আইনের শাসন ও দেবীরাম রবিদাস

অ্যাড. প্রসেনজিৎ দে
১৯৯০ ইং সনের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ২২[গ] ধারায় আছে বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে দেশীয় তৈরি চোলাই মদ নিজ হেফাজতে রাখা এবং ২০ ধারায় আছে মদ তৈরির উপকরণ নিজ হেফাজতে রাখা। দেবীরাম রবিদাস, পিতামৃত তুপানী রবিদাস, গ্রাম মকসুদপুর, থানা দিরাই মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের উপরোক্ত ধারা সমুহের অভিযোগে ৪টি মামলায় ৬/১০/১৫ইং হইতে পাঁচ মাস যাবৎ হাজতাবদ্ধ আছে। বাড়িতে চারটি বাচ্চা নিয়ে স্ত্রী ময়না রবিদাস খেয়ে না খেয়ে অত্যন্ত মানবেতর ভাবে দিনাতিপাত করছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০৪ ইং সনে সংশোধিত হয়েছে কিন্তু দন্ডের  পরিমাণ বিচার ক্ষেত্র ছাড়া তেমন কিছুই সংশোধিত হয়নি। দেবীরাম রবিদাসগণ মাদক আইনের ঘেরাটোপে পযুর্দস্ত, জীবনের চারভাগের একভাগ জেলেই কেটে যায়, তাই দেবীরাম ও তাদের পোষ্যগণের জীবন সম্পর্কে আইন প্রণেতাদের ভাবনা করার প্রয়োজন না থাকলেও কিছু এসে যায় না। প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিগণও মাদক উদ্বার অভিযান পরিচালনা করার জন্য স্থান হিসাবে দেবীরাম রবিদাসদের পলীকেই বেছে নেবেন। জানা কথা এদের ঘর তলাশী করলে এক, দুই লিটার দেশীয় চোলাই মদ পাওয়া যাবেই। সেই এক, দুই লিটার মদ উদ্বার, মোকদ্দমার জব্দ তালিকায় দশ, বিশ লিটার দেখানো হলেও কারও কিছু বলার নেই। কারণ জব্দ তালিকায় কর্মকর্তাটি লিখবেন, ‘বহন করতে অসুবিধা হেতু পরীক্ষার জন্য সামান্য নমুনা রাখিয়া বাকীটা ধ্বংস করা হইল, আরও লিখতে হবেÑ ‘বসত ঘরের মেঝে খুড়ে মাটির মটকায় দুইশ লিটার মদ তৈরির উপকরণ ঝাওয়া উদ্ধার করিলাম’। এই সব উদ্ধার সম্পর্কিত তথ্য কমও হতে পারে বেশীও হতে পারে কারণ  কোনটিই আদালতের সামনে প্রদর্শনের জন্য সংরক্ষণ করা যাবে না । এমন কি জব্দ তলিকায় যারা স্বাক্ষী হিসাবে মানিত হবেন তারা প্রত্যেকেই দেখা যায় দূরবর্তী গ্রামের অন্য সম্প্রদায়ের লোকজন। কিন্তু আমাদের জানা আছে রবিদাস পলীতে তাদের সম্প্রদায়ের অনেকগুলি পরিবার পাশাপাশি বসত করে থাকে কিন্তু এদের কখনওই জব্দ তলিকায় স্বাক্ষী কিংবা এদের উপস্থিতিতে উদ্বার লিখা  হয়েছে, এটা পাবেন না। ৪টি মামলায় হাজতে থাকা হতভাগ্য দেবীরামের প্রত্যেকটি মামলার মাদক উদ্ধারের সময় প্রায় পাশাপাশি। সবগুলিই ২০১৫ সালের এপ্রিল থেকে অক্টোবরের মধ্যে। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিগণ দেবীরামের ঘর থেকে মদ উদ্ধার করলেন কিন্তু তার টিকিটিও স্পর্শ করতে পারলেন না, এমনটিই হয়? দেবী রামের বসতঘর থেকে বার বার মদ উদ্ধার হল কিন্তু দেবীরামের প্রথম মামলার তারিখ ২৪/৪/১৫ইং, তাহলে সেতো তখন থেকেই পলাতক,  দেবীরামের ঘরে কে মদ তৈরি করল, প্রশ্ন থাকাটা স্বাভাবিক নয় কি?  প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিগণ শুধুমাত্র মদ উদ্ধার দেখালেই চাকুরীতে শনৈ শনৈ উন্নতি হবে বলেই কি অপরাধীকে গ্রেফতার করতে তৎপর হন না? দেবীরাম রবিদাস শারীরিকভাবে পঙ্গু গাড়ি দুর্ঘটনায় তাঁর ডান পা দুই জায়গায় ভেঙ্গে যাওয়ার পর পা খানি যদিওবা জোড়া লাগেছে, কিন্তু বর্তমানে ইঞ্চি পরিমাণ বেঁটে হয়ে যাওয়ায় তাকে খুড়িয়ে হাটতে হয়, কাজেই তাকে ধৃত করা খুব একটা অসাধ্য ছিল না। দেবীরামের মাদক মামলার শুরু ২৫/৪/২০০২ ইংরেজী থেকে ১৬ বৎসর পার হতে চললেও ঐ মোকদ্দমার বাদী মাদক পরিদর্শক এখনও মামলাটিতে স্বাক্ষ্য দিতে আসেন নাই কিংবা মোকদ্দমার অন্যান্য স্বাক্ষীগণও আসেন নাই। মাদকদ্রব্য মামলার বাদীগণ অর্থাৎ প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণ মাদক মামলাতে স্বামী স্ত্রীসহ পরিবারের প্রায় সবাইকে আসামী শ্রেণীভুক্ত করে দেন।  এমনই একটি মোকদ্দমার বাদী এ, এস আই হাবিবুর রহমান, দিরাই থানার মামলা নম্বর ১২,তারিখ ১৮/১২/১২ ইং। মোকদ্দমায় দেবীরাম রবিদাস ও তাঁর স্ত্রী ময়না রবিদাস ,দেবীরামের কাকা সাধু রবিদাস , সাধুর স্ত্রী আমরতি রবিদাস সবাইকে আসামী করে মামলা করেছেন। সেই মোকদ্দমা ৪ বৎসর ধরে চলছে কিন্তু এখনও  বাদী স্বাক্ষী দিতে আসেন নাই। দেবীরামের স্ত্রী’র নামেও একক মামলা হয়েছে , ২৮/৩/১৩ইং সনে এ,এস, আই মোঃ শেখ কামাল দেবীরামের ঘর থেকে মদ উদ্ধার করে দেবীরামকে না পেয়ে  তাঁর স্ত্রী ময়না রবিদাসকে আসামী করে মামলা করেছেন, ঐ মোকদ্দমায় আসামী তাৎক্ষণিক ধৃত হয় নাই, পরবর্তীতে ৭ মাসের গর্ভবতী ময়না রবিদাস আদালতে স্বেচ্ছায় হাজির হলে দুই মাস হাজত বাসের পর আদালতের দয়ায় জামিন পায়। ঐ মোকদ্দমায় বাদী এখনও আদালতে স্বাক্ষী দেন নাই। ময়না আদালতে আসে আর যায়, না আসলে ওয়ারেন্ট হয়। এমনি প্রায় ১৫ দিন পূর্বে পুলিশ ময়নাকে ধৃত করে,  জেল হাজতে পাঠানোর পর ময়না দুগ্ধপোষ্য বাচ্চাসহ ১০ দিন হাজতবাসের পর মহামান্য আদালতের দয়ায় জামিন পায়। এই ১০ দিন দেবী ও ময়নার  তিন টি শিশু বাচ্চা কিভাবে ছিল প্রশাসন কি তাঁর খবর রেখেছে? শুধু দেবীরাম কেন সারাদেশে মাদক আইনের মোকদ্দমার আশি ভাগ মোকদ্দমার আসামী রবিদাস শ্রেণীর। এইসব হরিজন সমাজের নিম্নশ্রেণীর লোকদের মাদক আইন দ্বারা শুধু শাস্তিই দেওয়া হয়েছে। কখনও কি মাদকের কুফল সম্পর্কে মাদক আইন সম্পর্কে এদের মধ্যে প্রচার প্রচারণা করা হয়েছে? আমরা সবাই জানি হরিজন সম্প্রদায়ের জীবন এবং তাদের নিজেদের তৈরি মদ জীবনের একটা অংশ হিসাবে প্রাচীনকাল থেকে ব্যাবহৃত হয়ে আসছে, বিবাহ কিংবা বিভিন্ন উৎসব আনন্দে তাঁরা নিজেরা মদ তৈরি করে তা দিয়ে উৎসব আনন্দ করে থাকে। তাই দীর্ঘ দিনের এই প্রথা থেকে এইসব হরিজন সম্প্রদায়কে রাতারাতি বের করা যাবে না। প্রয়োজন আছে এদের সংগে কাউন্সেলিং করার। মাদক মোকদ্দমার বাদী প্রায়ই প্রশাসনিক কর্তা ব্যক্তিগণ, কিন্তু মোকদ্দমার বাদীগণ স্বাক্ষী দিতে আসার এই দীর্ঘসূত্রিতা পরিহার করতে হবে। মোকদ্দমা প্রমানের দায়িত্ব বাদীর, মাদক মোকদ্দমায় বাদী মামলা প্রমাণ করতে না পারলে বাদীর বিরুদ্ধে শাস্তিমুলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রাখা এবং আলামত উদ্ধার হওয়ার পর একজন জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেটের উপস্থিতিতে তা ধ্বংস করা, উদ্ধার স্থানের একবারে পাশের বাড়ির লোক যাতে জব্দ তালিকার স্বাক্ষী হন সেই লক্ষ্যে আইন সংশোধন করতে হবে। কারণ অনেক সময় দেখা যায় জব্দ তালিকার স্বাক্ষীদের নিকট বাকীতে মদ বিক্রি করতে না চাইলেই স্বাক্ষীগণ পুলিশে খবর দিয়ে নিজেরা সাথে থেকে ধরিয়ে দেন।  তা ছাড়া আরও অনেক বিরোধ থেকেও হয়ে থাকে , তাই মোকদ্দমার কেইস ডাইরিতে সংবাদ জানার মাধ্যম উলেখ থাকা আবশ্যক এবং সংবাদ জানার মাধ্যমকে স্বাক্ষী হিসাবে আদালতে উপস্থাপনের বিধান রাখা আবশ্যক। অনেক সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ তাদের সম্মুখে উপস্থাপিত রবিদাসদের মদ খাওয়ার অপরাধে ৬ মাসের সাজা দিয়ে থাকেন কিন্তু কেউ নিজ ঘরে বসে কারও বিরক্তি না ঘটিয়ে মদ পান করলে অপরাধের মাত্রা কতটুকু হয় তার বিচার না করেই, দোষ স্বীকারকারীর প্রতি অনুকম্পা না দেখিয়েই সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া কতটুক যুক্তিযুক্ত? সর্বোপরি এইসব অভাগা অভাজনদের মাদকের কুফল ও মাদক আইন সম্পর্কে ন্যুনতম জ্ঞান দেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিৎ বলে আমি মনে করি।  
লেখক: আইনজীবী ও সহকারী সম্পাদক, দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর।