আচরণবিধি লঙ্ঘন ও ইউপি নির্বাচনের রাজনৈতিক চরিত্র

তাহিরপুরে সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন নৌকা প্রতীকের পক্ষে ভোট চেয়েছেন বলে রবিবার দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে। তাহিরপুর উপজেলা সদরে অনুষ্ঠিত বঙ্গবন্ধু-বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মন্ত্রী এই আহ্বান জানিয়েছেন। মন্ত্রীর এই ভোট প্রার্থনার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘিত হয়েছে বলে সংবাদে ইঙ্গিত করা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আচরণ বিধি অনুসারে ক্ষমতাসীন কোন সাংসদ বা মন্ত্রী কোন প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিতে পারেন না। সুতরাং তাহিরপুরে রতন এই আচরণবিধি নিজেই ভঙ্গ করেছেন, এটি ঠিক। তবে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বর্তমান হাল-হকিকত অনুসারে এলাকায় সংসদ সদস্যের প্রভাব অনস্বিকার্য। চলমান ইউপি নির্বাচনের মনোনয়ন প্রাপ্তি থেকে বিজয় অর্জন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের আশির্বাদ ও প্রত্যক্ষ-প্রচ্ছন্ন সমর্থন অপরিহার্য। এর আগে ছাতক বা দোয়ারাবাজারের নির্বাচনের সময়ও ওই এলাকার সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিকের কৌশলী প্রচারণার বিষয়টি সংবাদ মাধ্যমে এসেছে। দিরাই-শাল্লায় সংসদ সদস্য সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত বয়স ও অসুস্থতাজনিত কারণে ঢাকায় বসেই প্রার্থী বাছাই ও বর্তমান প্রচারণাপর্বে ভূমিকা রাখছেন। দেশের সকল স্থানেই একই অবস্থা। সুতরাং আচরণবিধিতে উল্লেখ আছে কিন্তু নানা কৌশলে একে ভাঙা হ্েচ্ছ এমন বিধির স্বার্থকতা কী আমরা বুঝতে পারি না। এমন না যে, এই বিধি লঙ্ঘনের দায়ে নির্বাচন কমিশন কোথাও কোন সংসদ সদস্যকে সাবধান করে দিয়েছেন। সকলেই যখন করছেন তখন তাহিরপুরে সাংসদ রতন নিজ প্রার্থীদের জিতিয়ে আনতে কৌশলী ভূমিকা রাখবেন এ আর আশ্চর্য কি।
আমাদের কথা সেটি নয়। যেহেতু রাজনৈতিক পরিচয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে সেখানে রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রচারণায় অংশ নিবেন, এরকমটিও বরং স্বাভাবিক। সংসদ সদস্য হলেই তিনি প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন না এটি ইউপি নির্বাচনের রাজনৈতিক মেজাজের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ। সরকারি দলের পক্ষ থেকে এ নিয়ে ইতোপূর্বে নির্বাচন কমিশনে দাবিও জানানো হয়েছে। সরকারি দলের বক্তব্য হলো, যেখানে একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর প্রচারণায় অংশ নিতে বাধা নেই সেখানে একজন সংসদ সদস্য প্রচারণায় আসতে পারবে না, এটি অসমতা। সরকারি দলের দাবির মধ্যে যথেষ্ট যুক্তি আছে সত্য, কিন্তু যেহেতু এখন পর্যন্ত এটি গৃহীত হয়নি তাই সরকারি দলের এটি মেনে চলাই উচিৎ। নতুবা নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ও প্রভাবমুক্ত থাকার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
রাজনৈতিক ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ক্রমশই বিতর্কিত হচ্ছে। বিশেষ করে প্রার্থী বাছাইর বিষয়টি ঢালাও সমালোচনার সন্মুখীন হয়েছে। খোদ সরকারি দলের প্রার্থীরাই এমন অভিযোগ তুলছেন। রবিবার দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর এমন একটি সংবাদ ছেপেছে যেখানে বিশ্বম্ভরপুরের ফতেপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী রণজিৎ চৌধুরী রাজন এমন অভিযোগ এনেছেন। চলমান ও শেষ হওয়া ইউপি নির্বাচনের সর্বত্রই এই অভিযোগ ছিল জোরালো। অনেক যোগ্য প্রার্থীরা মনোনয়ন পাননি, অনেক জনপ্রিয়রা দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে নির্বাচন থেকে দূরে সরে গেছেন, অনেকে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। সরকারি দলের অনেক প্রার্থীর লজ্জাজনক পরাজয় ঘটেছে। অপরদিকে মুষ্টিমেয় নেতারা মাসাধিককাল ঢাকায় আরামপ্রদ ভ্রমণ করেছেন কাউকে মনোনয়ন পাইয়ে দিতে, বাড়তি উপার্জন করেছেন অনেকে এবং সেটি মোটা অংকেরই। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কোন নির্বাচনের এতোটা কুশ্রী অবস্থা আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হবে এটি কেউ কল্পনাও করিনি।
সুতরাং এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ইউপি নির্বাচনের রাজনৈতিক চরিত্র বজায় রাখা না রাখা বিষয়ে নীতি নির্ধারকদের এখন থেকেই চিন্তা করা উচিৎ। একটি উত্তম নির্বাচনী ব্যবস্থা নির্বাচকম-লীর কাম্য, সেটি রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক হতে পারে। কারণ শেষ পর্যন্ত সাধারণ নির্বাচকম-লীর সেবা নিশ্চিত করাই সকল উপায় উদ্ভাবনের মূল লক্ষ।