর প্রচন্ড শারীরিক নির্যাতন। নির্যাতনের এক পর্যায়ে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। মাথায় পানি ঢেলে তাকে সুস্থ করার পর আবার শুরু হয় অত্যাচার। কিন্তু কিছুতেই আর কোন কথা বলে না। আর পাকিস্তানীরাও তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারে না। নাছোড়বান্দা হয়ে
ওরা তাকে গাছের সাথে বেঁধে নিষ্ঠুরভাবে পিটাতে শুরু করলো । সমস্ত শরীর দিয়ে দরদর করে রক্ত পড়ছে। এইভাবে দীর্ঘক্ষণ প্রচন্ড অত্যাচারে তার শরীর একেবারে ভেঙে পড়ে। আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলে সে। । এক পর্যায়ে পাকহানাদাররা মোটা লোহার শিখ গরম করে তার উরু দিয়ে ঢুকিয়ে দেয়। এই বীভৎ স নির্যাতনের পরও তার মুখ থেকে কোনো কথা বের করতে পারেনি পাকিস্তানি সৈন্যরা।
পাকিস্তানীদের নিষ্ঠুর অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করা এই নারীই হচ্ছেন কাঁকই; কাঁকন বিবি। ইতিহাস যাঁকে চেনে বীরাঙ্গনা কাঁকন বিবি নামে। শত অত্যাচার করেও পাকিস্তানী সৈন্যরা যাঁর মুখ থেকে সত্য বের করতে পারেনি। তিনি ছিলেন মুক্তিবাহিনীর ‘ইনফরমার’। তথ্য সংগ্রহ করে এনে মুক্তি বাহিনীর কমান্ডারকে জানাতেন।
ভিক্ষুকের বেশ ধরে জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানীদের ক্যাম্পে যেয়ে মুক্তিবাহিনীর জন্য খবর নিয়ে আসেন তিনি। কারণ তিনি জানেন এই সত্য কথাটি হায়েনার দল জেনে গেলে তা দেশের জন্য, দেশের মুক্তিবাহিনীর জন্য চরম অমঙ্গল বয়ে আনবে। কিন্তু তিনি তো দেশের অমঙ্গল হতে দিবেন না। আর তাই তো জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে পাকবাহিনীর নির্মম অত্যাচারের মুখেও তিনি চুপ করে ছিলেন।
পাহাড়ের নীচে সীমান্তের কাছাকাছি কাঁঠালবাড়ি গ্রাম। একটা গ্রাম্য বাজার। তার থেকে হাঁটা পথে মিনিট দশেক গেলে জিরারগাঁও। সেখানেই সরকারি খাস জমির ৭০ শতাংশের উপর বর্তমানে ঘর করে আছেন কাঁকন বিবি। স্থানীয় বাঙালিদের কাছে তিনি ‘খাসিয়া বিটি -নামে পরিচিত’। বাবার নাম গিসয়। মায়ের নাম মেলি। তিনি সবার ছোট মেয়ে কাঁতেক নিয়তা বা কাঁকন বিবি।
কাঁকন বিবির জন্ম বৃটিশ ভারতের মিজোরাম প্রদেশে এক খাসিয়া পরিবারে। তার বাবা গিসয়। জুমচাষের সাথেই আজীবন জড়িত ছিলেন। কাঁকন বিবির মায়ের নাম মেলি। তিনি স্বামীকে জুমচাষে সহযোগিতা করতেন এবং গৃহ সামলাতেন। গিসয়-মেলি দম্পতির ছিল তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় ছেলে উহর, মেঝ ছেলে উসাল, ছোট ছেলে উফান। আর বড় মেয়ে কাফল, পরিবারটি ছিল খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। কাঁকন বিবি ছোট, সবার আদরের ।
কাঁকন বিবির বয়স যখন ছয় মাস তখন এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে তাঁর বাবা গিসয় মারা যান। বাবার মৃত্যুর মাস ছ’য়েকের মাথায় চিরবিদায় নেন মা মেলিও। অভাবের সংসারে এই পাঁচটি এতিম সন্তান একেবারেই অসহায় হয়ে পড়ে তখন। গিসয়’র জমি-জিরাত বলতে তেমন কিছুই ছিল না। ফলে অল্প বয়েসি ভাইদের উপার্জনের জন্য কাজে লাগতে হয়। তাদের আর খুব বেশি পড়াশুনা করা সম্ভব হয়নি। তবে খাসিয়ারা যেহেতু একটি গোষ্ঠীবদ্ধ জীবন যাপন করে সেহেতু প্রতিবেশীদের কেউ কেউ তখন পরিবারটিকে বাঁচিয়ে রাখতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। গিসয়’র অন্য ভাইবোনদের অবস্থাও তেমন সচ্ছল ছিল না যে তাঁরা এতিম সন্তানদের লেখাপড়ার দায়িত্ব নেবে।
মা মারা যাবার পর ছোট্ট শিশু কাঁকন বিবিকে দেখাশোনা করতো তাঁর বড় বোন কাফল। খুশি কমান্ডারের সাথে বড়বোনের বিয়ে হয়ে যায়। কিন্তু তার বিয়ের পর কাঁকন বিবিকে দেখাশোনা করার আর কেউ রইল না। অবশেষে কাফলই তাঁর স্বামীর সহযোগিতায় কাঁকন বিবিকে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসে সন্তানের মতো মানুষ করতে থাকেন। খুশি কমান্ডার ছিলেন একজন উদার প্রকৃতির মানুষ।
খুশি কমান্ডারের গৃহস্থ পরিবারেই কাঁকন বিবির বেড়ে উঠা। মা বলতে তিনি বোঝেন বড় বোন কাফলকে আর বাবা বলতে বোঝেন খুশি কমান্ডারকে। খুশি কমান্ডারের পরিবারের অন্য সদস্যরা এতিম এই শিশুটিকে সীমাহীন স্নেহেই বড় করে তোলেন। কাঁকন বিবি তাঁর পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার পর এদেশকেই নিজের দেশ বলে জেনে এসেছেন। তিনি নিরক্ষর। স্কুল কী জিনিস তা তাঁর বাল্যকালে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। বড় বোনের পরিবারে বেড়ে ওঠেন ।
কাঁঠালবাগান গ্রামটি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের খুব কাছে। গ্রাম থেকে একটু দূরেই ছিল পাকিস্তান সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর ক্যাম্প। সেই ক্যাম্পে সৈনিক হিসাবে কাজ করত পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের আব্দুল মজিদ খান। দেখতে বেশ লম্বা-চওড়া। খুশি কমান্ডারের সাথে মজিদ খানের বেশ চেনা-জানা ছিল, বাড়িতেও আসতো মাঝেমধ্যে। খুশি কমান্ডারই একসময় আবদুল মজিদ খানের সাথে কাঁকন বিবির বিয়ের ব্যবস্থা পাকা করেন। পারিবারিকভাবেই সে বিয়ে সম্পন্ন হয়। কাঁকন বিবির সেই বিয়ের সাল বা তারিখ কোনোটাই মনে নেই। তবে তিনি জানান, সময়টা সংগ্রামের ১২/১৩ বছর আগে। সেই অনুযায়ী ১৯৫৮/৫৯ সাল হতে পারে।
বিয়ে হওয়ার পর কাঁকন বিবি ভগ্নিপতির বাড়ি ছেড়ে স্বামীর সঙ্গে কর্মস্থল বোগলা ক্যাম্পে এসে ওঠেন। সেখানেই নতুন করে সংসার শুরু করেন। কাঁকন বিবি স্মরণ করতে পারেন এই বোগলা ক্যাম্পে তিনি প্রায় পাঁচ বছর ছিলেন। আব্দুল মজিদ খান বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে বদলিও হতেন। কাঁকন বিবিকেও তিনি সাথে নিয়ে যেতেন তখন। সে সময় কাঁকন বিবি সুনামগঞ্জে, সিলেটে এবং ছাতকেও কিছুদিন স্বামীর সাথে কাটান। বিবাহিত জীবনের দীর্ঘ আট বছরে তাঁদের ঘরে তিনটি সন্তান জন্ম নেয়। কিন্তু জন্মের পরপরই তারা মৃত্যুবরণ করে। খুব সম্ভবত এ কারণেই আব্দুল মজিদ খান সিলেট আখালিয়া ক্যাম্পে থাকা অবস্থায় কাঁকন বিবিকে ছেড়ে হঠাৎ করেই উধাও হয়ে যান। কাঁকন বিবি একা হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত স্বামীর কোনো খোঁজ-খবর করতে না পেরে কাঁকন বিবি আবার তাঁর ভগ্নিপতি ও বোনের সংসারে ফিরে আসেন। এরপর আর কোনোদিন আব্দুল মজিদ খানের সাথে তাঁর দেখা হয়নি। মজিদ খানও তাঁর কোনো খোঁজ-খবর নেয়নি।
স্বামী পরিত্যক্ত হয়ে পুনরায় কাঁঠালবাড়িতে ফিরে আসায় পরিবারের অনেকেই মনক্ষুন্ন হন। চেষ্টা করতে লাগলেন আবার তাঁকে বিয়ে দেয়া যায় কি না। এই অবস্থায় কাঁকন বিবি প্রায় বছর দেড়েক ভগ্নিপতির সংসারেই থাকলেন। শেষ পর্যন্ত খুশি কমান্ডারই প্রতিবেশী শাহেদ আলীর সাথে কাঁকন বিবির পুনরায় বিয়ে দেন। শাহেদ আলী ছিলেন সাধারণ কৃষক। তার আগেও সংসার ছিল কিন্তু সেই সংসারে কোনো সন্তান ছিল না। মূলত সন্তানের আশাতেই তিনি কাঁকন বিবিকে বিয়ে করেন। এরমধ্যেই কাঁকন বিবির গর্ভে জন্ম নেয় এক কন্যা সন্তান। নাম সখিনা বিবি। সন্তানের জন্মের সাল বা তারিখ মা-মেয়ের কেউই জানেন না। তবে কাঁকন বিবির দেয়া তথ্য মতে, সংগ্রামের সময় সখিনা বুকের দুধ খায়; সাত মাসের শিশু। সে হিসাবে সত্তরঁ সালে সখিনার জন্ম।
— এর মধ্যেই শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ। সুনামগঞ্জ-সিলেট অঞ্চলটি ছিল পাঁচ নম্বর সেক্টরের অধীন। এই সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন লে. কর্নেল মীর শওকত আলী। কাঁকন বিবি যে গ্রামে থাকতেন তার পাশেই মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। আবার এই ক্যাম্প থেকে খানিকটা দূরেই ছিল পাকিস্তানীদের ক্যাম্প। যা স্থানীয়ভাবে টেংরা ক্যাম্প নামে পরিচিত। মুক্তিবাহিনীর যে ক্যাম্প ছিল তার কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন শহীদ মিয়া। মীর শওকত আলী একদিন এই ক্যাম্প পরিদর্শনে আসেন। তিনিই মূলত কাঁকন বিবিকে পাকিস্তানীদের ক্যাম্প থেকে খবর সংগ্রহের কাজে লাগানোর জন্য উৎসাহিত করেন। কাঁকন বিবির সাথে সাক্ষাৎ করে তিনি তাঁকে কাজের গুরুত্বও বুঝিয়ে বলেন। কাঁকন বিবির স্বামী যেহেতু আগে পাকিস্তানী ক্যাম্পে কাজ করত সুতরাং তাঁর পক্ষেই সম্ভব সেখানকার খবরাখবর এনে মুক্তিবাহিনীর কাছে প্রেরণ করা। কাঁকন বিবিও উৎ সাহ নিয়ে দেশের জন্য কিছু একটা করতে পারবেন এই ভেবে রাজি হয়ে যান।
ইতিমধ্যে তাঁর ভগ্নিপতি খুশি কমান্ডারকে পাকিস্তানিরা হত্যা করে ফেলে। পিতার মতো স্নেহ দিয়ে যে লোকটি তাঁকে বড় করে তুলেছিল, যে ছিল তাঁর সুখ-দুঃখের সাথি সেই খুশি কমান্ডারকে একদিন পাকিস্তানিরা ধরে নিয়ে যায়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ভারত থেকে যেসব মুক্তিযোদ্ধা বাংলাদেশে আসে তাঁদেরকে তিনি সহযোগিতা করেন। স্থানীয় রাজাকাররাই পাকিস্তানী ক্যাম্পে গিয়ে এই তথ্য জানায়। খুশী কমান্ডারকে পরে হত্যা করে পাকহানাদার বাহিনী। এই ঘটনায় কাঁকন বিবি খুবই কষ্ট পান। প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে উঠেন। নিজের জীবনকেও তখন তাঁর কাছে একেবারে তুচ্ছ মনে হয়। তিনি ভাবতে থাকেন কীভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করা যায়, কীভাবে এদেশ থেকে পাকহানাদার বাহিনীকে হটানো যায়।
কাঁকন বিবি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দন একজন ‘ইনফরমার’ হিসাবে। যাঁর কাজ ছিল পাকিস্তানী ক্যাম্পে ঢুকে তাদের হাতিয়ারের ধরন, সংখ্যা ও সৈনিকদের অবস্থান সম্পর্কে খবর সংগ্রহ করা। স্বামী শাহেদ আলী তাঁর এই কাজে বাধা দিলেও তিনি তা উপেক্ষা করেন। সেই কঠিন দায়িত্ব পালন করার জন্য তিনি কয়েক দিন সময় নেন। চিন্তা করেন। পরে নিজেই বুদ্ধি খাটিয়ে একটি ময়লা ও ছেঁড়া কাপড় পরে একদিন দিনের বেলায় ভিক্ষা করতে করতে রওনা দেন টেংরা ক্যাম্পের দিকে। এলাকার লোকজনদের অনেকেই তখন শরণার্থী হয়ে ভারতে চলে গেছে। ফলে তাঁকে খুব বেশি কেউ চিনতেও পারল না। প্রথমে টেংরা ক্যাম্পের বাইরে কয়েকটি বাড়িতে ভিক্ষা করেন। পরে কৌশলে এক সময় ঢুকে পড়েন টেংরা ক্যাম্পের ভিতর। ভিক্ষা চান পাকিস্তানী মিলিটারিদের কাছেই। তারা কিছু ময়দা ও আটা ভিক্ষা দেয়। ভিক্ষা করার পাশাপাশি মিলিটারিদের কাছে তাঁর প্রথম স্বামী আব্দুল মজিদ খানের খোঁজও করেন। নানা কায়দায় কিছুক্ষণ ক্যাম্পের ভেতর অবস্থান করে সবকিছু দেখার চেষ্টা করেন এবং প্রথম দিন তিনি খুব ভালভাবেই তাঁর দায়িত্ব পালন করেন। টেংরা ক্যাম্পে তিনি যা দেখেছেন তা সবই এসে জানান কোম্পানি কমান্ডার শহিদ মিয়াকে। মুক্তিবাহিনী তখন সেই মোতাবেক তাঁদের অপারেশন চালায় এবং এতে তাঁরা সফলও হয়।
দ্বিতীয় দিনও কাঁকন বিবি একই কায়দায় টেংরা ক্যাম্পে প্রবেশ করেন। তখন ক্যাম্পের একটি ঘরে কয়েকজন মেয়েকেও দেখতে পান। মেয়েরা ছিল ক্লান্ত এবং বিপর্যস্ত। কাঁকন বিবির বুঝতে বাকি থাকল না এদেরকে ধরে নিয়ে আসা হয়েছে এবং শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। দ্বিতীয় দিন তিনি যখন মিলিটারির কাছে তাঁর স্বামীর খবর জানতে চান তখনই তাঁকে আটক করে ফেলা হয়। কয়েকজন পাক হানাদার বাহিনীর সদস্য মিলে চালায় শারীরিক নির্যাতন। কিন্তু তখনো পর্যন্ত কাঁকন বিবি যে একজন ‘ইনফরমার’ এটা তারা ভাবতে পারেনি। নির্যাতন শেষে তারা কাঁকন বিবিকে ছেড়ে দেয়। অত্যাচারের মুখেও কাঁকন বিবি ঠিকই সেদিন সমস্ত তথ্য এনে কোম্পানি কমান্ডারকে জানান। তিনি কমান্ডারকে বুঝতে দেননি তাঁর উপর নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়েছে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর পশুরা।
এই ঘটনার পর অবশ্য কাঁকন বিবি বেশ কিছুদিন আর টেংরা ক্যাম্পে যাননি। টেংরা ক্যাম্পে ‘ইনফরমার’ হিসাবে কাজ করেছেন কাঁকন বিবি, এই খবর জানামাত্রই দ্বিতীয় স্বামী শাহেদ আলী রেগে আগুন হয়ে গেলেন। তিনি তাঁকে প্রচ- মারধর করলেন। এক পর্যায়ে তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন ‘নষ্টা মেয়ে’ বলে। একমাত্র মেয়ে সখিনা বিবিকে শাহেদ আলী নিজের কাছেই রেখে দিলেন। কাঁকন বিবি এখন একেবারেই গৃহহীন, সহায়-সম্বলহীন। কোথাও যাওয়ার তাঁর কোনো জায়গা রইল না। দ্বিতীয়বারের মতো ভেঙে গেল তাঁর সংসার। শাহেদ আলী যুদ্ধের বাজারেই আবার বিয়ে করলেন।
এই দুঃসময়েও কাঁকন বিবি ‘ইনফরমার’ হিসেবে কাজ করার জন্য যান সুনামগঞ্জে অবস্থিত পাক হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে। সেখান থেকে যান সিলেট ক্যাম্পে। পরে যান গোবিন্দগঞ্জ, জাউয়া বাজার ক্যাম্পে। সব জায়গাতেই তাঁর একই কাজ। ক্যাম্পের অবস্থান, সৈন্য সংখ্যা, হাতিয়ার ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা নিয়ে আসা। যেতেন সেই ভিক্ষুকের বেশেই। পাকিস্তানী সৈন্যদের কাছে খোঁজ করতেন নিজের প্রথম স্বামীর। কিন্তু যুদ্ধের বাজারে কে রাখে কার খবর! বরং পাকিস্তানী সৈন্যরা কাঁকন বিবিকে আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতনই চালাত। এতকিছুর পরেও কাঁকন বিবি কিন্তু নিজের কাজ সম্পর্কে ছিলেন পূর্ণ মাত্রায় সচেতন। কারণ তাঁর দেয়া তথ্য মুক্তিযোদ্ধাদের অপারেশনে জয়ের ব্যাপারে মূল ভূমিকা পালন করত। এভাবে অবশ্য তিনি আরো দুই-তিনটি ক্যাম্পে যান।
বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে কাজ শেষ করে কাঁকন বিবি আবার নিজের গ্রাম কাঁঠালবাড়িতেই ফিরে আসেন। দীর্ঘদিন পর কোম্পানি কমান্ডার শহিদ মিয়ার নির্দেশে তৃতীয়বারের মতো তিনি আবার যান টেংরা ক্যাম্পে। তৃতীয়বারও নানা নির্যাতনের মুখে পড়েন। টেংরা ক্যাম্পে তখন আরও অনেক বাঙালি মেয়েকেই বন্দি করে রেখেছে পাক হানাদার বাহিনী।
কাঁকন বিবি ক্যাম্প থেকে খবর সংগ্রহ করে মুক্তিবাহিনীর কাছে প্রেরণ করছেন, এ নিয়ে স্থানীয় কয়েকজন রাজাকার সন্দেহ করে। তবে তারা এ ব্যাপারে খুব বেশি নিশ্চিত ছিল না। তবু ওইসব রাজাকাররা পাকিস্তানী ক্যাম্পে গিয়ে অফিসারদের কাছে তাদের সেই সন্দেহের কথা জানায়। তাঁর ভগ্নিপতি খুশি কমান্ডার যে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক ছিল এবং তাকে যে এ কারণে হত্যা করা হয়েছে সে কথাও জানায়। এরপর পাকিস্তানী সৈন্যরা তাকে ধরে নিয়ে যেয়ে অকথ্য নির্যাতন চালায়। যে নির্যাতনের বর্ণনা শুরুতেই বলা হয়েছে।
কাঁকন বিবিকে নির্যাতনের এক পর্যায়ে পাকবাহিনীর বড় অফিসার এল সেখানে, সে এসে দেখে কাঁকন বিবি অজ্ঞান। অফিসার ডাক্তার ডাকালেন। ডাক্তার এসে ইনজেকশান দিয়ে কাঁকন বিবির জ্ঞান ফেরাল। তারপর তাকে কিছু খাবারও দেয়া হলো। কিন্তু কাঁকন বিবির আর খাবার মতো সামর্থও ছিল না। উরুতে যে গরম লোহার শিক ঢোকানো হয়েছে তার যন্ত্রণায় তিনি সবকিছু অন্ধকার দেখছেন। এর মধ্যেই অফিসার তাকে জিজ্ঞেস করল
-তুমি কেন ক্যাম্পে যাও?’
কাঁকন বিবি অস্ফুট স্বরে উত্তর দিলেন,
— ‘স্বামীর খোঁজে।’
অফিসার আবার জিজ্ঞেস করল
-কে তোমার স্বামী?’
কাঁকন বিবি বললেন
— আব্দুল মজিদ খান।’
অফিসার বলল — সে কোথায় থাকে?’ কাঁকন বিবি বললেন- ‘সিলেটে।’
ব্যস, এটুকুই। আর কিছু বলতে পারেননি কাঁকন বিবি। আবার তিনি অজ্ঞান হয়ে গেলেন।
অফিসার তখন ক্যাম্পে ফিরে গিয়ে সিলেটে ওয়ারলেস করল। সেখানে সত্যিকার অর্থেই আব্দুল মজিদ খান নামে কোনো সৈনিক আছে কি না তা জানার জন্য। আব্দুল মজিদ খান তখন সিলেটেই ছিলেন। কিন্তু তিনি ক্যাম্পের বাইরে ছিলেন। মজিদ খান ক্যাম্পে ফিরে আসার সাথে সাথেই অফিসার তার সাথে কথা বলে। অফিসার মজিদ খানের কাছে জানতে চায়, কাঁঠালবাড়িতে তার কোনো স্ত্রী আছে কি না? মজিদ খান জানালো যে, কাঁকন বিবি নামে তার স্ত্রী কাঁঠালবাড়িতে থাকে এবং সে খাসিয়া উপজাতি।
অফিসার মজিদ খানের কাছ থেকে এই তথ্য পাওয়ার পর কাঁকন বিবিকে পাক হানাদাররা আর কোনো অত্যাচার করেনি এবং তাঁকে ছেড়ে দেয়া হয়। ছেড়ে দিলেও কাঁকন বিবির অবস্থা তখন সঙ্গীন। তার যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই। তাকে নেয়ারও কেউ নেই। তিনি রাস্তাতেই এই অসুস্থ শরীর নিয়ে পড়ে রইলেন। পরে অবশ্য লোকজন তাকে ধরাধরি করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়।
তবে তার সাথে আর কোনোদিন দেখা না হলেও এই মজিদ খানের কারণেই কাঁকন বিবি সেবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন।
এরপর মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টিই কাঁকন বিবির কেটেছে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি আর কোনো কাজকর্ম করতে পারেননি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য কাঁকন বিবিকে ‘বীরাঙ্গনা’ উপাধি দেয়া হলো।
লেখক: কবি ও গল্পকার। বর্তমানে প্রবাসী।


