অবহেলিত শহীদ সিরাজের সমাধিস্থল

এম.এ রাজ্জাক, তাহিরপুর
তাহিরপুরে স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরেও শহীদ সিরাজুল ইসলামের সমাধি স্থলটি অবহেলিত অবস্থায় রয়েছে। জঙ্গল আর ময়লা আর্বজনায় ভরপুর শহীদ মুক্তিযোদ্ধার শেষ স্মৃতি চিহ্নটুকু।
কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা থানার ছোট গ্রাম ছিলানী। সেখানেই জন্মগ্রহণ করেন সিরাজুল ইসলাম। যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি তুখোড় ছাত্রনেতা। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর দেশের টানে কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী ও নিজগ্রাম থেকে কয়েকজন যুবককে সাথে নিয়ে যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। ট্রেনিং নিতে চলে যান ভারতের মেঘালয় রাজ্যের বালাট ক্যাম্পে। সেখান থেকে আসাম রাজ্যের ইকুয়ানে পাঠানো হয় গেরিলা প্রশিক্ষণ নিতে। প্রশিক্ষণ শেষে মেজর মীর শওকত আলীর অধীনে যোগ দেন যুদ্ধকালীন ৫ নম্বর সাবসেক্টর ট্যাকেরঘাটে। তাঁর দক্ষতার কারণে তিনি একটি কোম্পানির সহকারী কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত হন। সে কোম্পানির অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন প্রয়াত নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তৎকালীন সুনামগঞ্জ মহুকুমার গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর জামালগঞ্জ উপজেলার সাচনাবাজার দিয়েই পাক হানাদার বাহিনীর রসদ সিলেট পৌঁছানো হত। এই নদীবন্দরকে মুক্ত করার জন্য মিত্র বাহিনীর মেজর বাট ও জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ৩৬ জন চৌকুস মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গঠন করা হয় একটি এডভান্স পার্টি। এ পার্টির নেতৃত্ব দেন সিরাজুল ইসলাম। ১৯৭১ সালের ৮ আগস্ট এডভান্স পার্টি সূর্যান্তের পরপরই শুধুমাত্র ত্রি-নট থ্রি রাইফেল আর গ্রেনেড নিয়ে কমান্ডার সিরাজের নেতৃত্বে ট্যাকেরঘাট সাব সেক্টর হতে ২৫ মাইল দক্ষিণে সাচনাবাজার পৌঁছে পাক হানাদার বাহিনীর সুরক্ষিত ব্যাংকারে গেরিলা আক্রমণ করেন। অতর্কিত হামলায় ব্যাংকারে অবস্থানরত পাক বাহিনীদের মৃত্যু হয় এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম আনন্দে লাফিয়ে উঠে জয়বাংলা শ্লোগান দিতে থাকেন এমন সময় পাক বাহিনীর একটি বুলেট এসে তার চোখে বিদ্ধ হলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। কিছুক্ষণ পরই তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর শহীদ সিরাজুল ইসলামের মৃতদেহ টাকেরঘাট সাবসেক্টরে নিয়ে আসা হয় এবং পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় ট্যাকেরঘাট সাব সেক্টরে সমাহিত করা হয়। তাঁর অসমান্য অবদানের জন্য শহীদ সিরাজুল ইসলামকে সরকার বীর বিক্রম উপাধিতে ভূষিত করেন।
কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরেও একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি ধরে রাখতে না পারায় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
ট্যাকেরঘাট সাব সেক্টরে শহীদ সিরাজের সহযোদ্ধা সাবেক উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার রৌজ আলী বলেন, শহীদ সিরাজ তার বাবার উদ্দেশ্যে লিখা একটি চিঠি আজো আমার কাছে সংরক্ষিত আছে। বর্তমান মহামান্য রাষ্ট্রপতির সঙ্গীয় যোদ্ধা ছিলেন শহীদ সিরাজুল ইসলাম। তাঁর নামে এখানে একটি লেকের নামকরণ করা হলেও তাঁর সমাধিস্থলটি এখনও অবহেলিত। তিনি তাঁর সমাধিস্থলটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানান।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পদ্মাসন সিংহ বলেন, শহীদ সিরাজের সমাধি স্থলটির খোঁজ নিয়ে দ্রুত রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত করা হবে।