দলীয় ভিত্তিতে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদের নির্বাচন হওয়ার কারণে এখন তৃণমূলের রাজনীতিতে ব্যাপক গতিসঞ্চার হয়েছে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিদিনই একাধিক স্থানে ইউনিয়ন পর্যায়ের সভা করে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করে উপজেলা কমিটির নিকট পাঠাচ্ছে। উপজেলা কমিটি ইউনিয়নের প্রস্তাব বিবেচনা করে সেটি সংশোধন অথবা ঠিক রেখে জেলা পর্যায়ে পাঠাবে। জেলা থেকে যাবে কেন্দ্রীয় কমিটিতে এবং সেখান থেকেই দেওয়া হবে চূড়ান্ত মনোনয়ন। রাজনীতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের এই উল্টো পিরামিড পদ্ধতিটি অর্থাৎ তৃণমূল থেকে ধাপে ধাপে উপরে উঠার সংস্কৃতি একটি ভাল জিনিস। এই পদ্ধটিকেই গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা বলা হয়। উপর থেকে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার একনায়কসুলভ সংস্কৃতির বিপরীতে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা অনুসরণের এই রীতি দেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেই আমদের বিশ্বাস। ইউনিয়ন পরিষদের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করতে এখন আওয়ামী লীগকেই বেশি তৎপর দেখা যাচ্ছে। বিএনপি এখনও সেরকমভাবে মাঠে নামেনি। তবে ভিতরে ভিতরে তারাও দল ঘুচিয়ে রেখেছে। হাইকমান্ডের সবুজ সংকেত পাওয়ার পরই দলটি গা ঝাড়া দিয়ে কাজে লেগে যাবে বলে সকলের ধারণা।
বিভিন্ন জায়গায় এক দল থেকে একাধিক ব্যক্তি চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করার জন্য ইউনিয়ন কমিটির নিকট অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। এইক্ষেত্রে বিভিন্ন জায়গায় ভোটাভোটির আয়োজন করা হচ্ছে। অধিক ভোটপ্রাপ্ত ব্যক্তিটিকে তালিকার শীর্ষে রেখে তিনজনের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। তাহিরপুরের বাদাঘাট ইউনিয়ন কিংবা জগন্নাথপুরের রানীগঞ্জ ইউনিয়নে এমন ভোটাভোটির মাধ্যমে প্রার্থীতা নির্ধারণের বিষয়টি গণমাধ্যমসূত্রে জানা গেছে। নেতৃত্ব নির্বাচনের এই পদ্ধতিটি যদি সব রাজনৈতিক দলের সকল পর্যায়ে চালু করা যেত তাহলে আমাদের দেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন ঘটে যেত। তবে আশার কথা হলো এই যে, ইউনিয়ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গণতান্ত্রিক রীতি চর্চার যে অভ্যাস গড়ে উঠছে সেটি একসময় আরও উচ্চ পর্যায়ে প্রভাব ফেলতে পারে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে রাজনৈতিক চরিত্র দেওয়ার প্রথম সুফল হিসাবে এই জিনিসটিই প্রকাশিত হয়েছে। আমরা এমন পদ্ধতির আরও বিস্তৃতি ও কার্য়কারিতা কামনা করছি।
প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলো যদি গণতান্ত্রিক অনুশীলনের পরিবর্তে প্রভাবিত হয়ে কাজ করেন তাহলে সেখানে দলের বিপর্যয় আসতে বাধ্য। আমরা কামনা করি প্রতিটি স্তরে দলের সবচাইতে যোগ্য ও জনপ্রিয় একইসাথে সৎ ও দক্ষ ব্যক্তিটিই যাতে দলীয় মনোনয়ন লাভে সক্ষম হয়। তাহলেই কেবল তৃণমূলের এই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানটি সক্ষম ও কার্যকর হিসাবে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। এ প্রসঙ্গে আমরা প্রত্যাশা ব্যক্ত করতে চাই, ইউনিয়ন পর্যায় থেকে যেসব প্রস্তাব উপজেলা বা তদুর্ধ স্তরে পাঠানো হচ্ছে সেখানে যাতে তৃণমূলের প্রস্তাবকে পালটে ফেলা না হয়। বিগত পৌরসভা নির্বাচনে আমরা দেখেছি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কয়েকটি ক্ষেত্রে তৃণমূলের প্রস্তাব পরিবর্তন করে ভিন্ন প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছেন। এটি করা হলে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা বিনষ্ট হওয়ার পাশাপাশি দলের গণতান্ত্রিক চর্চাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর অন্যতম দায়িত্ব হলো জনগণকে শিক্ষা দেওয়া। মূলত দলগুলো নিজেদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই জনসাধারণকে সঠিক করণীয় সম্পর্কে শিক্ষা দিতে পারে। দলীয় চর্চার ধরন-ধারণ দেশের অন্যান্য স্তরেও সংক্রমিত হয়। দুঃখের বিষয় হলো আমাদের দেশের প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলো কখনও জনগণকে শিক্ষিত করে তোলার কর্মসূচিগুলোকে গুরুত্ব দেয় না। এবার যখন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চর্চা শিক্ষা দেয়ার একটি সুযোগ তৈরি করে দিল তখন সেটি ইতিবাচকভাবেই সকল দল কাজে লাগাবে, এটি আমাদের একান্ত প্রত্যাশা।

