একটি স্বার্থক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হলো ওই ভূখ-ের অন্তর্গত সকল নাগরিকের ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, পরিচয় নির্বিশেষে সমান অধিকার নিশ্চিত করা এবং তাদেরকে সুরক্ষা প্রদান করা। কিন্তু সম্ভবত বিশ্বের কোন রাষ্ট্রই এখন এই বৈশিষ্ট্য ধারণ করে নেই। বিশেষ করে যারা ধর্ম ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের তারা নানা ধরনের নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন অহরহ। ধর্ম ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের যেন জন্মই আজন্ম পাপ রূপে কপালে সিল মারা হয়ে আছে। নতুবা বিনা কারণে কেন সারা পৃথিবীতে সংখ্যালঘুরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন, তারা নির্যাতিত হচ্ছেন, হারাচ্ছেন সম্পদ-সম্ভ্রম এমনকি প্রাণ পর্যন্ত? আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তকরা এর নানা ধরনের ব্যাখ্যা হাজির করে সমাধানের উপায় বাতলে দিলেও বাস্তবে কোথাও অশান্তি ও অসাম্যের আগুনকে নিভানো সম্ভব হচ্ছে না। কথিত গণতান্ত্রিক মডেলও এর সমাধান দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। খোদ আমেরিকায় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিজয়ী হলেও সারা আমেরিকা জুরে তার বিরুদ্ধে হচ্ছে ব্যাপকমাত্রার প্রতিবাদ-বিক্ষোভ। অনেকেই তাই বলছেন প্রচলিত গণতান্ত্রিক ধারণার যে দর্শনকে আমরা মডেলরূপে গণ্য করছি তার ভিতরে যে ভূত বাসা গেঁড়েছে তাকে তাড়ানোর। অর্থাৎ কিনা কয়েক শ’ বছরের পুরানো এই মডেলটিকে এখন পরিবর্তনের কথাবার্তা উঠেছে। সবচাইতে বড় কথা হলো মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করতেই যাবতীয় তন্ত্রের উদ্ভব ঘটেছে। মানুষের কল্যাণে ব্যর্থ হলে নিঃসন্দেহে ওই তথাকথিত তন্ত্র অবশ্যই পরিত্যাজ্য হওয়া উচিৎ। এতসব কথা অবতারণার কারণ হলো বাংলাদেশে গত এক মাসে ঘটে যাওয়া কিছু বাস্তবতা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে তথাকথিত একটি ফেসবুক ছবিকে কেন্দ্র করে হিন্দু ধর্মীয় ব্যক্তিবর্গের বাড়িঘর ও মন্দিরে অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুরের পর এবার রাজশাহীর সাঁওতাল সম্প্রদায় পড়েছেন নিজেদের জমি হারানোর বাস্তবতায়। ১৯৬২ সালে একটি চুক্তিপত্রের মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী চিনিকল সাঁওতালদের জমি অধিগ্রহণ করে। শর্ত ছিল ওই জমিতে শুধু ইক্ষু উৎপাদিত হবে এবং চিনিকল ওই ইক্ষু কিনে নিবে। এভাবেই চলছিল। কিন্তু ২০০৪ সনে চিনিকল বন্ধ হয়ে পড়ার পর জমিতে ইক্ষু চাষের পরিমাণ কমতে থাকে। এদিকে বন্ধ হয়ে যাওয়া চিনিকল কর্তৃপক্ষ অধিগ্রহণকৃত জমিতে অন্যান্য ফসল উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তিকে লিজ দেওয়া শুরু করে। এর বাইরে ওই জমির উপর পুরুষানুক্রমিক উত্তরাধিকারী হিসেবে সাঁওতাল সম্প্রদায় নিজেদের অধিকার দাবি করে। এ নিয়ে চিনিকলপুষ্ঠদের সাথে সম্প্রতি এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে । প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী এই সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত তিন সাঁওতালের মৃত্যু ঘটেছে। রাষ্ট্রের অন্তর্গত একটি আদিবাসী সম্প্রদায় যখন এরকম নিপীড়নের সন্মুখীন হন তখন আশ্চর্যজনকভাবে আমরা সমাজের অপরাপর প্রভাবশালী পক্ষগুলোকে নির্লিপ্ত অবস্থানে থাকতে দেখছি। এটিই হচ্ছে ভয়ানক সামাজিক ব্যাধি। এই ব্যাধি সারানো না হলে রাষ্ট্র তার বৈশিষ্ট্য হারিয়ে কোন একটি পক্ষের স্বার্থের পাহাড়াদার হয়ে থাকবে। সরকারকে এখন চিন্তা করতে হবে আমাদের ভবিষ্যৎ কোন পথে বিনির্মাণ হবে।
নাসিরনগরের ঘটনায় কথিত রসরাজের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিলেনি। বরং তার নাম ব্যবহার করে অন্য একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য রসরাজকে বলির পাঠা বানিয়েছেন, এমনটিই উঠে আসছে এখন নানা তথ্যে। আমরা লক্ষ্য করছি চিনিকলের অধিগ্রহণকৃত জমির উপর রাজশাহীর সাঁওতাল সম্প্রদায়ের অধিকারকেও এখন অস্বীকার করা হচ্ছে। এইভাবে যদি সংখ্যালঘু জাতিসত্বাগুলো ক্রমাগত অস্বীকারের বলয়ে আটকে থাকেন তাহলে আমরা উন্নত ও আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের চিন্তা থেকে সর্বদাই অনেক দূরে অবস্থান করে থাকব। এর অবসান ঘটানো উচিৎ। রাষ্ট্র, সরকার ও সমাজকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।

