দেওয়ান গিয়াস চৌধুরী
চারুকলা। এইচএসসি পাসের পর বিশ^বিদ্যালয় পড়তে ইচ্ছুক বেশীর ভাগ শিক্ষার্থীদের বিষয়বস্তু নির্বাচনের ক্ষেত্রে চারুকলা অনুষদ পছন্দের তালিকায় খুব একটা থাকে না। যাও থাকে তাও খুব অল্প সংখ্যাক। আর সুনামগঞ্জের নাম আসলে চারুকলায় পড়ছে হাতেগুনা কয়েকজন। আর যারা এই বিষয়টি বেছে নিয়েছেন তারা খুব আগ্রহ করেই নিয়েছেন এবং স্বাচ্ছন্দ্যে পড়াশুনা করছেন। তবে বর্তমান সময়ে চারুকলা বিষয়টি দিনে দিনে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এই বিষয় নিয়েও পড়াশুনা করে ক্যারিয়ার গড়া যেতে পারে সেই দিকটা বিবেচনা করে সুনামগঞ্জের শিক্ষার্থীসহ তরুণ প্রজন্মকে বুঝাতে এবং চিত্র প্রর্দশনী মাধ্যমে গুরুত্ব দিতেই দেশের বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ে চারুকলায় পড়ুয়া সুনামগঞ্জের মেধাবী শিক্ষার্থীরা দলীয় শিল্পকর্ম প্রর্দশনী ২০২১’র আয়োজন করেন ‘অপ্রাকৃতপ্রকৃতি’ শিরোনামে।
সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলার সংগ্রহশালায় তিন দিনের এই প্রদর্শনীতে দেশের বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলার সাবেক ও বর্তমান নবীণ-প্রবীদের একশটিরও বেশী ছবি স্থান পেয়েছে। আর করোনাকালীন এই সময়টাকেই শিক্ষার্থীরা বেছে নিয়ে কাজে লাগিয়েছেন। আয়োজকেরা জানান, দেখা গেছে বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। ছুটি খুব একটা পাওয়া যেত না। তাই এতো দিন চাইলেও এমন একটি প্রর্দশনীর আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। তবে এখন থেকে নিয়মিত এমন প্রর্দশনীর আয়োজন করা খুব দরকার।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলার ডিপার্টমেন্ট অব প্রিন্টমেইকিং’র শিক্ষার্থী তাফান্নুম কাগজী বলেন, করোনা মহামারী চলাকালীন এই সময়ে সব কিছুই বন্ধ ছিল। ক্লাস বন্ধ থাকায় কোন কিছুই করা যাচ্ছিল না। তাই হাতের কাছে যে উপকরণ পেয়েছি তা দিয়েই কাজ করেছি। তখন আমরা সুনামগঞ্জের যারা দেশের বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলাতে পড়াশুনা করি তাদের সবাইকে নিয়ে কিছু করা যায় কিনা চিন্তা করি। পরে দেখা গেছে আমাদের চিন্তা-ভাবনার সাথে অন্যদের চিন্তা-ভাবনাও মিলে গেছে। তাই আমরা সিদ্বান্ত নেই সুনামগঞ্জের শিক্ষার্থীসহ তরুণ প্রজন্মের জন্য কিছু একটা করতে হবে যাতে এই জনপদের মানুষ চারুকলা কি এবং কেন তা বুঝতে পারে এবং এই বিষয়ে আগ্রহ বাড়ে।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলার ডিপার্টমেন্ট অব গ্রাফিকস ডিজাইন নিয়ে পড়াশুনা করা তাফান্নুম কাগজী বোন ইরতিজা কাগজী বলেন, পৃথিবীতে ছবি দিয়েই অনেক কিছু বোঝানো সম্ভব। যেখানে হাজার হাজার লাইন লিখা দিয়ে অথবা গল্প বলে যেখানে মনের ভাব, আবেগ, অনুভূতি, কষ্ট, হাসি-কান্না বোঝানো লাগে সেখানে একটি ছবি সব কিছু একবাবে বোঝাতে সক্ষম। এমন অনেক দেশ আছে যেখানে আমাদের ভাষা বোঝে না তাদের কাছেও একটি ছবি এঁকে আমি কি বলতে চাই তা বোঝানো সম্ভব। মানে ছবির মাধ্যমে ভাবের আদান-প্রদান করা যায়। তিনি বলেন ‘আমি অনেক গুলি ছবি এঁকেছি। অনেক গুলো গান, কবিতা দিয়ে আমি ছবি এঁকেছি। এক একটি ছবিতে এক একজন চিত্রশিল্পীর আবেগ, অনুভূতি, প্রতিবাদ, কষ্ট, হাসি-কান্না প্রকাশ পায়।
ইউনির্ভাসিটি অব ডেভোলাপমেন্ট অল্টারনেটিভ (ইউএডা) ড্রয়িং এন্ড পেইনটিং বিভাগের শিক্ষার্থী শুভ্র তালুকদার বলেন, সুনামগঞ্জের মানুষ এখনো চারুকলা বিষয় নিয়ে খুব একটা আগ্রহ দেখায় না বা এখনো বোঝেন না। আমরা যারা এই বিষয় নিয়ে ঢাকায় পড়াশুনা করছি আমরা খেয়াল করেছি আমাদের সুনামগঞ্জের শিক্ষার্থীর সংখ্যা খুব কম। যেখানে অন্যান্য জেলার শিক্ষার্থীর সংখ্যা এই বিষয়ে অনেক বেশী। তাই আমরা চেয়েছি এই উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীসহ অভিভাবকদের সবাইকে এই বিষয়ে জানাতে যে এই বিষয় নিয়েও পড়াশুনা করা যায়। আর আমরা এই প্রর্দশনীতে দেশের খ্যাতিমান চিত্র শিল্পীদেরও ছবি রেখেছি। সেই সাথে সুনামগঞ্জের চিত্রশিল্পীদের ছবিও রেখেছি। আমরা চেয়েছি নবীণ-প্রবীণদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে এটি সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়–ক। আমাদের আয়োজনের উদ্দেশ্য সফল হোক।
একই বিশ^বিদ্যালয়ের ড্রয়িং এন্ড পেইনটিং দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী কারিশমা দেবী মনি বলেন, ¯িœগ্ধ প্রকৃতি আমরা দারুণ লাগে। আর সবুজ, সাদা, লাল, নীল রং এর মিশ্রণে আমার ভালো লাগার সেই ¯িœগ্ধ প্রকৃতি রূপ ফুটিয়ে তুলি ক্যানভাসে। তৈরী হয় একেকটা পেন্টিং এর ক্যানভাস। আর এই ভালোবাসা থেকেই পেইন্টিং আমার পছন্দের শীর্ষে। একান্ত ভালোবাসা থেকেই চারুকলা আসা।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলার ডিপার্টমেন্ট অব গ্রাফিকস ডিজাইনের সাবেক শিক্ষার্থী রুনা শাহীন আরা লেইস বলেন, আমরা যখন এই বিষয়টা নিয়ে পড়াশুনা করেছি তখন মানুষ খুব একটা এই বিষয় নিয়ে জানতো না, এখন দেখছি সুনামগঞ্জের অনেকই চারুকলা নিয়ে পড়ছে। ব্যাপারটা আমার খুবই ভালো লাগছে। এখন যে কেউ অন্যান্য বিষয়ের মতই চারুকলা নিয়েও ক্যারিয়ার বানাতে পারে। চারুকলা যে শুধু চবি আঁকা তা-ই শুধু নয়, এই একই বিষয়ে পড়াশুনা করে অনেক কিছুই করা সম্ভব। বিভিন্ন মুভি বা নাটকের গ্রাফিকসেও কাজ করা সম্ভব।
গত শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৪টায় সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমীর সংগ্রহশালায় তিন দিনের চিত্রকর্ম প্রর্দশনীর উদ্বোধন করেন সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমীর সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শামসুল আবেদীন। এসময় উপস্থিত ছিলেন সুনামগঞ্জ জেলা উদীচীর সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম, জেলা কালচারাল অফিসার আহমেদ মঞ্জুরুল হক চৌধুরী পাভেল, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অঞ্জন চৌধুরী প্রমুখ।
প্রর্দশনীতে খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী সুনীল শুক্লা, হেরল রশীদ, তারেক আমীন ও জয়ন্ত কুমার তালুকদার’র ছবিও রাখা হয়েছে। এছাড়া ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলার সাবেক সাবেক শিক্ষার্থী রুনা শাহিন আরা লেইস, জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক রতœাসাওর সূত্রধর, সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমীর চারুকলার প্রশিক্ষক দীপেন্দ্র নারায়ান চৌধুরী স্বপন, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষার্থী শুভ্র রায়, কলকাতা বিশ^বিদ্যালয়ের মৃণাল বণিক, চিটাগাং বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অরুণধ্যুতি চক্রবর্তী, ইউনির্ভাসিটি অব ডেভোলাপমেন্ট অল্টারনেটিভ (ইউএডা) শিক্ষার্থী শুভ্র তালুকদার, একই বিশ^বিদ্যারয়ের ড্রয়িং এন্ড পেইনটিং দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী কারিশমা দেবী মনি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ে সৌম্য রায় অমিত, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষার্থী তাফান্নুম কাগজী, ইরতিজা কাগজী, চিটাগাং বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জয় তালুকদার, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষার্থী ঋতুপর্ণা তালুকদার সাথী, ইউনির্ভাসিটি অব ডেভোলাপমেন্ট অল্টারনেটিভ (ইউএডা) শিক্ষার্থী ইমরান হোসেন মাসুম, সিলেট মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির ইংরেজী বিভাগের শিক্ষার্থী অয়ন চৌধুরী এবং ঢাকা আর্ট কলেজের শিক্ষার্থী প্রান্ত চন্দের শতাধিক ছবি প্রর্দশনীর জন্য রাখা হয়েছে।


