মেয়েদের অনুর্ধ্ব-১৫ সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশীপে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ দলের প্রতিটি খেলোয়াড়, কোচ ও কর্মকর্তাদের আমাদের অভিনন্দন। দীর্ঘদিন পর সাফ ফুটবল প্রতিযোগিতার কোন একটি ইভেন্টে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করল। তাও যে সে জয় ছিল না এটি। একেবারে গ্রুপ পর্যায়ের খেলা থেকে সেমিফাইনাল হয়ে ফাইনাল পর্যন্ত বাংলাদেশি ফুটবল স্বর্ণকিশোরীরা দাপুটে অবস্থান বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল। কখনও বাংলাদেশকে আন্ডারডগ অবস্থানে দেখা যায় নি এই প্রতিযোগিতায়। ফাইনালে ভারতের মতো শক্তিধর দলকে ১-০ গোলে পরাজিত করলেও মাঠের খেলার অধিকাংশই দখলে ছিল আমাদের ফুটবল কিশোরীদের। যেকোন প্রতিযোগতায় বিজয় অর্জন অবশ্যই গৌরবের। সেটি যদি হয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কোন ট্রফি, তাহলে সেটি আরও গৌরবদীপ্ত। মারিয়া, মনিকা, মার্জিয়া, শামছুন্নাহার, আনুচিং, তহুৃরারা এই প্রতিযোগিতায় রীতিমতো উড়ে চলছিল। তাদের এই উড়া থেমেছে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি হাতে তুলার পর। বাংলাদেশের ফুটবলের এই দুর্দিনে এমন এক জয় রীতিমত টনিকের মতো কাজে দিবে বলে আমাদের বিশ্বাস। এই যে কিশোরী মেয়েরা একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে সাফল্যের পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করল তাদেরকে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে ফুটবল ফেডারেশনকে। এই কিশোরীদের অনাদর অবহেলায় দূরে ঠেলে রাখলে ফুটবলের অবনমন রোধ করার সাধ্য কারও নেই। কিন্তু আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা বলে, মেয়ে ফুটবলররা বাফুফের যথেষ্ট অবহেলা অবজ্ঞার শিকার হয়ে থাকেন। বিদেশে সুনাম অর্জনকারী নারী ফুটবলারদের সাধারণ বাসে করে বাড়ি পাঠানোর সেই জাতীয় অবজ্ঞার কথা আজও আমরা ভুলিনি। বাফুফে যদি অতীতের সেই উদ্ধতপনার জায়গা থেকে বেরিয়ে না আসে তাহলে আজকের চ্যাম্পিয়ন স্বর্ণকিশোরীরা চোরাবালিতে হারিয়ে যাবে, সন্দেহ নেই।
খেলাধুলা হলো শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রদূত। বিদেশে দেশকে পরিচিত করতে হাল আমলে ক্রিড়াই রাখতে পারে সবচাইতে বড় ভূমিকা। আজ ক্রিকেটের কারণে ক্রিকেট বিশ্বে বাংলাদেশের পরিচিতি সম্মানের আসনে অধিষ্টিত। ফুটবল এমন একটি খেলা যা সারা পৃথিবীর সকল অঞ্চল ও মানুষের কাছে সমান জনপ্রিয়। বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেতে ফুটবলের বিকল্প আর কিছু হতে পারে না। বাংলাদেশের আনাচে কানাচেও ফুটবল সমান জনপ্রিয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখন ফুটবল যেখানে, আমাদের ছেলেমেয়েদের অবস্থান তার চাইতে অনেক অনেক পিছনে। ফুটবল এখন অনেক বেশি ট্যাকটিসের খেলা। ফুটবল খেলতে হয় মাথা খাটিয়ে। এই জায়গায় পাকাপোক্ত অবস্থান করতে চাইলে অনুশীলনের কোন বিকল্প নেই। কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদী অনুশীলন আমাদের খেলোয়াড়দের আস্তে আস্তে বিশ্বমানের করে গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। এজন্য সবার আগে দরকার ফুটবল বিষয়ে জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। ক্রিকেটের সাথে সমান গুরুত্ব দিয়ে ফুটবলকেও পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে। তৃণমূলে নিয়মিত প্রতিযোগিতামূলক খেলা চালু করতে হবে। স্কুল ফুটবলিং কার্যক্রমের ব্যাপ্তি ও গতি বাড়াতে হবে। জেলায় উপজেলায় বাছাই করা খেলোয়াড়দের নিয়ে ট্রেনিং সেশন করতে হবে। বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতাগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। আর সবার আগে জেলায় জেলায় বা উপজেলায় উপজেলায় ফুটবল ফেডারেশনের যে বাহারী কমিটি আছে সেগুলোকে সক্রিয় হয়ে উঠতে হবে।
সাফ চ্যাম্পিয়নশীপের মধ্য দিয়ে আমাদের ফুটবল স্বর্ণকিশোরীরা এই জাগরণের বার্তাই দিয়ে গেছে।

