সু.খবর ডেস্ক
টেস্টের প্রতিটা বাঁকে মজা, উত্তেজনা আর নাটক। ঢাকা টেস্ট তেমনই এক অনন্য ম্যাচ, যারা দেখেছেন তারা ভাগ্যবান। গত চারদিনে কত কীইনা ঘটেছে। কখনও বাংলাদেশ এগিয়ে থেকেছে, আবার কখনো অস্ট্রেলিয়া। কখনও মনে হয়েছে না, এ ম্যাচ জিততে পারবে না টাইগাররা। তবে সব উত্তেজনা আর অনিশ্চয়তা পাশ কেটে অবশেষে মনে রাখার মতো জয় তুলে নিল বাংলাদেশ। যে জয়ে সাকিব মহানায়ক। ব্যাট হাতে প্রথম ইনিংসে ৮৪ রানের লড়াকু ইনিংস, এরপর পাঁচ উইকেট। কঠিন পরিস্থিতি ফের ত্রাণকর্তা। দেখালেন স্পিন জাদু। আর সেই জাদুতে অজি ব্যাটিং ধূলিস্মাৎ, এবারও পাঁচ উইকেট। সঙ্গে আলো ছড়ালেন তাইজুল, মিরাজরাও। আর তাতেই অস্ট্রেলিয়াকে ২০ রানে হারিয়ে আরেকবার চমক দেখালো টাইগাররা।
সাড়ে এগার বছর আগে ফতুল্লা টেস্টে ম্যাথু হেইডেন এবং রিকি পন্টিং বাংলাদেশের জয়ের স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছিলেন। প্রায় এক যুগ পর ফিরে আসে সেই টেস্টেই দুঃসহ স্মৃতি। এবার হেইডেন-পন্টিংয়ের ভূমিকা নেন ডেভিড ওয়ার্নার ও স্টিভেন স্মিথ। ২৬৫ রানের লক্ষ্যে ব্যাটিংয়ে নেমে অস্ট্রেলিয়া ২৮ রানে ২ উইকেট হারিয়ে ব্যাকফুটে চলে গেলে জয়ের স্বপ্নে বিভোর হয়ে পড়ে গোটা বাংলাদেশ। কিন্তু এই সময়ই ১৩০ রানের দুর্দান্ত জুটি গড়ে টাইগারদের স্বপ্নে হানা দেন ওয়ার্নার-স্মিথ। ক্রমেই ফিকে হচ্ছিল বাংলাদেশের স্বপ্ন। তবে কি ফতুল্লার মতো আরেকটি শোকগাথা হয়ে থাকবে মিরপুরের হোম অব ক্রিকেটে? না; কোনো শোকগাথা নয়; বাংলাদেশ লিখল বীরত্বগাথা। ২০০৬ সালে শত চেষ্টা করেও পারেননি মোহাম্মদ রফিকরা। এবার পারলেন সাকিব আল হাসান ও তাইজুল ইসলামরা। মিরপুর টেস্টে চরম নাটকীয়তা শেষে অস্ট্রেলিয়াকে ২০ রানে হারিয়ে ফতুল্লা টেস্টেরই যেন বদলা নিল বাংলাদেশ। টেস্ট ক্রিকেটে নতুন উপাখ্যান লিখল লাল সবুজের প্রতিনিধিরা।
বুধবার টেস্টের চতুর্থ দিন ২ উইকেটে ১০৯ রান নিয়ে ব্যাটিংয়ে নামে অস্ট্রেলিয়া। ওয়ার্নার ৭৫ এবং স্মিথ ২৫ রান নিয়ে ব্যাটিংয়ে নামেন। শুরু থেকেই দুজনই খেলতে থাকেন আস্থার সঙ্গে। তাইজুল ইসলামের করা ৩৯তম ওভারের প্রথম বলে কভারে ঠেলে দিয়ে দুই রান নিয়ে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন ওয়ার্নার। এশিয়ার মাটিতে এটি অস্ট্রেলিয়ান ওপেনারের দ্বিতীয় এবং উপমহাদেশের মাটিতে প্রথম সেঞ্চুরি। সব মিলিয়ে ক্যারিয়ারের ১৯তম সেঞ্চুরি। সেঞ্চুরি পর আরো বিপজ্জনক হয়ে উঠছিলেন ওয়ার্নার। তবে সাকিবের করা ৪২তম ওভারের পঞ্চম বলে লেগ বিফোরের ফাঁদে পড়ে সাজঘরে ফিরতে হয় তাকে। আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে রিভিউ নিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি ওয়ার্নারের। তবে আউট হওয়ার আগে ঠিকই বাংলাদেশের কাছ থেকে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেন এই অজি ওপেনার। ওয়ার্নারের আউটের পর ক্রিজে আসেন হ্যান্ডসকম্ব। তাকে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন স্মিথ। তবে সাকিবের করা ৪৬তম ওভারের পঞ্চম বলে মুশফিকের দুর্দান্ত ক্যাচের শিকার হয়ে স্মিথ ফিরে গেলে বাংলাদেশের জয়ের ¤্রয়িমান স্বপ্ন আলোর মুখ দেখতে শুরু করে। দলীয় ১৮৭ রানের মাথায় হ্যান্ডসকম্ব আউট হয়ে ফিরে গেলে বাংলাদেশ আরো উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। দলীয় ১৮৭ রানের মাথায় তাইজুলের বলে কাট করতে গিয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ তুলে দেন হ্যান্ডসকম্ব। মুশফিকের গ্লাভসে লেগে বল স্লিপে সৌম্য সরকারের কাছে যায়। প্রথম চেষ্টায় ব্যর্থ হলেও দ্বিতীয় চেষ্টায় ঠিকই ক্যাচ লুফে নেন সৌম্য। দলীয় ১৯২ রানের মাথায় ম্যাথু ওয়েডকে লেগ বিফোরের ফাঁদে ফেলে মিরপুরের হোম অব ক্রিকেটে গর্জন তোলেন সাকিব। এর রেশ কাটতে না কাটতেই অ্যাস্টন অ্যাগারের ফিরতি ক্যাচ নিয়ে বাংলাদেশকে চালকের আসনে নিয়ে যান তাইজুল। অ্যাগার ফিরে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর লাঞ্চের বিরতিতে যায় দুই দল। বিরতি থেকে ফিরে প্রথম বলে অস্ট্রেলিয়া শিবিরে হানা দেন সাকিব। বিরতির পর সাকিবের করা প্রথম বলেই বোল্ড হয়ে ম্যাক্সওয়েল সাজঘরে ফিরলে আনন্দে মেতে ওঠে মিরপুরের হোম অব ক্রিকেট। নবম উইকেটে নাথান লায়ন ও প্যাট কামিন্স কিছুটা চিন্তায় ফেলে দেন বাংলাদেশকে। এসময় বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন অধিনায়ক মুশফিক। তাইজুলকে সরিয়ে আক্রমণে আনেন মিরাজকে। প্রতিদান দিতে সময় নেননি তিনি। মিরাজের অফ-ব্রেকে স্লিপে সৌম্য সরকারের দুর্দান্ত ক্যাচের শিকার হয়ে লায়ন ফিরে গেলে বাংলাদেশের জয়ের জন্য দরকার পড়ে ১ উইকেটের। চার-ছক্কায় বাংলাদেশকে ভড়কে দিয়েছিলেন প্যাট কামিন্স। তবে আস্থা হারায়নি বাংলাদেশ। চিন্তা না বাড়তেই ফের বোলিং আক্রমণে পরিবর্তন আনেন মুশফিক। আর তাতেই সফলতা পান টাইগার দলনায়ক। তাইজুলের করা ৭১তম ওভারের পঞ্চম বলে হ্যাজলউড লেগ বিফোরের ফাঁদে উল্লাসে মেতে ওঠেন সাকিব-মুশফিকরা। সেইসঙ্গে মিরপুর স্টেডিয়ামের হাজার হাজার দর্শক এবং টিভি পর্দায় কোটি কোটি দর্শক।
এই জয়ের নায়ক সাকিবই। ক্যারিয়ারে দ্বিতীয়বারের মতো ১০ উইকেট পেলেন। নিউজিল্যান্ডের কিংবদন্তি ক্রিকেটার স্যার রিচার্ড হ্যাডলির পর দ্বিতীয় ক্রিকেটার হিসেবে এক টেস্টে ১০ উইকেট ও ন্যূনতম ৫০ রান করার কীর্তিটা নিজের করে নিলেন। কিন্তু ব্যক্তিগত সেই অর্জন ছাপিয়ে দুর্দান্ত এক দলগত অর্জন বাংলাদেশের। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয় পবিত্র ঈদুল আজহার উৎসবে দেশের মানুষ এর চেয়ে বড় উপহার আর কী পেতে পারত!
৬ কোটি টাকা পুরস্কার
ঘরের মাঠে পাওয়া অসাধারণ সাফল্যের পুরস্কার হিসেবে খেলোয়াড়দের জন্য মোটা অঙ্কের পুরস্কার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনালে ওঠা এবং এই টেস্টে জয় পাওয়ায় মুশফিক-সাকিবদের মোট ছয় কোটি টাকা বোনাস দেবেন বলে জানিয়েছেন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে সাংবাদিকদের নাজমুল হাসান জানিয়েছেন, চ্যাম্পিয়নস ট্রফির অসাধারণ সাফল্যের জন্য চার কোটি টাকা এবং ঢাকা টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় পাওয়ায় দুই কোটি টাকা পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হবে খেলোয়াড় কোচ কর্মকর্তা সবাইকে।
এ ব্যাপারে বিসিবি সভাপতি বলেন, ‘খেলোয়াড়রা যে সাধারণ পারফরম্যান্স দেখিয়েছে, এই পুরস্কার তাদের প্রাপ্য। দু-একদিনের মধ্যেই খেলোয়াড়দের হাতে এই পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।’
এদিকে অস্ট্রেলিয়াকে টেস্টে হারানোর গৌরবোজ্জ্বল মুহূর্তে বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়েছেন আইসিসি, শচীন টেন্ডুলকার, সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক মাইকেল ভন, বীরেন্দর শেবাগ, সাবেক শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটার ও ধারাভাষ্যকার রাসেল আরনল্ড, মাহেলা জয়াবর্ধনে, মোহাম্মদ কাইফ সহ বিশ্ব ক্রিকেটের রথী মহারথীরা।
দুই ম্যাচ সিরিজের শেষ টেস্ট খেলতে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়া ঢাকা ছেড়ে যাবে চট্টগ্রামে। আগামী ৪ সেপ্টেম্বর শুরু হবে সিরিজের শেষ টেস্ট।


