আজ বিশ্ব রক্তদাতা দিবস/ জেলায় বেড়েছে স্বেচ্ছায় রক্তদাতার সংখ্যা

সোহানুর রহমান সোহান
হাওরের জেলা সুনামগঞ্জ। শিক্ষার হারে পিছিয়ে থাকা জেলার মানুষদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা খুবই কম। মফস্বল এলাকা হওয়ায় রক্তদান নিয়ে মানুষের মধ্যে খুব একটা আগ্রহ নেই। জরুরী মুহূর্তে যখন রক্তের প্রয়োজন হয় মানুষ তখন দিক বেদিক হয়ে ছোটাছুটি করে। মানুষের হাতে পায়ে ধরে কাকুতি মিনুতি করেও পাওয়া যেত না এক ব্যাগ বিশুদ্ধ রক্ত। রক্ত দেয়া নিয়ে মানুষের মনে নানান ভয়-ভীতি আর কুসংস্কার কাজ করত। এই কথাগুলো বলছিলেন, ৪৬ বছর বয়সী রক্তদাতা মজনু মিয়া। শেষ বয়সে এসে এখনো রক্ত দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এখন পর্যন্ত ৫৬ বার রক্ত দিয়েছেন তিনি। রক্ত দিতে কোন বিনিময় অথবা রক্তদানের একটি ছবিও তুলতেও তিনি আগ্রহ প্রকাশ করেননি তিনি। এখনো মানুষকে রক্তের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। মজনু মিয়া এখন সুনামগঞ্জের রক্তদাতা স্বেচ্ছাসেবীদের মডেল।
মজনু মিয়া বলেন, ১৯৯৪ সালে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের এক শিক্ষকের রক্তের জরুরি প্রয়োজন হয়। তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু রক্ত পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন সেখানে মুজাহিদুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। এক পর্যায়ে ওই শিক্ষক মারা যান। বিষয়টি সবাইকে নাড়া দেয়। এরপর সরকারি কলেজের শিক্ষক মোহাম্মদ আব্দু মিয়ার নেতৃত্বে সুনামগঞ্জে সন্ধানী ডোনার ক্লাবের কার্যক্রম শুরু হয়। সেই থেকে তিনি স্বেচ্ছায় রক্তদাতা এবং এই কাজের সংগঠক। এ পর্যন্ত ৫৬ ব্যাগ রক্ত দিয়েছেন তিনি নিজে। তাঁর পরিবারের আট ভাইবোনের সবাই স্বেচ্ছায় রক্তদাতা। সবাই মিলে মিলে এ পর্যন্ত অন্তত ৫০০ ব্যাগের মতো রক্ত দিয়েছেন বলে জানান তিনি।
মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, এক সময় আমার কাছে একটা তালিকা ছিল। রক্তের প্রয়োজন হলেই লোকজন যোগাযোগ করতেন, এখনো করেন। তবে এখন আমি বাঁধনসহ অন্যান্য সংগঠনের বন্ধুদের সহযোগিতা নিয়ে থাকি।
এখন সুনামগঞ্জের তরুণ স্বেচ্ছাসেবীদের হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছে রক্তদান। বেড়েছে সামাজিক সচেতনতা। রক্ত দিতে ও দেয়াতে এগিয়ে আসছেন সকল শ্রেণিপেশার মানুষ। তাদের এই কাজকে আরও সহজ করে দিচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে রোগী পেয়ে যাচ্ছে স্বেচ্ছাসেবীদের। স্বেচ্ছাসেবীরা সহজেই খুঁজে বের করতে পারছেন রক্তদাতা। রক্তদান নিয়ে সুনামগঞ্জে সন্ধানী, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন, বাঁধন, ব্লাডলিংক, খিদমাহ, বিশ্বজন, আলো সহ বেশ কয়েকটি সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীরা কাজ করছেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে সক্রিয় শিক্ষার্থীদের সংগঠন বাঁধন ও পেশাজীবীদের ব্লাডলিংক।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিত্তিক সংগঠন বাঁধন (স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের সংগঠন) সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ ইউনিট শুধু রক্তদান নয়, বিনামূল্যে মানুষের রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করে দিচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিনিয়ত নতুন রক্তদাতা তৈরিতে উদ্বুদ্ধ করছে মানুষকে। লেখাপড়ার পাশাপাশি প্রতিদিন মানবিক এই কাজ করে যাচ্ছেন সংগঠনের প্রায় অর্ধশতাধিক কর্মী। ২০১৭ সালে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে জন্ম হয় এই সংগঠনের। সুনামগঞ্জ সহ দেশের ৫৪ জেলার ৭৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জুড়ে তাদের বিস্তৃতি। দেশের যে কোনো প্রান্তে রক্তের প্রয়োজন হলে দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে যোগাযোগ করে রক্ত সংগ্রহ করে দেয় তারা। তবে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের কাছাকাছি হওয়ায় সুনামগঞ্জে তাদের ব্যস্ততা বেশি।
বাঁধন, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের রেজিস্ট্রার থেকে জানা যায়- ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত বাঁধন জরুরি মূহুর্তে রোগীদের কাছে বিশুদ্ধ ২ হাজার ৯৫ ব্যাগ রক্ত সরবরাহ করেছে। একই সাথে পাঁচশো ঊনপঞ্চাশ জন নতুন রক্তদাতা তৈরি করেছে। সর্বমোট ৮ হাজার ১২৯ জন মানুষকে বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করে দিয়েছে। ২০১৭ সালে যাদের মোট রক্ত সংগ্রহ পরিমাণ ছিলো ৮৩ ব্যাগ। এখন তাদের বাৎসরিক সংগ্রহ থাকে অর্ধ হাজার ব্যাগের উপরে। দিন দিন বেড়েছে রক্তের সংগ্রহ ও রক্তদাতা।
বাঁধন, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ ইউনিটের সাবেক আহবায়ক হাফিজুর রহমান লিটন বলেন, আমাদের হাসপাতাল এবং কলেজ একদম পাশাপাশি হওয়ায় জরুরী রক্তের প্রয়োজন হলেই মানুষ কলেজে ছুটে আসতো। মানুষ পাগল হয়ে যেত একব্যাগ রক্তের জন্য। সেই মানবিকতার টান থেকেই মানুষের জন্য রক্তদাতা সংগ্রহ করার কাজে লাগি আমি আমরা। তখন বছর শেষে এক থেকে দেড়শ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করে দিতে পারতাম আমরা। এখন যত দিন যাচ্ছে মানুষ সচেতন হচ্ছে। নারী-পুরুষ সকল পেশার মানুষ রক্ত দিতে এগিয়ে আসছেন। এজন্য এখন রক্তদাতার সংখ্যা বেড়েই চলছে। এখন আর রক্তের অভাবে সুনামগঞ্জে কেউ মারা যায় না।
এদিকে রক্তদানে পিছিয়ে নেই মেয়েরা। ছেলেদের সাথে পাল্লা দিয়ে রক্তদান নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন তারা। সাবিহা সুলতানা, ফারজানা আক্তার, ফাতেমা তুজ জুহরা, নুরজাহান বেগম নুরীর মতো মেয়েরা সুনামগঞ্জের প্রত্যেকটি সংগঠনে সক্রিয় ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। কয়েকবছর ধরে রক্তদানে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের সম্মান বিভাগের শিক্ষার্থী ফারজানা আক্তার। ২০২২ সালে এক বছরে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন রক্তদাতার মাধ্যমে ২৪৩ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করে মুমূর্ষু রোগীর কাছে পৌঁছে দিয়েছে ফারজানা।
শিক্ষার্থী ফারজানা আক্তার বলেন, রক্তের প্রয়োজনে অনেকেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ফারজানা বলেন, একজন মানুষকে যখন আপনি রক্ত দেবেন বা তাঁর জন্য রক্ত সংগ্রহ করে দেবেন তখন কী যে ভালো লাগে সেটি বলে বোঝানো যাবে না। আর রক্ত দিতে তো কোনো ক্ষতি নেই। আপনার রক্তে অন্য একজনের প্রাণ বাঁচছে এটি ভাবতেই ভালো লাগে।
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের সম্মান দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তাজিন হক এ পর্যন্ত সাতবার রক্ত দিয়েছেন। তাজিন বলেন, আমার বড় আপু ফারিন হকও জরুরি প্রয়োজনে রোগীদের স্বেচ্ছায় রক্ত দিতেন। তাঁকে দেখেই স্বেচ্ছায় রক্তদানে অনুপ্রাণিত হয়েছি।
সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতলে কোনো ব্লাড ব্যাংক নেই। তবে রক্ত পরিসঞ্চালনের ব্যবস্থা আছে। বছরে এখানে ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ ব্যাগ রক্ত পরিসঞ্চালন করা হয়।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, যে কোনো সুস্থ ব্যক্তি প্রতি তিনমাস পর পর প্রয়োজনে রক্ত দিতে পারে। এতে কোনো সমস্যা নেই। এক সময় বিষয়টি সম্পর্কে মানুষ সচেতন ছিলেন না। এখন মানুষ সচেতন, নানাভাবে কাজ হচ্ছে। তাই সুনামগঞ্জে স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের সংখ্যা বেড়েছে।