স্বপন কুমার দেব
পৃথিবীর অনেক দেশেই শীতকাল নেই। এমন কি বিভিন্ন ঋতু ও নেই। শুধু গ্রীষ্মকাল। আবার অনেক দেশে কঠিন শীত। বরফের রাজ্য। মাঝে দু’তিন মাস হালকা গ্রীষ্মকাল। তারা আদর করে বলেন ‘সামার’। উপভোগের কাল। সেই হিসেবে আমরা অনেক ভাগ্যবান। আমাদের মতো ষড় ঋতুর দেশ আর কোথাও নেই। প্রতিটি ঋতুই আমরা উপভোগ করে থাকি। প্রতিটি ঋতুর আছে নিজস্ব সংস্কৃতি, আবহাওয়া, সংগীত, কবিতা ও সাহিত্য। বাঙালিদের বারো মাসে তের পার্বণ কথাটির ভিত্তি এই ষড়ঋতু। যাই হোক, ঋতু চক্রে এখন আমাদের শীত কাল চলছে। সুনামগঞ্জ সিলেট অঞ্চলে এবার শীতের তীব্রতা অনেকটাই কম। জমে উঠছে না শীতের উৎসব, আনন্দ, পিঠাপুলির ধুম। বসছে না শীতকালীন আসর। ঠান্ডা না থাকায় জম্পেশ পিঠা খাওয়ার আনন্দে ঘাটতি। শীতের দিনে শীত না হলে কি চলে ? সুনামগঞ্জের শীতের বেশ নাম ডাক ছিল বা আছে। শীত আসব আসব অবস্থা শুরু হলেই নানা পরিকল্পনা তৈরি হতো। প্রসঙ্গত; আগের দিনের শীতের কথা এসেই যায়। পুরানো দিনে শীতের আগমণ ঘটতো যথা নিয়মে। অগ্রহায়ণ মাস থেকেই আনাগোনা শুরু হয়ে যেতো। তখন থেকেই ঘাসের ডগায় জমতো শিশির বিন্দু। পৌষ ও মাঘ মাসে প্রচুর শীত। সঙ্গে মিষ্টি রোদের উত্তাপ। রোদের স্বাদ যে মিষ্টি হয় তা অন্যদেশের মানুষ বুঝবে না। শীত মানে জমিয়ে খাওয়া-দাওয়া। প্রচুর মাছ, রঙিন টাটকা কমলা আর যথেষ্ট পিঠাপুলি। তবে এখানে সবজির ঘাটতি ছিলো। বর্তমান কালে তা পূরণ হয়ে গেছে। শীত আসলেই মেঘালয়ের চেলার রঙিন কমলায় ভরে যেতো শহর। যেমন স্বাদ তেমন সাইজ। এখনকার মতো কমলার সঙ্গে ক্যানোর মিশ্রণ ছিল না। মাছের বাজার শীতের দিনে ছিল সরগরম। ছিল টাল দেয়া রুই মাছ। বোয়াল মাছের কুর বা পেটির অংশ কেটে আলাদা করে বিক্রি হতো। বাকী অংশ ফেলে দেয়ারই নিয়ম ছিলো। এখন তো ঘইন্যা মাছ খুব কম দেখা যায়। ঘইন্যা মাছ এখানকার নিজস্ব। অন্যত্র এ মাছ নেই। শীতের দিনে ঘইন্যা মাছের মুড়ি বা মন্ডু কেটে আলাদা করে মালার মতো গেঁথে বিক্রি হতো। তবে ইলিশ মাছ এখানে পাওয়া যেতো না। সব ধরণের মাছই ছিল হাওর, নদী আর খাল বিলের প্রাকৃতিক মাছ। দাম দর সস্তা। এখন তো মাছের বাজারে আকাল। তাছাড়া দামে আগুন। সবার উপরে মন খারাপের বিষয়টি হলো প্রাকৃতিক মাছ ক্রমশ: হারিয়ে যাচ্ছে। বাজার দখল করছে চাষের মাছ। এছাড়া আছে বার্মিজ ও ইন্ডিয়ান মাছ। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর অবস্থা। পিঠা পুলিরও বর্তমানে দুর্দিন চলছে। ঘরে ঘরে ¯েœহময়ী মা, বোনদের হাতের তৈরি সন্দেশ, পিঠা, পাটিসাপটা ক্রমশ: বিলুপ্তির পথে। এগুলি হটিয়ে দিচ্ছে ফাস্টফুড, পিজা, চাউমিন অদ্ভুত সব খাবার। বিভিন্ন মিষ্টির দোকানে সন্দেশ পাটিসাপটা ইত্যাদি পাওয়া গেলেও এগুলি আদি ও অকৃত্রিম নহে। তবে ভাপাপিঠা, চিতই পিঠা এগুলির চল বাড়ছে। আগের দিনে পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে এক মাস আগে থেকেই ঘরে ঘরে রাত জেগে চলতো নানাবিধ পিঠা তৈরির কার্যক্রম। সংক্রান্তি পার করে এগুলি খেয়ে শেষ করতে লেগে যেতো আরো কয়েক মাস। শীত পোষাক বলতে ছিল চাদর। এখনকারমতো রেডিমেড পোষাকের সম্ভার ছিল না। মা বোনদের হাতে শোভা পেত উল আর কাঁটা। বুনে বুনে সুয়েটার, টুপি তৈরি হতো। গায়ে দিলে অসাধারণ ওম আর মায়ের গন্ধ। রোদ উঠলে টিনের চালে লেপ মেলে দিয়ে গরম করে ভাজ করে রাখা হতো। ঘুমনোর সময় ভাজ খুলে গায়ে দিলে আটকে থাকা উষ্ণতায় মনে হতো স্বর্গ সুখ। আরামের ঘুম আপনা আপনি চোখের পাতা বুঝিয়ে দিত। নতুন গুড়ের তৈরি মুড়ির নাড়– শিশু থেকে বুড়ো সবার হাতে হাতে ঘুরতো। নাড়– বা মোয়া খেতে খেতে রোদ পোহানোর আনন্দই ছিল আলাদা। এই শহরে শীতের সকালে মিষ্টি রোদ পোহানোর একটা চর্চা বা অভ্যাস ছিল। ছোট শহর। কর্মব্যস্ততা কম। অনেকটাই অলস ছিল জীবন যাত্রা। সকাল বেলায় ছোট, বড়, অধিক বয়স্ক অনেকেই বাসার সামনের রাস্তায় বা চৌমাথায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শরীরে বিশেষ করে পিঠে মিষ্টি রোদ লাগাতেন। সঙ্গে চলতো রাজনীতি থেকে শুরু করে দেশ বিদেশের নানা খোশগল্প। রোদের তেজ বাড়লে আড্ডা ভাঙতো। তারপর কাজকর্ম অফিস আদালত ইত্যাদি। এখনকার মতো বনভোজন বা পিকনিকের ঘনঘটা ছিল না। কোথাও যাওয়া মানেই দূরযাত্রা। যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না থাকাই কারণ। সৌখিন শিকারীরা হাওরে গিয়ে বন্দুক দিয়ে পাখি মেরে নিয়ে আসতেন। এখন পরিযায়ী বা অতিথি পাখি শিকার নিষিদ্ধ। এটি অবশ্যই ভালো একটি আইন ও উদ্যোগ। পৌষ মাঘ পেরিয়ে গেলেও তখন শীত বিদায় নিতো না। যাই যাই করে চলতো আরো বেশ কিছুদিন। শীতের দিনে সুনামগঞ্জে রাতের বেলায় মাঝে মাঝে আসর বসতো বাউল গানের। তীব্র শীত উপেক্ষা করে বাউলের একতারা দোতারাতে আর উদাত্ত কন্ঠে দর্শক শ্রোতা সবাই বুঁদ হয়ে যেতেন। প্রতি বছর মেলা বসতো। রাত থেকে ভোরবেলা অব্দি মনকাড়া যাত্রাগান ছিল মেলার প্রধান আকর্ষণ। এভাবেই ক্রমশ: শীতকাল কেটে যেতো। শীতের দিনে যদি শীতই না থাকে তবে আনুষাঙ্গিক বিষয়গুলি জমে উঠে না। এবারে শীতের প্রকোপ অনেক কম। জানান দিয়ে গেল কি শীত একদিন অতীত হয়ে যাবে? আগের দিনের শীতের মাধুর্য্য কি ফিরে আসবে না?
পুনশ্চ: এই লেখা ছাপা হতে হতে শীতের প্রকোপ কিছুটা বেড়েছে। আর উন্নয়ন মেলায় বসেছে পিঠা পুলির দোকান ।
লেখক: সিনিয়র আইনজীবী-কথাসাহিত্যিক
- বিশ্বম্ভরপুর পল্লী বিদ্যুতের পরিচালক পদে নির্বাচনী প্রচারণা তুঙ্গে
- জেলায় আওয়ামী লীগের রাজনীতি- প্রকাশ্যে সমাবেশে চলছে কাদা ছুড়াছুড়ি


