বাংলাদেশের ৮০ লাখেরও বেশি মানুষ বিদেশে অভিবাসী হিসেবে কর্মরত আছেন। প্রতি বছর প্রায় ৬ লাখ কর্মীর বিদেশে কর্মসংস্থান হচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে একটি বড় ভূমিকা রাখছে প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো রেমিটেন্স। এই বিবেচনায় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দিবসটির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। অভিবাসী কর্মীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে তাদের অবদানের স্বীকৃতি, সেই সঙ্গে প্রবাসী কর্মীদের অধিকার সংরক্ষণ, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করাই এ দিবসকে কেন্দ্র করে আমাদের বিবেচ্য।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৫৭টি দেশে কর্মরত আছেন দেশের ৮০ লাখের বেশি মানুষ। তাদের শ্রমে দেশের রেমিটেন্স আয় বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রবাসী আয়ের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। প্রবাসীরা যারা দেশের অর্থনীতিতে এত অবদান রাখছেন, তাদের প্রতিও নিশ্চয় রাষ্ট্রের বিশেষ দায়-দায়িত্ব রয়েছে। জনশক্তি রপ্তানি ও প্রবাসী কল্যাণে আমাদের রাষ্ট্রীয় আয়োজন একেবারে ছোট নয়। জনশক্তি রপ্তানি ব্যুরো, স্বতন্ত্র প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, বৈদেশিক কর্মসংস্থান নীতি, ওয়েজ আর্নার ওয়েলফেয়ার বোর্ড ইত্যাদি গঠন করা হয়েছে। বর্তমানে বৈদেশিক কর্মসংস্থান সরকারের একটি অন্যতম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। তবে সরকারি খাতের যত আয়োজন, সে অনুযায়ী কাজ কতটা হচ্ছে- এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি কর্মীদের ঝুঁকিপূর্ণ অমানবিক কাজে নিয়োজিত হওয়া, কষ্টকর জীবনযাপনের খবর প্রায়ই আমরা পাই। অবৈধভাবে বিদেশে গিয়ে এ দেশের অনেক যুবককে জেলের ঘানি টানতে হচ্ছে কিংবা কর্মহীন পলাতক জীবনযাপন করতে হচ্ছে। অনেকে অপরাধ চক্রের ফাঁদে পড়ে জড়িয়ে পড়ছেন নানা অপরাধমূলক কাজে। বিদেশ গমনেচ্ছুদের দালালের খপ্পরে পড়ে প্রতারিত হওয়ার ঘটনা এখনো ঘটছে। এ ছাড়া জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিপজ্জনক সমুদ্রপথে অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা এখনো দেখা যাচ্ছে।
অবৈধভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশযাত্রা রোধে ও দালাল প্রতারকদের দৌরাত্ম্য কমানোর ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনায় জনশক্তি রপ্তানির উদ্যোগ বেশ আশার আলো দেখিয়েছিল। কিন্তু তা কাঙ্খিত মাত্রায় কার্যকর না থাকায় এসব অবৈধ তৎপরতা থামেনি। অবৈধ পথে বিদেশ যাত্রা রোধ ও বিদেশে নিরাপদ কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার জন্য বৈধ পথে কম খরচে প্রবাসে কর্মসংস্থানের সরকারি উদ্যোগে গতি আনা, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মী প্রেরণ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। যেসব দেশে আমাদের বড় শ্রমবাজার রয়েছে সেসব দেশেও বাংলাদেশি দূতাবাস বা মিশনগুলোর কর্মকান্ড নিয়ে প্রবাসীদের অভিযোগ-অসন্তোষ রয়েছে। ওইসব দেশগুলোতে বাংলাদেশি মিশনগুলোতে পর্যাপ্ত লোকবল নিয়োগ এবং তাদের প্রবাসী কর্মীদের সংকট সমস্যাগুলোর প্রতি বিশেষ মনোযোগী করা প্রয়োজন। এ ছাড়া দেশের বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি বন্ধ করা, দেশে প্রবাসীদের কষ্টার্জিত বিনিয়োগের নিরাপত্তা দান এবং তাদের ভোটাধিকার সুনিশ্চিত করার বিষয়গুলোও জরুরি। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের অধিকার সংরক্ষণ, তাদের সমস্যা সমাধান ও সার্বিক কল্যাণ সাধনের মধ্য দিয়েই নিশ্চিত হবে দিবসটি পালনের সার্থকতা। অন্যদিকে অভিবাসীদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করে তাদের মর্যাদা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক পরিসরেও আমাদের বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে যেতে হবে। গত ১০-১২ ডিসেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘গ্লোবাল ফোরাম ফর মাইগ্রেশন এন্ড ডেভেলপমেন্টের (জিএফএমডি)’ নবম শীর্ষ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ১২৫টি দেশ, ৩০টির বেশি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে অভিবাসীদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করে তাদের মর্যাদা নিশ্চিত করতে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৮ সালের মধ্যে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে অভিবাসী ও উদ্বাস্তু সংক্রান্ত বৈশ্বিক চুক্তি করার ব্যাপারে বাংলাদেশকে কণ্ঠ সোচ্চার রাখতে হবে নিজেদের স্বার্থেই।
- ‘আ.লীগের বিভক্তি জোরদার করাই আমাদের লক্ষ্য’
- সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭৫ বছর পূর্তি আমাদের অহংকার (৬)

