আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম-৪ সেকালের গার্জিয়ান বা অভিভাবক

স্বপন কুমার দেব
সেকালে শহুরে গার্জিয়ান বা অভিভাবকেরা ছিলেন একটু অন্যরকম। অন্যরকম বলতে এখনকার মতো সংসার সম্পত্তির বিষয়ে সদা তৎপর নয়। অবশ্য পরিবেশটাই ছিল সেরকম। তখনকার দিনে একজনের গার্জিয়ান মানে অন্যজনেরও গার্জিয়ান। সেভাবেই মান্য-মানতা ছিল। গার্জিয়ান মানে একটা গাম্ভীর্য এবং রাশভারী পরিমন্ডল। মূলত: পরিবারের পুরুষরাই অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করতেন। সেক্ষেত্রে প্রথমে পিতা, তার অবর্তমানে কাকা, জেঠা, চাচা, মামা, বড় ভাই প্রভৃতি। মায়েরা গার্জিয়ানের মূল ভূমিকায় ছিলেন না। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে মায়েরাও এ গুরুদায়িত্ব পালন করতেন। সন্তানের বা ছেলে মেয়েদের মূল সম্পর্ক ছিল মায়েদের সঙ্গে। যত আব্দার, আহ্লাদ সব মায়েদের সাথে। সব পরিবারেই পুরুষ অভিভাবকদের একটা অভিন্ন রূপ ছিল। তিনি বাসায় থাকলে এক রকম অর্থাৎ সব কিছু ঠিকঠাক, ভাবগম্ভীর পরিবেশ। সন্তানেরা সুবোধ ছাত্রের মতো পড়াশোনায় রত, হৈ-হুল্লোড় নেই। আবার অভিভাবক বাসার বাইরে থাকলে পরিবেশ উল্টে যেতো। এজন্য অভিভাবকদের প্রতি কোন অশ্রদ্ধা ছিল তা কিন্তু সঠিক নয়। তাদের প্রতি ছোটদের যেমন ছিল শ্রদ্ধা ভালোবাসা, তেমনি ছিল কিছুটা ভয়। একদম ছোট শিশু যারা, তাদের আবার পিতা অভিভাবকের সঙ্গে একটা প্রাণখোলা ভাবের আদান প্রদান ছিল। গার্জিয়ানরা বাসার অন্যদের কাছে রাশভারী হলেও তারা সন্তানের পড়াশোনা সহ যাবতীয় দায়িত্ব পালনে কোন ধরণের অবহেলা করতেন না। অভিভাবকদের নিজেদের মধ্যে তুমুল আড্ডা, হাসি-ঠাট্টা সহ আনন্দের হাট বসতো। এ ধরণের আসরে প্রধান আকর্ষণ ছিল পান-তামাক খাওয়া। সেটা নিজের বাসায় হোক কিংবা অন্যের বাসায় হোক। তামাক বা তামুক খেতে লাগে হুক্কা। আরো লাগে তামাক, টিক্কা ও ছিলিম। তামাক সাজাতে বেশ মুন্সিয়ানার দরকার। আগের দিনের গৃহকর্মীরা সবাই ছিলেন পুরুষ কামলা। তারা তামাক, চিটা একসঙ্গে মিশিয়ে হাতের তালুতে ঘষে দুরুস করে ছিলিমে ভরতেন। তারপর কায়দা করে টিক্কা (রং কালো, দেখতে বাতাসার মতো) জ্বালিয়ে ছিলিমের ভিতর তামাকের উপরে রাখা হতো। টিক্কার আগুনে তামাক ধিকিধিকি জ্বলতো আর সুগন্ধি তামাকের গন্ধ ছড়িয়ে যেতো চারিদিকে। নারকেলের খোলের ডাব্বার হুক্কা হলে আস্তো হুক্কা হাতে নিয়ে ধুমপান করতে হতো। আর ফর্সি হুক্কা হলে হুক্কা থেকে সংযুক্ত রবারের নল মুখে লাগিয়ে ধুমপান করা হতো। খাওয়ার সময় গুরুক্ গুরুক্-কলকল শব্দে ছিল মধুর আবেশ। হুক্কা দিয়ে ধুমপান ছিল অধিক স্বাস্থ্যসম্মত। কারণ হুক্কার পাত্রে রাখা জলের মধ্যে তামাকের নিকোটিন ফিল্টার হয়ে আটকে যেতো। সে কারণে ধোঁয়া ছিল অনেক বিষমুক্ত। ফর্সি হুক্কা ছিল আভিজাত্যর প্রতীক। সম্ভবত: পারস্য থেকে এ ধরণের হুক্কার আমদানী ঘটে। শহরের কালীবাড়ী এলাকার সর্বজন শ্রদ্ধেয় মরহুম আলহাজ্ব মফিজ চৌধুরী আইনজীবী মহোদয় উনার বাসার বারান্দায় পাতা আরাম কেদারায় বসে যখন ফর্সি হুক্কায় তামাক খেতেন তখন তা দেখতে ছিল শিল্পকর্মের মতো এক সুন্দর দৃশ্য। একসময় আমাদের পুরানো বার লাইব্রেরীতে হুক্কা খাওয়ার সাজ-সরঞ্জাম ছিল। সিনিয়র আইনজীবীরা বিশেষ করে প্রয়াত সুখময় বাবু, প্রয়াত মহিম বাবু সহ কয়েকজন কোর্টের কাজ শেষে দুপুর বেলায় বার লাইব্রেরীতে বসে তামাক খেতেন। পান সুপারীর জন্য ঘরে ঘরে পানের থালা ও নানা খানদানী পাত্রে পান সুপারী পরিবেশিত হতো। ছিল অনেক ধরণের বাহারী পানের বাটা। অনেকে কাঁচা সুপারী জলে ভিজিয়ে মজিয়ে খেতে পছন্দ করতেন। অভিভাবকদের মধ্যে বিভিন্ন বাসায় ঘরোয়া বৈঠক বা আড্ডার আসর বসতো। হাছননগরস্থ সর্বজন শ্রদ্ধেয় মরহুম দেওয়ান ওবায়দুর রেজা চৌধুরী সাহেবের বাসার নিচ তলার প্রশস্ত বারান্দায় গভীর রাত পর্যন্ত অভিভাবকদের বৈঠক/আড্ডা চলতো। তখনকার অভিভাবকেরা ছিলেন দিলখোলা। টেনশন অনেক কম। খাওয়া খাদ্য প্রচুর খেতেন। খাওয়ার খাঁটি জিনিসও বাজারে পাওয়া যেতো। প্রায় প্রত্যেকেই নিজ নিজ বাসায় গরু পালতেন। একে অন্যের বাসায় বেড়ানো ছিল নিয়মিত। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার ব্যাপারে সচেষ্ট ছিলেন, তবে এখনকার মতো তীব্র প্রতিযোগিতা না থাকায় দুশ্চিন্তা কম ছিল। কোন কোন অভিভাবকেরা নাটক-গান-বাজনা-কবিতার চর্চাও করতেন। একজন অভিভাবক অন্যজনের বাচ্চাকাচ্চাদেরও শাসন দেখভাল্ করতেন। এটাই ছিল স্বাভাবিক। এখন আমরা অনেকেই অভিভাবক হয়েছি, কিন্তু আগের দিনের মতো পরিবেশ নাই। এখনকার অভিভাবকেরা সবসময়ই যেনো চাপে থাকেন। যায় দিন আর ফিরে আসে না।
লেখক: সিনিয়র আইনজীবী ও কথা সাহিত্যিক