স্টাফ রিপোর্টার
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্গীতায় বলেছেন-‘অজোহপি সন্নব্যয়াত্মা ভূতানামীশ্বরো’পি সন্/প্রকৃতিম্ স্বামধিষ্ঠায় সম্ভবাম্যাত্মমায়য়া’। অর্থাৎ যদিও আমি জন্মরহিত এবং আমার চিন্ময় দেহ অব্যয় এবং যদিও আমি সর্বভূতের ঈশ্বর, তবুও আমার অন্তঙ্গা শক্তিকে আশ্রয় করে আমি আমার চিন্ময় রূপে যুগে যুগে অবতীর্ণ হই।
জন্মরহিত ও চিরন্তন হলেও, পরমেশ্বর ভগবান তাঁর স্বতন্ত্র ইচ্ছা এবং অপার করুণার দ্বারা, ধার্মিকদের উদ্ধার এবং পাপীদের ধ্বংস করার জন্য অবতীর্ণ হন। শ্রীকৃষ্ণ পাঁচ হাজার বছর পূর্বে মথুরায় দেবকী ও বসুদেবের অষ্টম সন্তান হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তাঁর আবির্ভাব বিশ্বের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করে। নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষকে রক্ষায় তিনি পরিত্রাতার ভূমিকা পালন করেন, অন্ধকার সরিয়ে পৃথিবীকে আলোয় উদ্ভাসিত করেন।
সনাতন হিন্দু সম্প্রদায়ের আরাধ্য ভগবান শ্রী কৃষ্ণের শুভ জন্মাষ্টমী আজ। প্রতি বছরই ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দ উৎসবের মধ্য দিয়ে জন্মাষ্টমী পালিত হয়। এবারও জন্মাষ্টমী অনুষ্ঠান যথারীতি ধর্মীয় রীতি অনুসরণ করে পূজা-অর্চনার মাধ্যমে পালিত হবে। তবে জন্মাষ্টমী সংশ্লিষ্ট সকল অনুষ্ঠানমালা মন্দিরাঙ্গনে সীমাবদ্ধ থাকবে। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে সকল প্রকার সমাবেশ, শোভাযাত্রা করা থেকে বিরত থাকারও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
সনাতন ধর্মে বার মাসে তের পার্বণ। এই বহুবিধ ধর্মানুষ্ঠানের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব তিথি তথা জন্মাষ্টমী অনুষ্ঠান অন্যতম। ধর্মানুষ্ঠানের এই বৈচিত্র্য ধারা সেই এক ঈশ্বরের লীলাবিলাস। অর্থাৎ বহুভাবে সেই এক ঈশ্বরকে জানার প্রক্রিয়া। একং ‘সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তিÍ’ অর্থাৎ সেই এক সদ্বস্তুকে গুণীজন বহুভাবে জানেন। কাজেই ঈশ্বরের একত্বকে কোনোভাবে খর্ব করা যায় না। ঈশ্বর সর্বশক্তিমান, পরম দয়ালু ও অঘটন-ঘটন-পটীয়স। অর্থাৎ সবকিছুই ঈশ্বরগ্রাহ্য। মানুষের পক্ষে যা সম্ভব নয় তাঁর পক্ষে তা অনায়াসসাধ্য এবং ইচ্ছাপ্রসূত। ঈশ্বরের সঙ্গে নৈকট্য স্থাপনে ভক্ত ও ভগবানের মধ্যে পরম আত্মীয় জ্ঞানে সম্পর্ক এক সহজতর পন্থা সনাতন ধর্মে। এ হলো ভক্তি-প্রেম। যুগে যুগে ভগবান নররূপ ধারণ করে ভক্তের কল্যাণে আবির্ভূত হন সকল বৈরিতা ও তমসা অপসারণ ও ভক্তিরসে আপ্লুত করতে।
শাস্ত্রে আছে, ‘সাধকানাং হিতার্থায় ব্রহ্মণো রূপ কল্পনা’ সাধকের কল্যাণের জন্য তিনি রূপ ধারণ করে জগতে আসেন। এই ভাবনার সমর্থনে কবি নজরুল বলেছেন, ‘তুমি বহুরূপী তুমি রূপহীন, তব লীলা হেরি অন্তবিহীন।’ ধরাধামে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নররূপে আবির্ভাব ওই একই উদ্দেশ্যে ঘটেছে। আবার ভাগবতে আছে-‘অনুগ্রহায় ভূতানাং মানুষং দেহমাস্থিতঃ।/ ভজতে তাদৃশীক্রীড়া যাঃ শ্রুত্বা তৎপরো ভবেৎ’। অর্থাৎ ভক্তের প্রতি অনুগ্রহবশত মনুষ্য দেহ ধারণ করে মানুষের মত আচরণ করে মানবকুলকে আকৃষ্ট করেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন-
‘যদা সদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।/অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্। অর্থাৎ যখন ধর্মের গ্লানি এবং অধর্মের প্রাদুর্ভাব ঘটে তখন ধর্ম রক্ষার্থে আমি নিজেকে সৃজন করি। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্ম বা আবির্ভাব এ অবস্থার ফলশ্রুতি। এ জন্ম আত্মমায়া অবলম্বনে। কাজেই একে অপ্রাকৃত বলা হয়।
লক্ষণীয়, শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবকালটি ছিল খুবই গ্লানিযুক্ত, ধর্মের জন্য অবমাননাকর; প্রজাপীড়নে মত্ত অত্যাচারী নৃপতিরা মুনি-ঋষিদের ধর্ম অনুশীলনে তখন বিঘœ সৃষ্টি করে মানব জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল। ধরিত্রীমাতা আর এই পাপাচার সহ্য করতে না পেরে এর প্রতিবিধানকল্পে দ্বারস্থ হলেন ব্রহ্মসত্তায় সত্তাম্বিত সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার কাছে। ভগবান বিষ্ণু শ্রীকৃষ্ণ নামে অবতাররূপে মানবকল্যাণে আবির্ভূত হবেন জানতে পেরে ধরিত্রীমাতা আশ্বস্ত হলেন। এ শুভ মুহূর্তে চরিতার্থ করতে ভগবানের লীলাসহায়রূপে সকল দেব-দেবতা মথুরা-বৃন্দাবনে জন্মগ্রহণ করতে লাগলেন। সে সময় মথুরা নগরীতে যদুবংশীয় রাজা উগ্রসন রাজত্ব করতেন। তারই পুত্র কংস ছিলেন অতি বলবান ও খল প্রকৃতির। আবার মগধের পাপাসক্ত রাজা জরাসন্ধ অতি অত্যাচারী ছিলেন। উগ্রসনের এক ভ্রাতার নাম দেবক। দেবকের কন্যা দেবকী। ইনিই পরবর্তিকালে শ্রীকৃষ্ণের জননী।
আজ এই পুণ্য দিনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নিকট প্রার্থনা জানাই, তিনি যেন বিশ্বের আপামর জনসাধারণকে সুখে-শান্তিতে ও আনন্দে রাখেন।


