অদ্বিতীয় প্রকৃতির শিল্পী

সজীব দে
‘আজ বিশ বছরের পার হ’তে আমি আমার সে পাখিডাকা তেলকুচা-ফুল-ফোটা, ছায়াভরা মাটির ভিটাকে অভিনন্দন করে এই কথাটি জানাতে চাই-ভুলিনি ! ভুলিনি! যেখানেই থাকি ভুলিনি! -তোমার কথা লিখে রেখে যাবো।…’
দীর্ঘ একশ বছর পেরিয়ে এসেও বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের গ্রামের উদ্দেশ্যে লেখা দিনলিপির কথা আজও আমাদের কাছে ভীষণভাবে স্মরণীয়। আর এভাবেই বোধহয় প্রকৃতির শিল্পীরূপে পাঠক হৃদয়ে এক ও অদ্বিতীয় স্থানটি দখল করে নিয়েছেন তিনি।
স্বর্ণ অন্বেষণ নয়, প্রকৃতি মুগ্ধতার মধ্য দিয়েও যে বীর ও সাহসী হিসেবে পরিচিত হওয়া যায় তা দেখিয়েছেন ‘চাঁদের পাহাড়’ উপন্যাসে। উপন্যাসে তিনি শংকরকে গড়েছেন প্রকৃতিমুগ্ধ নায়ক হিসেবে। ঐশ্বর্য নয়, মানবিক সম্পর্ক, দেশাত্মবোধ ও প্রাকৃতিক মাধুর্য যে অনেক বেশী মূল্যবান আর সেই ঐশ্বর্যে যারা সমৃদ্ধ তারাই প্রকৃত ধনী তা উপন্যাসে তুলে ধরেছেন। অ্যাডভেঞ্চারধর্মী উপন্যাসের অন্তরালে ঔপনিবেশিক আধিপত্যবাদী ধারণার বিরুদ্ধে পাওয়া যায় সাংস্কৃতি প্রতিরোধের ছবি।
‘অন্য কিছু চাইনে, এ গায়ের বন, ঝোপ, নদী, মাঠ, বাঁশ বনের ছায়ায়, অবোধ, উদগ্রীব স্বপ্নময় আমার সেই দশ বৎসর বয়সের শৈশবটি আরেকবার ফিরিয়ে দেবে দেবী?’
‘অপরাজিত’ উপন্যাসে দশ বছরের শৈশব ফিরে পেতে চেয়েছিলেন পঁয়ত্রিশ বছরের অপু। জীবনকে উপলব্ধি করা, অতীতকে ফিরে পাওয়া ব্যাকুল আহবান এমন করে আর কে ধ্বনিত করতে পেরেছিলেন। মাটির পৃথিবী তাঁকে টেনেছিল কাছ থেকে। যার প্রতিক্রিয়া দেখা যায় অপুর মধ্যে ‘অপু মাটি দেখিতে না পাইলে থাকিতে পারে না’। মাটি মানুষের জীবন-মরণের সাথী তাই কলকাতায় বেঁচে থাকার আনন্দ খুঁজে পায় না অপু।
দৈনন্দিন ছোট-খাটো সুখ, দুঃখ, ভালোলাগা-মন্দলাগা, ভালোবাসা-ঘৃণার মধ্যে দিয়ে যে জীবন বয়ে চলেছে সেই কাহিনীই তিনি কথাসাহিত্যে তুলে ধরেছেন। তাঁর লেখায় প্রবলভাবে আন্দেলিত হলো আবেগে, স্নেহে, ভালোবাসা, সারল্যে, লোভ, হিংসা, পাওয়া-না পাওয়া, দারিদ্র, কুসংস্কার। যা কিছু বাস্তব ও অকৃত্রিম তারই মালা গেঁথেছেন আজীবন কথা সাহিত্যের আসরে। সহজ মানবিকতাই বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের উপন্যাসের চরিত্রগুলির প্রধান গুণ।
শরৎ পরবর্তি বাংলা কথা সাহিত্যের বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় উজ্জ্বল নক্ষত্র। ১৮৯৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর বুধবার হালিশহরের মুরারীপুর গ্রামে মাতুলালয়ে বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মহানন্দ বন্দোপাধ্যায় এবং মাতা মৃণালিনী দেবী। পিতার জীবিকা ছিল যজমানি এবং পূজা অর্চনা। ফলে দারিদ্র ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী। কাশী থেকে তিনি শাস্ত্রী উপাধী পেয়েছিলেন সংস্কৃত ভাষায় পাণ্ডিত্যের জন্য।
বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের শিক্ষা জীবন শুরু হয় গ্রামের হরি রায়ের পাঠশালায়। বনগাঁও হাইস্কুলে তিনি যখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র তখন তাঁর পিতা মারা যান। এই স্কুল থেকেই ১৯১৪ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। কলকাতার রিপন কলেজ থেকে ১৯১৬ সালে প্রথম বিভাবে আইএ এবং ১৯১৮ সালে ডিস্ট্রিংশন সহ বিএ পাশ করেন। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ ভর্তি হন এবং একই সঙ্গে আইন কলেজে ক্লাস করতে থাকেন। এসময়ই বসিরহাটের পাণিতর গ্রামের কাশীভূষণ মুখোপাধ্যায়ের কন্যা গৌরি দেবীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এক বছরের মধ্যেই নিউমেনিয়ায় গৌরিদেবীর মৃত্যু হয়। একই বছরে বিভূতিভূষণের বোন আশালতাও মারা যান। ১৯২১ সালে শুরু করেন শিক্ষকতা। এ সময় ‘উপেক্ষিতা’ গল্প দিয়ে সাহিত্য জীবনের সূত্রপাত হয় বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের। ১৯২২ সালে তিনি কেশোরাম পোদ্দারের গোরক্ষণী সভার প্রচারকের চাকরী নিয়ে যান পূর্ববঙ্গে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ব্রহ্মদেশ, আরাকান-ইয়ামোর ঘন জঙ্গল, আগরতলা, নোয়াখালী, ঢাকা বিভিন্ন জায়গায় কর্মসূত্রে গেলেও সেখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সন্ধানে তাঁর ভ্রমণ পিপাসু মন কল্পনার জাল বিস্তার করে। ‘অভিযাত্রি’ দিনলিপিতে রয়েছে তাঁর সেইসময়কার ভ্রমণের বৃত্তান্ত।
১৯২৪ সালে খেলাৎচন্দ্র ঘোষ কোম্পানী এস্টেটের ম্যানেজার হিসেবে যান ভাগলপুরে। এখানে কাটানো সময়ের বিভিন্ন ঘটনা স্থান পেয়েছে ‘আরণ্যক’ উপন্যাসে। এখানে বসেই লিখেন ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাস। ১৯২৯ সালের ২ অক্টোবর বুধবার মহালয়ায় উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়। ১৩৪০ বঙ্গাব্দে বিচিত্রায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘পথের পাঁচালী’ সম্পর্কে বলেন-
‘বইখানা দাঁড়িয়ে আছে আপন সত্যের জোরে। …এই গল্পে গাছপালা, পথঘাট, মেয়ে-পুরুষ, সুখ-দুঃখ, সমস্তকে আমাদের আধুনিক অভিজ্ঞতার প্রত্যহিক পরিবেষ্টনের থেকে দূরে প্রক্ষিপ্ত করে দেখানো হয়েছে। সাহিত্যে একটি নতুন জিনিস পাওয়া গেল অথচ পুরাতন পরিচিত জগতের মতোই সুষ্পষ্ট..।’
উপন্যাস, গল্প, ভ্রমণ কাহিনী, ‘বিচিত্র জগৎ’ নামে কল্প ভ্রমণের বই নিয়ে তাঁর সাহিত্যে জগৎ সমৃদ্ধ। তিনি যে সাহিত্য ভুবন নির্মাণ করেছিলেন তা থেকে কিশোর কিশোরীরা যেন বাদ না যায় সেদিকে তিনি সজাগ দৃষ্টি রেখেছিলেন। প্রকৃতি ও শিশুকে নিয়ে বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের আগে কোন ঔপন্যাসিক উপন্যাস রচনা করেননি। ‘পথের পাঁচালী’ ও ‘অপরাজিত’ উপন্যাসে অপুর জীবন দর্শনের মধ্যে দিয়ে বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের যে জীবন দর্শন প্রতিফলিত হয়েছে, তা মানব সভ্যতার শ্বাশতকালের জীবন দর্শন। অপুর চরিত্র তারই জীবন চরিত্রের ছায়া। উপন্যাসের প্রয়োজনে সেখানে তিনি কিছু অদল বদল ঘটিয়েছেন। অপুর স্বপ্ন, কল্পনা, প্রকৃতি প্রেম, শহুরে জীবনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, শহুরে বাবুদের সম্পর্কে অনিহা জীবনের যাত্রাপথে বিচিত্র অভিজ্ঞতার জন্ম দিয়েছে। অদম্য জীবন তৃষ্ণার কারণে অপু সব কিছুকে সাদরে বরণ করে নিয়েছে।
১৯২৯ সালে ডিসেম্বর মাসে বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় ভাগলপুর থেকে চলে এসে কলকাতার ধর্মতলা স্ট্রিটের খেলাৎ চন্দ্র ক্যালকাটা ইন্সটিটিউশনে শিক্ষকতা কর্মে নিযুক্ত হন। ১৯৪০ সালে ঘাটশিলায় বাড়ি কিনে নাম রাখেন ‘গৌরিকুঞ্জ’। গৌরিদেবীর মৃত্যুর ২৩ বছর পর ১৯৪০ সালের ডিসেম্বর মাসে ষোড়শীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় কন্যা রমা দেবী (কল্যাণী) কে বিবাহ করেন তিনি। ১৯৪২ সালের এপ্রিল মাসে গোপালনগর স্কুলে শিক্ষকতায় যোগদান করেন বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়। এরপর বনগাঁ কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক পদে নিযুক্ত হন। ১৯৪৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন পুত্র তারাদাস বন্দোপাধ্যায়। ১৯৫০ সালের ১ নভেম্বর ৫৬ বছর বয়সে ঘাটশিলার বাড়িতে পরলোকগমন করেন তিনি।
বিশ্বের জীব-জড় বস্তুর মধ্যে প্রাণের স্পন্দন অনুভব করেছিলেন বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়। তাই তিনি লিখেছেন- ‘এই পাখি, এই প্রজাপতিটা, এই ফুল, এই তুচ্ছ কি একটা গাছটা, এই লতা, এই আকাশ, বাতাস, জল, মাটি, ঐ যে উজ্জ্বল হয়ে আসছে ঐ চাঁদটা, এই চারিধার, এই প্রাণী জগৎ, ঐ লক্ষ মাইল দূরের সূর্য, ঐ অনন্ত মহাব্যেম, এই বিপুল বিশাল অচিন্তনীয় অসীমতা-সবগুলোর মধ্যে কি আশ্চর্য নাড়ীর যোগ ! কি বিপুল রহস্যে ভরা তাদের এই পরস্পর নির্ভরতা।’
তাঁর বিশ্বাস ছিল এই বৃহত্তর জীবনকে মানুষের আয়ুকাল দিয়ে মাপা যায় না। হাজার হাজার বছর এর ব্যাপ্তি। এজনই ‘তৃণাঙ্কুর’ এ তিনি বলেছেন-অর্থোপার্জন, খ্যাতি, প্রতিপত্তি, সাধুবাদ বা ভোগে নয়, জীবনের সাফল্য বিশ্বের রহস্যকে গভীরভাবে উপলব্ধি করার আনন্দে।