দুনিয়ার সকল মেহনতী মানুষের শপথ গ্রহণ ও সংহতি প্রকাশের দিন মহান মে দিবস আজ। ১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনরত শ্রমিকদের উপর পুলিশের গুলি চালানোয় ১০-১২ জন শ্রমিক গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। ১৮৮৯ সনে ফরাশি বিপ্লবের শতবার্ষিকী উপলক্ষে প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের প্রথম কংগ্রেসে হে মার্কেটে আত্মদানকারী শহীদদের স্মৃতিবিজরিত ১ মে কে আন্তর্জাতিকভাবে পালনের প্রস্তাব আসে। ১৮৯১ সনে অনুষ্ঠিত ২য় কংগ্রেসে এই প্রস্তাব অনুমোদন হয়। এরপর থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মহান মে দিবস পালন শুরু হয়। আজ সরকারি ছুটির দিন। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে আজ দিবসটি পালিত হচ্ছে নানা আয়োজনে। আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবসে আমরা বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল শ্রমজীবী জনতার প্রতি অভিবাদন জানাই।
পূঁজিবাদ বিকশিত হওয়ার পর শ্রেণি হিসাবে শ্রমিকদের আত্মপ্রকাশ ঘটে। শ্রমিকদের অমানুষিক পরিশ্রমে বিভিন্ন মিল-ফ্যাক্টরিতে উৎপাদিত পণ্য সামগ্রীর মুনাফার সিংহভাগ মালিক শ্রেণির ভোগে চলে যেত। শ্রমিকদের ভাগ্যে জুটতো তীব্র বঞ্চনা, নির্যাতন, অপ্রতুল মজুরি আর কঠোর খাটুনি। তাদের ছিল না অবসর, বিনোদন কিংবা বিশ্রামের সুযোগ। মূলত সে সময়ে মেশিন আর শ্রমিক নামক মানুষের মধ্যে কোন প্রভেদ বোধ করতেন না মুনাফাখোর মালিক শ্রেণি। এই বঞ্চনার বিরুদ্ধে শ্রমিকদের সংঘটিত আন্দোলন সংগ্রামের একটি অংশই ছিল আমেরিকার হে মাকের্টের নির্মমতা। অবশ্য পরে শ্রমিকরা নিজেদের ৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিনোদন ও ৮ ঘণ্টা বিশ্রামের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বিজয়ী হন। শ্রমিকদের বলা হয় সভ্যতার নির্মাতা। তাঁরা উৎপাদকগোষ্ঠী। পৃথিবীর তাবৎ অগ্রগতি থমকে দাঁড়াবে শ্রমিক শ্রেণির শূন্যতায়। কিন্তু শোষণবাদী অর্থনীতি ও রাজনীতির কারণে শ্রমিক শোষণের সেই ধারাবাহিকতা আজও দূর হয়নি। আজও শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই সংগ্রামে আত্মাহুতি দিতে হয়। এ রকম প্রেক্ষাপটে মে দিবস অন্যরকম গুরুত্ব নিয়ে সকলের সামনে হাজির হয়।
ব্ংালাদেশের গার্মেন্টস খাত থেকে শুরু করে নৌযান খাত পর্যন্ত সর্বত্র শ্রমিকদের নানা অসন্তোষ লক্ষণীয়। অন্যদিকে শ্রমিক নেতৃত্বে চরম সুবিধাবাদীতা, আপোষকামীতা বিরাজমান। বহু শমিক সংগঠনের শ্রমিক স্বার্থ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখার পরিবর্তে মালিকের স্বার্থ রক্ষা ও ক্ষমতাসীনদের তোষণ করাটাই প্রধান কর্তব্যে পরিণত হয়েছে। এমনও শ্রমিক নামধারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে যাদের প্রধান ক্জা হলো বিভিন্ন ধনাঢ্য ও ক্ষমতাসীনদের সংবর্ধনা দেয়া। অনেকে আজ নানা স্পন্সর থেকে অর্থ নিয়ে মে দিবস পালনে ব্যস্ত থাকবেন। এরকম শ্রমিক সংগঠন যে কখনও শ্রমিক শ্রেণির মহান আদর্শকে ধারণ করতে ব্যর্থ তা অবধারিত সত্য। শ্রমিক সংগঠনগুলোকে আজ তাই একই সাথে শপথ নিতে হবে নিজেদের ইতিহাস নির্ধারিত দায়িত্ব পালনেরও।
শ্রমিক স্বার্থ সংরক্ষণের অর্থ কখনও মালিকের স্বার্থ হানি করা নয়। মালিক-শ্রমিক সৌভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দের উপর শিল্প প্রতিষ্ঠানের উন্নতি নির্ভর করে। মালিক-শ্রমিক পরষ্পর পরিপূরক। এর একটির অবর্তমানে অন্যটি অচিন্তনীয়। সুতরাং শ্রমিক স্বার্থের কথা বলে মালিকদের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলা এক ধরনের হঠকারিতা। হঠকারিতা নয় দরকার মধ্যস্ততার। আর মধ্যস্ততার প্রধান অবলম্বন হলো সৎ ও দক্ষ দর কষাকষি সংস্থার (সিবিএ)। বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় অধিকাংশ শ্রম সেক্টরে এখন তল্পিবাহক সিবিএ নেতৃত্ব বিরাজিত। এই দালাল নেতৃত্বকে বর্জন করার শপথ গ্রহণের দিনও আজকের দিনটি।
মে দিবসের এই মহান দিনে আমরা কামনা করি শ্রমিক-মালিক সম্পর্কের আরও উন্নতি, শিল্পখাতে শ্রমবান্ধব পরিবেশের নিশ্চয়তা সর্বোপরি শ্রমিকদের মানুষ তথা সভ্যতার নির্মাতা হিসাবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠুক।

