রসনাবিলাসী বাঙালির জন্য ফলমূলকে বিষমুক্ত রাখুন

ভ্রাম্যমাণ আদালত সাম্প্রতিক সময়ে বেশ ভাল ভূমিকা রাখছে। গত দুই দিন যাবৎ স্বয়ং জেলা প্রশাসক মাঠে নামায় এই অভিযান আরও গতিপ্রাপ্ত হয়েছে। মঙ্গলবার শহরের আলফাত স্কয়ার এলাকায় জেলা প্রশাসক নিজে কয়েকটি দোকান ও ব্যক্তিকে জারমানা করার পর বৃহস্পতিবার কালেক্টরেট এলাকায় মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন উদ্ধারকৃত প্রায় পাঁচ মণ নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর খেজুর। এদিকে বৃহস্পতিবার শহরের ফল মার্কেট থেকে ৮টি অবৈধ স্থাপনা  উচ্ছেদ ও নতুনপাড়া-হাজিপাড়া এলাকায় কয়েকটি দোকানে মূল্যতালিকা না থাকা, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রির দায়ে অর্থদ- করা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের এই তৎপরতা নিঃসন্দেহে ব্যবসায়ীদের ভেজাল, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রয়, বিষাক্ত রাসায়নিক মিশ্রণ, অধিক মূল্য রাখা এমন অসৎ প্রবণতা থেকে কিছুটা হলেও নিবৃত্ত করবে। আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেসির প্রতি অনুরোধ জানাই।
জ্যেষ্ঠ মাস সবে গত হলেও বাজারে এখন মৌসুমে ফলের প্রচুর সমারোহ। মধুমাসের এই সময়টির জন্য রসনাবিলাসী বাঙালি মাত্রই সারা বছর অপেক্ষায় থাকেন। কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলো রাজশাহী-চাপাইনবাবগঞ্জ থেকে বুকিংকৃত আমের চালান সরবরাহ করতে রীতিমত হিমসিম খাচ্ছে। বাজারে আম, কাঠাল, জাম, আনারসসহ হরেক রকমের মৌসুমী ফলের মৌ মৌ গন্ধে ভরা। এবার ফলের দামও তুলনামূলকভাবে ক্রেতাদের নাগালের ভিতরে। ফলে ফলের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা যাচ্ছে। এবার মধুমাসে পবিত্র রমজান হওয়ার কারণে ফলের আলাদা চাহিদা গড়ে উঠেছে। কিন্তু এই যে মানুষ আগ্রহ করে বাজার থেকে ফল কিনে নিয়ে যাচ্ছে তার কতোটা ভেজাল মুক্ত তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে কি? ফলে ফরমালিন মেশানো কিংবা কাঠাল ও কলা পাকানোর জন্য কার্বো-হাইড্রেড ব্যবহার ব্যবসায়ীদের একটি বহুল চর্চিত বিষয়। ফলের গাছগুলোতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক রাসায়নিক ও সার ব্যবহারের ফলে ফলের মধ্যেই বিষাক্ত অনুজীব দানা বেধে থাকে। তাই অনেক সচেতন মানুষ বাজারের ফল খাওয়া এখন প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন। বাঙালির খাদ্যাভাসে বিপুলভাবে জনপ্রিয় ফল খাওয়ার অভ্যাসটি যদি বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে নষ্ট হয়ে যায় তাহলে সেটি নিতান্তই দুঃখজনক বিষয় হবে বৈকি। এই অবস্থার নিরসনকল্পেই ভ্রাম্যমাণ আদালতগুলো সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে মানুষকে ভেজালমুক্ত ফল খাওয়ার ন্যুনতম চিন্তাভাবনা অব্যাহত রেখেছেন। কিন্তু আসল কথা হলো এরকম অভিযান পরিচালনা ও দুই/একজন ব্যবসায়ীকে অর্থদ- করলে অবস্থার গুণগত পরিবর্তন ঘটবে না। এজন্য দরকার জাতীয়ভিত্তিক ব্যাপক সচেতনতাবোধ জাগ্রত করা।
দেশের কৃষিবিজ্ঞানীরা এখন প্রচলিত রাসায়নিকের বিপরীতি জৈব ও প্রাকৃতিক পদ্ধতির কীটনাশক, সার ইত্যাদির আবিস্কার করেছেন। মাঠ পর্যায়ে এর প্রচারণাও হচ্ছে । এই কর্মকা-ের ব্যাপকতা বাড়ানো দরকার। মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের বদভ্যাস যা গত দুই দশকে বহুল পরিমাণে বেড়ে গেছে সেই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে আমাদেরকে অবশ্যই। এই বেরিয়ে আসার জন্য যত ধরনের কাজ দরকার সবগুলোই করতে হবে। এই জায়গায় সরকার, কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সমান দায়িত্ব। আজ যে আম বাগানের মালিক গাছে আমের পোকা রোধ, স্বাস্থ্যবৃদ্ধি, রঙ উজ্জ্বল করতে বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করে থাকেন সর্বাগ্রে তাদেরকে নিবৃত্ত করতে হবে। একই সাথে তাদেরকে ঝূঁকিমুক্ত পদ্ধতিগুলি সম্পর্কে প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে।
ভেজাল ফল খাওয়ার কারণে মানবদেহে যে মারাত্মক রোগজীবানুর উদ্ভব ঘটছে সেখান থেকে জাতিকে রক্ষা করতেই হবে। নতুবা রসনাবিলাস করতে যেয়ে আমরা অকাল মৃত্যু, জরা ও পঙ্গুত্বকেই আহ্বান করব। এই আশংকা থেকে মুক্ত থাকার জন্য আমরা যেমন ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানগুলোকে সমর্থন করি তেমনি অপরাপর প্রতিষেধক কর্মকা-েরও বহুল প্রসার কামনা করি।