অনেক পিআইসির নিয়ন্ত্রক এক ইউপি চেয়ারম্যান

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
জামালগঞ্জে হাওর রক্ষা বাঁধের কাজে গঠিত প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) নিয়ে তুমুল বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি গঠনকৃত পিআইসিতে কৃষকের নাম ব্যবহার করে রাজনীতিক, সাংবাদিক ও বিতর্কিত জনপ্রতিনিধি অকৃষিজীবীরা অন্তরালে পিআইসি প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে অন্যদের নিয়ে যতটা না আলোচনা হচ্ছে তার চেয়ে বেহেলী ইউনিয়ন পরিষদের বিতর্কিত চেয়ারম্যান অসীম তালুকদারের নামটি বেশ জোরেশোরে আলোচিত হচ্ছে। এ নিয়ে জামালগঞ্জ তথা হালি হাওর পারের কৃষকের মাঝে মারাত্মক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন নীতিমালার ৬.৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাঁধের নিকটবর্তী জমির প্রকৃত মালিকের সমন্বয়ে কমিটি করার কথা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় ঘটেছে। নীতিমালায় ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পিআইসি গঠন এবং ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শুরু ও ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তা সমাপ্তির কথা উল্লেখ আছে। যা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।
ছোট-বড় ৭টি হাওর পরিবেষ্টিত জামালগঞ্জের সবচেয়ে বড় হাওর হালি ও পাগনা। উপজেলার সবগুলো হাওরকে ৬৯টি পিআইসিতে বিভক্ত করে বরাদ্দ নির্ধারণ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। তন্মধ্যে ৪১টি পিআইসিই বেহেলী ইউনিয়নকেন্দ্রিক হাওরের বাঁধ রক্ষা কাজে গঠন করা হয়। এই ৪১টির অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করেছেন বেহেলী ইউপি চেয়ারম্যান অসীম তালুকদার।
২০১৭ সালে আলোচিত হাওর ডুবির পরপরই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র গা ঢাকা দেওয়া এই চেয়ারম্যান হালি ও মহালিয়া হাওর পারস্থ কৃষকের নাম পরিচয় ব্যবহার করে অধিকাংশ পিআইসি নিজের করে নিয়েছেন। এছাড়া সদ্যঘোষিত বেশ কয়েকজন পিআইসি প্রধানের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে পিআইসি পাইয়ে দেয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। অন্যদিকে টাকা নেওয়া হয়েছে কিন্তু পিআইসি দেওয়া হয়নি, এমন কথাও শোনা যাচ্ছে।
বেহেলী ইউনিয়নের হরিনগর গ্রামের বাসিন্দা ৬নং ওয়ার্ডের ইউপি মেম্বার মো. জালাল উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাঁধ তীরবর্তী কাজের যোগ্য প্রকৃত কৃষকের কেউ কাজ পায়নি। যারা পেয়েছে তাদের অধিকাংশই অসীম চেয়ারম্যানের লোক। আমার বাড়ির পার্শ্ববর্তী বাঁধের কাজ দেওয়া হইছে ৫নং ওয়ার্ডের দূরবর্তী গোপালপুর গ্রামের হিমাংশু ও বিশ্বজিৎ দাসকে। যারা চেয়ারম্যানের পকেটের মানুষ। আমি গতবারও কাজ করেছি কিন্তু এবার পাইনি। তবে তাকে টাকা দিলে হয়তো কাজ পেতাম।’
তিনি আরও বলেন, টাকা দিয়েও পিআইসি পাননি এমন একজন আমাকে জানিয়েছে, ‘বাঁধের কাজ পেতে গিয়ে চেয়ারম্যানকে ৪০ হাজার টাকা দিয়েছেন, কিন্তু কাজ পাননি। এতে বোঝা যায় টাকার বিনিময়ে অনেককেই পিআইসি পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। ’
হাওর রক্ষা বাঁধের কাজে অভিজ্ঞ বেহেলী ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের ইউপি মেম্বার প্রণব রায় পিলু বিক্ষুব্ধ সুরে বলেন, ‘আমরা পিআইসি পাইনি। এ বছর যে পিআইসি হয়েছে, তা একদম সিন্ডিকেট। তার অধিনায়ক আমাদের ইউপি চেয়ারম্যান অসীম তালুকদার। কিন্তু যারা গত তিন বছর হাওরের জন্য যুদ্ধ করে ভালো কাজ করেছে, যেমন- আমি (প্রণব রায় পিলু), আব্দুল গনি, বাদশা মিয়া, দেবাশীষ তালুকদার, মিহির লাল রায়, মো. জালাল উদ্দিন, তারা কেউ এ বছর পিআইসি পায়নি। এই যে লুটপাট শুরু হয়েছে, এইটা দেখব কে?’
এছাড়া পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকে সুনির্দিষ্টভাবে জানিয়েছেন, ‘১৩, ১৪, ১৫, ১৭, ৫০, ৫৯, ৬০, ৬৮নং পিআইসির রূপন তালুকদার, সমীর তালুকদার, আরাধন তালুকদার, কুমেন্দ্র চন্দ্র বর্মণ, জানকীনাথ চৌধুরী, জনাকিনাথ তালুকদার, নিরঞ্জন রায় ও হিমাংশু রঞ্জন দাসের নামে যে পিআইসি আনা হয়েছে সেগুলোর সাথে অসীম চেয়ারম্যান সরাসরি যুক্ত। এদের মধ্যে কেউ কেউ বাইরে চাকরি করেন।’
তারা আরও জানিয়েছেন, ‘সমীর ঢাকায় গার্মেন্টসে চাকরি করে। তার পরিবার এখনও ঢাকায় অবস্থান করছে। এছাড়া রূপন চাকরি করত ছাতকের একটি পাথরের মিলে। এরা বাড়িতে আসছে কিছুদিন হয়। অসীম চেয়ারম্যান তাদেরকে ডেকে এনে তার নিজের অঘোষিত পিআইসিতে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।’
এছাড়া আরও অভিযোগ উঠেছে, অসীমের নেতৃত্বে নাকি একটি বড় সিন্ডিকেট কাজ করেছে। ঐ সিন্ডিকেটে তার সাথে সাংবাদিক ও রাজনীতিক পরিচয়ধারী আরও দু’জন আছে। যাদের কবলে পড়ে পিআইসি বঞ্চিত হয়েছে গত বছরের হাওর রক্ষা বাঁধ কাজে অভিজ্ঞ বেশ কয়েকজন কৃষক ও ইউপি সদস্য।
আলোচিত অসীম তালুকদারের বিরুদ্ধে হাওর রক্ষা বাঁধ কাজের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। ২০১৭ সালে হাওর ডুবিতে আরেক পলাতক ৫নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য ও অসীমের এক সময়কার সিন্ডিকেট মিত্র অজিত রায় প্রতারক অসীমের বিরুদ্ধে আদালতে দাঁড়িয়েছেন। গত বছর বেহেলী ইউনিয়নে এ দু’জন হাওর রক্ষা বাঁধ কাজের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেই ভাগবাটোয়ারা নিয়ে অজিত-অসীমের দহরম-মহরম সম্পর্কে ফাটল ধরে। পরে ভাগের টাকা না পেয়ে অজিত অসীমের বিরুদ্ধে মামলা টুকে দেন। যা এখনও চলমান আছে।
২০১৭ সালে হাওর তলিয়ে যাওয়ার পর কৃষকের আর্তনাদে হাওরের বাতাস ভারি হয়ে উঠলে এ দু’জন এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। এ সময় স্থানীয় এক সাংবাদিক অসীম-অজিতসহ পলাতক আরও কয়েকজনের নামে দুদক বরাবরে একটি অভিযোগ দায়ের করেন।
পিআইসিতে অসীমের সম্পৃক্ততা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পিআইসির সদস্য সচিব বলেন, ‘আমরার এইখানও যতডি আইছে এইডি চেয়ারম্যানের (অসীম) আওতায়ই আইছে। এই কাজ করার মতো আমরার টেকাপয়সা আছেনি। টেকা জমা দেওনসহ মেশিন আনতে লাখ লাখ টেকা লাগে। এই সবগুলাই অসীম চেয়ারম্যানেই দিব।’
এ ব্যাপারে সব অভিযোগ অস্বীকার করে বেহেলী ইউপি চেয়ারম্যান অসীম তালুকদার বলেন, ‘আমার নির্দেশে তো আর পিআইসি দেওয়া হয়নি। আমার নামে অভিযোগ আছে, এ জন্য আমাকে পিআইসিতে রাখা হয়নি। যাচাই বাছাই করে পিআইসি দিয়েছেন ইউএনও মহোদয়ের কমিটি। এখন বলা হয়, আমার সাথে যাদের সম্পর্ক তাদেরকে নাকি আমি পিআইসি দিয়েছি। এ সব অভিযোগ মিথ্যা।’
উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি প্রিয়াংকা পাল বলেন, ‘নতুন-পুরাতন মিলেই পিআইসি দেওয়া হয়েছে। পুরাতন অভিজ্ঞদের মধ্যে হয়তো কয়েকজন বাদ পড়েছেন। যাদেরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তারা মাঠে ঠিকমতো কাজ করছে, না অন্যরা কাজ করছে সেটা আপনাদের দেখা দরকার।’