অকাল বন্যার ঝুঁকি থেকে হাওরাঞ্চলকে রক্ষা করার উপায় : একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা

কুমার সৌরভ
[ দৈনিক সমকাল এর আয়োজনে ১০ মে শনিবার অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ হিসাবে পঠিত হয়েছিলো]
আমাদের ঋতু বৈচিত্রের বাংলাদেশে মৌসুমী বন্যা একটি অতি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রবণতা। উজান থেকে নেমে আসা পানিপ্রবাহের মাধ্যমে বয়ে আনা বিপুল পরিমাণ পলি আমাদের এই বদ্বীপ অঞ্চলকে উর্বর ও সুফলা করেছে । প্রতি বছর আমরা ভূগর্ভস্ত যে পরিমাণ পানি ব্যবহার করি বন্যার মাধ্যমে তা পূরণ হয়ে থাকে। বন্যার পানিতে পলির সাথে আসে পুষ্টিকর ও খনিজ পদার্থ যা আমাদের কৃষিজ উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য সহায়ক। তাই মৌসুমী স্বাভাবিক বন্যা বাংলাদেশের জন্য প্রকৃতির এক অনুপম উপহার। কিন্তু সমস্যা হলো স্বাভাবিক বন্যার স্থলে যখন অগ্রিম অকাল বন্যা বা অতি বন্যা হয় তখন। গত বছর সুনামগঞ্জে এপ্রিল মাসে কিছুটা অগ্রিম অকাল বন্যা এবং জুন মাসে অতি বন্যার ভয়াল রূপ ও ধ্বংসলীলা দেখা গেছে। অতি বন্যার ফলে গতবছর বহু মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করে তুলেছিলো, একই সাথে বিপুল পরিমাণ সম্পদের ক্ষতি সাধন হয় । অতি বন্যার এত প্রলয়ংকরী রূপ স্মরণকালের ইতিহাসে দেখা যায়নি। এছাড়া গতবছরের এপ্রিল মাসে যে অগ্রিম অকাল বন্যা হয়েছিলো তাতে বোরো ফসলের বেশ ক্ষতি হয়। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব মোতাবেক জেলায় ৫ হাজার ৫১০ হেক্টর জমির বোরো ধান নষ্ট হয়েছিল । সরকারি হিসাবের সাথে কৃষকদের দাবি কখনও সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। তাই ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশিই হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অকাল বন্যার সবচাইতে সর্বনাশা রূপ দেখা গিয়েছিলো বিগত ২০১৭ খ্রিস্টিয় সনে। সে বছর প্রায় শতভাগ বোরো ফসল এই অকাল বন্যা কবলিত হয়ে মাঠেই ডুবে গিয়েছিলো। হাওরের সাত জেলায় সে বছর প্রায় ১০ লাখ টন ধান বন্যার পানিতে মাঠেই পচে নষ্ট হয়। কৃষক এক মুঠো ধানও কাটতে পারেননি। সরকারি হিসাবে ২০১৭ সনে এই জেলায় দেড় লাখ হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়েছে। সে বছর পানি দূষিত হয়ে ব্যাপক পরিমাণে মাছের ক্ষতিসাধন করে। নষ্ট হয় গবাদি পশুর খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ খড়। ২০১৭ সনের ফসল বিধ্বংসী অগ্রিম অকাল বন্যা ও ২০২২ সনের মানুষের জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনা প্রলয়ংকরী অতি বন্যার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে হাওরাঞ্চলকে এই প্রাকৃতিক বিপদ থেকে ঝুঁকিমুক্ত রাখার বৈজ্ঞানিক উপায় উদ্ভাবনের উপর গুর”ত্ব দিতে হবে।
সুনামগঞ্জ জেলা হাওর অধ্যূষিত এলাকা। এখানকার প্রধান ফসল বোরো ধান। এই বোরো ফসল সবচাইতে বেশি ঝুঁকিতে থাকে অগ্রিম অকাল বন্যার কারণে। অকাল বন্যার হাত থেকে বোরো ফসল বাঁচাতে সরকার হাওরে অস্থায়ী ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে শত শত কোটি টাকা খরচ করেন। ২০২৩ সনে এই খাতে সরকারি বরাদ্দের পরিমাণ ছিলো ২০৪ কোটি টাকা। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে মাঝারি বা বড় আকারের অকাল বন্যা প্রতিরোধে এসব অস্থায়ী বাঁধ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। পানির চাপে সহজেই ভেঙে পড়ে এসব বাঁধ। ২০১৭ সনের অভিজ্ঞতা এর জলজ্ব্যন্ত প্রমাণ। এছাড়া বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ আছে বৈজ্ঞানিকভাবে বিচার বিশ্লেষণ করে প্রকল্প গ্রহণ ও বাঁধের প্রমিত ডিজাইন করা হয় না। কিছু প্রকল্পে অতিরিক্ত বরাদ্দ দান এবং কিছু জায়গায় প্রকল্প গ্রহণ না করার কথাও শোনা যায়। নির্মিত বাঁধে যথাযথ মান বজায় না রাখা সুবিদিত। ফসল রক্ষায় বাঁধের কার্যকারিতার সীমাবদ্ধতার কারণে এ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুর” করেছে। অস্থায়ী বাঁধের চলমান প্রক্রিয়ার সাথে অকাল বন্যার প্রকৃত সমাধান কামনা করা হচ্ছে হাওরবাসী কৃষক সমাজের পক্ষ থেকে।
বোরো ফসলের জন্য মে মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত হাওরকে বন্যার ঝুঁকিমুক্ত রাখতে হয়। এ সময়ের মধ্যে মোটামুটি হাওরের ধান কাটা শেষ হয়। অগ্রিম অকাল বন্যার ঝুঁকি মার্চ মাস থেকেই শুর” হয়। অবশ্য ২০১৭ সনে এর আগেই হাওর ডুবি শুর” হয়েছিলো। সে বছরের ২৩ ফেব্র”য়ারি ধর্মপাশার চন্দ্রসোনারথাল হাওর ডুবির মধ্য দিয়ে সর্বনাশের সূচনা হয়েছিলো। প্রধানত উজানের ভারত অংশে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে সেই পানি নি¤œভাগের হাওরকে প্লাবিত করে থাকে। অভ্যন্তরীণ অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণেও হাওরে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে এবং নদীর কূল উপচে হাওরে পানি ঢুকে ফসল নষ্ট করে। তবে উজানের ঢলই অগ্রিম অকাল বন্যার প্রধান কারণ। ভৌগোলিকভাবে যেহেতু ভাটিতে আমাদের অবস্থান তাই উজানের পানি আসবেই এমন চিন্তা করে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা ও সুরক্ষা বলয় তৈরির দিকে আমাদের এগোনো আবশ্যক। আমাদের চিন্তা করতে হবে এই উজান থেকে নেমে আসা বিপুল জলপ্রবাহকে কীভাবে হাওরে ঢুকতে না দিয়ে নদীপথে প্রবাহিত করার মাধ্যমে সাগরে নিয়ে যাওয়া যায়। উজান থেকে নেমে আসা পানি যেসব ছড়া, নদী দিয়ে প্রবাহিত হয় সেসব অধিকাংশই ভরাট হয়ে গেছে। বহু নদী, খাল ও জলাশয় এখন হয় মরে গেছে নয় মৃতবৎ হয়ে আছে। তলদেশ ভরাট হয়ে নদীর পানি ধারণ ক্ষমতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। হাওর মধ্যস্ত প্রাকৃতিক খাল, নালা ও জলাশয় ভরাট হয়েছে। ব্যাপক পলি জমে হাওরের তলদেশ প্রাকৃতিক আকার হারিয়ে সহজাত পানি নিষ্কাষণ ক্ষমতা কমেছে। পানি প্রবাহের এই স্বাভাবিক প্রাকৃতিক উপায়গুলোর বিলুপ্তি বা ক্ষমতা খর্ব হওয়াকেই অগ্রিম অকাল বন্যার কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা যায়। তাই সমাধােেনর প্রাথমিক উপায় হিসাবে অবাধ পানিপ্রবাহের বিষয়টির উপরই গুর”ত্ব দিতে হবে। সুনামগঞ্জ জেলার উপর দিয়ে ছোট-বড় প্রায় ২৩টি নদ-নদী প্রবাহিত হয়েছে। অকাল বা অতি বন্যার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য এই নদ-নদীগুলোকে রক্ষাকবচে পরিণত করা গেলে স্থায়ী সমাধানের পথ উন্মুক্ত হবে।
সরকার ২০১২ সনে হাওর এলাকার জন্য একটি মাস্টার প্ল্যান তৈরি করেছেন। হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড হাওর অধ্যূষিত ৭ জেলার ৩৭৩টি হাওরের ৮.৫৮ লক্ষ হেক্টর কৃষিজমি ও এই এলাকার প্রাণ-প্রকৃতি, জীবন-জীবিকা, পরিবেশ-প্রতিবেশ, অবকাঠামো, শিক্ষাসহ সার্বিক উন্নয়নের জন্য এই মহাপরিকল্পনা তৈরি করেছে। হাওর অধ্যূষিত ৭ জেলার মধ্যে সুনামগঞ্জের হাওর এলাকা সবচাইতে বেশি। মোট ৮.৫৮ লক্ষ হেক্টর চাষযোগ্য হাওর এলাকার বিপরীতে সুনামগঞ্জের অংশ ২.৬৯ লক্ষ হেক্টর যা মোট হাওর এলাকার শতকরা পঁচিশ ভাগের উপরে। হাওর ও নন-হাওরে বোরো মৌসুমে প্রায় সাড়ে নয় লাখ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়। এর মধ্যে সুনামগঞ্জের বোরো জমির পরিমাণ প্রায় সোয়া দুই লাখ হেক্টর। বর্ণিত মহাপরিকল্পনায় যথাযথভাবে হাওরের সমস্যা চিহ্নিত করে বলা হয়েছে, ‘আকস্মিক বন্যা হলো হাওর এলাকার প্রধান বিপর্যয় যা প্রাথমিক উৎপাদন খাতকে (যেমন কৃষি) গ্রাস করে এবং মানুষের জীবন ও জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলে’। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণ হিসাবে উক্ত মহাপরিকল্পনায় বলা আছেÑ‘উজানের পাহাড়ি অঞ্চলে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং পরবর্তীতে প্রবাহিত হওয়া, নদীতে পলি জমা, বন উজাড় ও পাহাড় কাটা, ভূমিধস, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ, অপরিকল্পিত রাস্তা ও পানি ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো এবং জলবায়ুর পরিবর্তনশীলতার প্রভাব’। ২০ বছরের মধ্যে অর্থাৎ ২০৩২ খ্রিস্টিয় সনের মধ্যে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। শুধুমাত্র হাওরের ফসলকে বন্যার ঝুঁকিমুক্ত রাখতে মহাপরিকল্পনায় পানিসম্পদ প্রকল্পের আওতায় ১৭৮৩.৭৪ কোটি টাকার ৯টি প্রকল্প বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নদী খনন, পানি চলাচলের ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ঢেউ থেকে গ্রাম সুরক্ষা, নদী তদারকি প্রভৃতি। কিন্তু হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডের দৃশ্যমান তৎপরতা না দেখার কারণে ওই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়টিও মানুষের কাছে কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে আছে।
সাত জেলার হাওরের জমিতে কেবল বোরো ফসল থেকে প্রতিবছর ৫.২৩ মিলিয়ন টন ধান উৎপাদন হয়। সারা দেশের উৎপাদিত ধানের পরিমাণ প্রায় ৫০.২৬ মিলিয়ন টন। অর্থাৎ দেশের মোট উৎপাদিত ধানের শতকরা দশ ভাগের জোগান আসে হাওরাঞ্চল থেকে। কেবল বোরো ধানকে বিবেচনায় নিলে হাওরাঞ্চলে উৎপাদন হয় শতকরা বিশ ভাগ। সুতরাং বলা যায়, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও খাদ্যচাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে হাওরের বিশাল অবদান রয়েছে। ধান উৎপাদনে আরও বৈজ্ঞানিক গবেষণা নির্ভর জ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার করা গেলে হাওরের উৎপাদনশীলতা আরও বহু বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তাই এই বিশাল সম্ভাবনাময় হাওর ও এর উৎপাদন ব্যবস্থাকে ঝুঁকিমুক্ত রাখা একটি অপরিহার্য জাতীয় দায়িত্ব। প্রাপ্ত তথ্য মতে দেশের অপরাপর অঞ্চল থেকে হাওরে দারিদ্রতার হার বেশি। এখানকার পুষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যচিত্রও অনেক অনুন্নত। ফসলের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বিপদ মোকাবিলা করতে পারলে হাওরাঞ্চলের দারিদ্র বিমোচনসহ সার্বিক উন্নয়ন তরান্বিত হবে।
হাওরের অগ্রিম অকাল বন্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি কোনো একটি বিশেষ জেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং পুরো হাওরাঞ্চল নিয়েই এই পরিকল্পনা সাজাতে হবে। এজন্য দরকার ব্যাপক বৈজ্ঞানিক গবেষণা। উজানের পানিপ্রবাহের গতি-প্রকৃতি এবং স্থানীয় নদী জলাশয় সমূহের চরিত্র বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ করে উপযুক্ত পরিকল্পনা তৈরি দরকার। সাময়িক বা স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা স্থায়ী সমাধানের পথ র”দ্ধ করবে এবং এতে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। আমরা বিশ্বাস করি দুর্যোগকে মোকাবিলা করেই মানবসভ্যতা এগিয়েছে। তাই বিপদ দেখে ভয় নয় বরং এর হাত থেকে বাঁচার পথ উদ্ভাবন করাটাই হলো টিকে থাকার মূলমন্ত্র। এ সংক্রান্ত উপযুক্ত পরামর্শ প্রদান করা এই ক্ষুদ্র নিবন্ধে সম্ভব নয়। কিছু আকাক্সক্ষার প্রকাশ কেবল করা যেতে পারে। সেই মনোভাব থেকে কিছু বিষয় আপনাদের সামনে উপস্থাপন করা হলো।
আকাক্সক্ষাসমূহ
১. নদীর জীবন্ত সত্তাকে স্বীকার করে অত্রাঞ্চলের প্রতিটি নদ-নদীকে পুনর”জ্জীবিত, সচল ও গভীর করা আবশ্যক। এজন্য পরিকল্পিত নদী খনন কার্যক্রম অব্যাহত রাখা।
২. হাওর এলাকায় আর নতুন কোনো সড়ক তৈরি না করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দ্ব্যর্থহীন ঘোষণার বাস্তবায়ন দরকার। হাওরাঞ্চলে উচ্চাভিলাসী সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের পরিবর্তে ডুবন্ত সড়ক নির্মাণ ও নৌপথের অধিক উন্নয়নের দিকে নজর দিলে ভালো হবে।
৩. খাল, নালা, বিল ও অন্যান্য জলাশয়গুলোকে পুনর”দ্ধার ও সচল করণের ব্যবস্থা গ্রহণ। ্েস গুলোকে নিয়মিত পরিকল্পিত খননের আওতায় নিয়ে আসা। হাওরের ভিতরের প্রাকৃতিক নালা ও খালগুলোকে উন্মুক্ত করা যাতে জলাবদ্ধতার পানি সহজেই নিষ্কাষিত হতে পারে। বসতি এলাকার বিলুপ্ত খালগুলো উদ্ধার করাও এই সাথে আবশ্যকীয়।
৪. ভারত সীমান্তবর্তী হাওরাঞ্চলে অর্থাৎ পাহাড়ের পাদদেশ অঞ্চলে গভীর করে দীর্ঘ খাল খনন যা কোনো না কোনো নদীর সাথে সংযুক্ত হবে। যেসব ছড়া বা ছোট নদী রয়েছে সেগুলোকে আরও গভীর করণ।
৫. ভারতের বরাক নদ এবং আমাদের সুরমা ও কুশিয়ার নদীর মোহনা সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার অমলসিদ নামক এলাকায় অবস্থিত। এই উৎসমুখ পলি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। অমলসিদ থেকে সুরমা নদীর ৩২ কিলোমিটার এলাকায় ৩৫টির মত চর জেগে উঠেছে। অমলসিদের এই মোহনা খনন করা অতি আবশ্যক। নতুবা সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এজন্য সুরমা নদী অমলসিদ থেকে ভৈরব পর্যন্ত এবং কুশিয়ারা নদী অমলসিদ থেকে কালনি পর্যন্ত খনন করা দরকার। কিশোরগঞ্জ জেলার একটি নদীর নাম ঘোড়াউত্রা। নদিটিতে আরও বহু শাখা নদী সংযুক্ত হয়েছে। এই নদীতে বেশ কয়েকটি বিপজ্জনক বড় বাঁক রয়েছে। এই বাঁকগুলো কেটে ঘোড়াউত্রা নদীকে সোজা করে দিলে একদিকে নদীর ভাঙন রোধ হয় এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ঠিক থাকে। হাওরাঞ্চলের অন্যান্য যেসব নদীর দীর্ঘ বাঁক রয়েছে সেগুলোকেও সোজা করে দিতে হবে। হাওরাঞ্চলের পানি শেষ পর্যন্ত মেঘনা নদী হয়ে সাগরে পতিত হয়। সুতরাং মেঘনা অভিমুখিন সকল গতিপথকে অবারিত রাখা দরকার।
৬. ফসলরক্ষা বাঁধের পরিকল্পনা গ্রহণকালে হাওরের প্রকৃতি ও পরিবেশ বিবেচনায় নিয়ে বৈজ্ঞানিক চিন্তা চেতনার প্রয়োগ ঘটানো। বাঁধ বাস্তবায়নের বর্তমান সরকারের গণমুখী প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) পদ্ধতিকে নীতিমালা মোতাবেক গণতান্ত্রিক চর্চার (গণশুনানী) ভিতরে রাখা। এই জায়গায় অন্যায় হস্তক্ষেপ ও প্রভাব বিস্তারের অপচেষ্টাসহ সব ধরনের অসাধু পন্থাকে নিয়ন্ত্রণ করা। একই সাথে ব্যয়িত টাকার স্বচ্ছতা ও সততা বজায় রাখার সুনিশ্চিত ব্যবস্থা গ্রহণ ।
৭. হাওরে স্বল্প জীবন কালের ধানের বীজ উদ্ভাবনের দিকে মনোযোগী হওয়া। এক্ষেত্রে আমাদের পুরনো দেশিয় জাতের ধান নিয়ে আরও গবেষণা আবশ্যক।
৮. হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডকে কার্যকর ভূমিকায় আনা। হাওর এলাকার পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা।
৯. হাওরের বহুমুখী উৎপাদন সম্ভাবনা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চালিয়ে জাতিকে এর সুফল পাওয়ার জায়গায় নিতে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও কার্যক্রম পরিচালনা অপরিহার্য। হাওরের পানিকে সম্পদে পরিণত করার নীতি গ্রহণ করা।
১০. দেশিয় জাতের বহু প্রজাতির সুস্বাদু মাছের উৎপাদন বাড়াতে বহুমুখী ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
১১. আন্তর্জাতিক পানি ও নদী আইন এবং বিদ্যমান আন্তর্জাতিক রীতি ও প্রথা অনুসারে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়সহ উজানে আমাদের জন্য ক্ষতিকর বাঁধ নির্মাণে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক। জলবায়ু পরিবর্তন জনিত প্রতিক্রিয়াকে বিবেচনায় রেখে প্রয়োজনীয় সুরক্ষামূলক ব্যবস্থাদি গ্রহণ ।
১২. হাওরের পরিবেশ-প্রতিবেশ ও উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর পর্যটনকে নির”ৎসাহিতকরণ।