স্বপন কুমার দেব
এই শহরে এক সময়ে কারো বাসাবাড়ীতেই ড্রয়িং রুম বলতে কিছু ছিল না এবং মানুষের মধ্যে এর ধারণাও ছিল না। অনেক বাসায় প্রবেশ মুখে কাচারী ঘর বা চল্তি ভাষায় বাংলা ঘর ছিল। বাইরের লোকজনের বসা, বৈঠকখানা ইত্যাদি কাজে লাগতো। মালিক আইনজীবী হলে চেম্বার ঘর হিসেবে ব্যবহার করা হতো। তা যে ঘরই হোক না কেন ফার্নিচার বা আসবাবপত্র ছিল যৎ সামান্য। অবশ্য পুরানো জমিদার বাড়ীগুলি ছিল কিছুটা ব্যতিক্রম। বাদবাকী সবাই গড়তালে সমান। সব বাসায়ই ভিন্ন ভিন্ন ভিটায় ভিন্ন ভিন্ন ঘর। শোবার ঘর বা বড় ঘর ছিল প্রধান। শোবার ঘরের বড় কোঠায় থাকতো একাধিক চৌকি। হয়তো বা একটি খাট। বিছানাপত্র দিনে বলা (রোল) অবস্থায় রাখা হতো। শুধু পাটি পাতা থাকতো। রাতের বেলায় বিছানা পাতা হতো। মশারী বাধ্যতামূলক। এই শোবার ঘরেই বড়জোর দু’একটি কাঠের চেয়ার ও টেবিল। বাসায় বেড়াতে আসা লোকজন কাঠের চেয়ারে এবং চৌকির একদিকে পা ঝুলিয়ে বসতেন। সে অবস্থায়ই তাদের জলখাবার পরিবেশন করা হতো। বড় কোঠার সঙ্গে হালকা পার্টিশন দেয়া পাশের ছোট কোঠা মহিলাদের জন্য বরাদ্দ ছিল। সেখানে চেয়ার টেবিল নেই। চৌকিই ভরসা। বড় ঘরের সামনের খোলা বারান্দায় দু’একটি চেয়ার ও লম্বা হেলান দেয়া কাঠের বেঞ্চি পাতা থাকতো। কাচারী ঘরেও ছিল চৌকি ও সাধারণ কাঠের চেয়ার টেবিল বেঞ্চি। রান্না ঘরে মাটির মেঝেতে পিঁড়ি পেতে কিংবা বিছানায় পাটি পেতে বসে খাওয়া দাওয়া হতো। ডাইনিং টেবিল, চেয়ার, ডাইনিং রুম বা স্পেস্ অনেক পরের কথা। একই রকম ড্রয়িং রুম ও আধুনিক সোফা সেট সহ ফার্নিচার অনেক পরের বিষয়। ছেলেমেয়েদের পড়া লেখার জন্য ছোটখাটো কাঠের চেয়ার টেবিল ও বেতের র্যাক বরাদ্দ ছিল। অনেকে চৌকিতে বা ঘরের কোনায় কানায় বসে পড়ালেখা চালিয়ে যেতো। তখনকার দিনে সেরা ফার্নিচার বোধ হয় ছিল আয়না ও ড্রয়ারযুক্ত কাঠের টেবিল ও হাতল ওয়ালা কাঠের চেয়ার। সঙ্গে কাঠের আলনা ও খাট। সাধারণত স্বচ্ছল পরিবারের বিয়েতে কনের বাপের বাড়ী থেকে এগুলি আসতো। মাঝে মাঝে যোগ হতো কাঠের আলমারী। তবে এখনকার মতো ওয়ারড্রোব নয়। সবচেয়ে কমন ফার্নিচার বলতে যা বুঝায় তা ছিল টিনের ট্রাংক বা তোরঙ্গ। বাসায় বাসায় একাধিক নানা সাইজের ট্রাংক। একটার উপর আরেকটা। কাপড় চোপড়, মূল্যবান জিনিসপত্র, অলংকার, পুরানো বইপত্র ট্রাংকের ভিতরে তালামারা অবস্থায় সাজানো থাকতো। অন্য জায়গায় বেড়াতে গেলে লাগেজ বা বাক্স পেটরা বলতে টিনের ট্রাংক ও বিভিন্ন ঝুলাঝুলিকেই বুঝাতো। চামড়ার সুটকেস তখন সবে মাত্র বাজারে ঢুকেছে। সংক্ষেপে লেদার বলতো সবাই। এটি ব্যাবহার করতেন অভিজাত শ্রেণির লোকেরা। ট্র্যাভেল ব্যাগ, ট্রলি ব্যাগ বলতে এখন যা চলছে তার কোন কনসেপ্টই তখন ছিল না। আগে ঘরে ঘরে আরো দু’একটি চালু জিনিস ছিলো। তা হলো বসার জন্য বেতের মোড়া ও কাঠের টুল। বাসায় মহিলা ও ছোটরা মোড়া অধিক ব্যবহার করতেন। চৌকির নিচ ছিল জিনিসপত্র রাখার একধরণের গুদামের মতো। হেন জিনিস নেই যা সেখানে ঠাঁই পেতো না। অধিকাংশ মানুষেরই ঘরের মেঝে ছিলো মাটির। তেমনি ভীটও ছিল মাটির। সিদ কেটে চুরির প্রচলন বোধ হয় মাটির ভিট থেকেই শুরু হয়। ফ্রীজ, টিভি স্বপ্নেরও বাইরে। সবেমাত্র রেডিও যুগের সূচনা লগ্ন ছিল। মাছ রাখার জন্য ছিল বাঁশের কঞ্চির তৈরী ‘খলই’। দিনের মাছ দিনেই কেনা ও রান্না করে খাওয়া। খাবার জল রাখার জন্য ছিল একাধিক মাটির কলস। ‘কলসি কাখে জল আনা’ বাক্যটির মূলে মাটির কলসই প্রধান। এখনকার প্রজন্মের কাছে মনে হতে পারে এত স্বল্প আর অতি সাধারণ আসবাবপত্রে মানুষের চলত কি ভাবে? মানুষের জীবন যাপন কিন্তু এই সাধারণ ভাবে ভালোই ছিল। এখনকার খুব গরিব মানুষের অবস্থা কিন্তু সেই আগের মতোই আছে। আগে মানুষ দু’রকম ভাবে ছাতা ব্যবহার করতেন। বাঁশের হাতলের আর কাঠের হাতলের ছাতা। দাম ছিল সেভাবে কম বেশি। আর বেশি গরিব ও শ্রমিক বা কামলা শ্রেণির মানুষের জন্য বৃষ্টির দিনে ছিলো বাঁশের তৈরী ‘জুঙ্গুর’ এবং বাঁশের তৈরী ‘ছাতা’। দু’টিরই ছানী সহ সব কিছু বাঁশের। ছাতা দেখতে রেড ইন্ডিয়ানয়দের বড় ‘হ্যাট’ এর মতো। আর ‘জুঙ্গুর’ ছিল মাথা ও পিঠ ঢাকা দেওয়ার জন্য এক ধরণের বিচিত্র বৃষ্টি নিবারণকারী ছাতা তুল্য জিনিস। যা ছোটদের কাছে ছিল অত্যন্ত মজার ও আকর্ষণীয়। ‘জুঙ্গুর’কে আধুনিক রেইনকোটের আদি সংস্করণ বলা যায়। যাই হোক আগের আসবাবপত্র সাধারণ হলেও মানুষ ছিল অসাধারণ। তারা আর ফিরে আসবেনা।
লেখক: সিনিয়র আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক।
- নেতাকর্মীদের কাদের উল্টাপাল্টা করলে খবর আছে
- ফেসবুকে একাউন্ট খোলাকে নিবন্ধিত মোবাইল তথ্যপুঞ্জির সাথে সংযুক্ত করুন


