আজ ২২ শে শ্রাবণ- আন্দোলন-সংগ্রামে অনির্বাণ শিখা হয়ে জ্বলছেন রবীন্দ্রনাথ

সু.খবর ডেস্ক
‘তখন কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি।/সকল খেলায় করব খেলা এই আমি আহা/নতুন নামে ডাকবে মোরে,/বাঁধবে নতুন বাহুর ডোরে/আসব যাব চিরদিনের সেই আমি।’ শাশ্বত সত্য হয়ে উঠেছে কবিগুরুর নিজের লেখা কবিতাই প্রতিদিন নব নব রূপে ফিরে আসেন তিনি চিরায়ত বাংলায়-চিরায়ত বাঙালির জীবনে। চলে যাওয়ার ৭৬ বছর পরও রবীন্দ্রনাথ অনির্বাণ শিখা হয়ে জ্বলছেন বাঙালির সংগ্রামে-আন্দোলনে, সাংস্কৃতিক জীবনযাপনে। কালের পরিক্রমায় আজ আবারও ফিরে এসেছে সেই বাইশে শ্রাবণ যেদিন পুরো বাঙালি জাতিকে কাঁদিয়ে বিদায় নিয়েছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের এই দিনে কলকাতার জোড়াসাঁকোর   
 ঠাকুরবাড়িতে ৮০ বছর বয়সে মৃত্যু ঘটে তাঁর। তার বহুমাত্রিক প্রতিভা সমৃদ্ধ করেছে বাংলাদেশের সাহিত্য ও শিল্পের প্রায় সবক’টি শাখাকে। মুক্তিযুদ্ধসহ প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে তার সাহিত্য-সঙ্গীত। তার রচিত ‘আমার সোনার বাংলা’ এ দেশের জাতীয় সঙ্গীত। ‘জাতীয়তাবোধে অনুপ্রাণিত হয়ে বাঙালি যেদিন থেকে মুক্তির আন্দোলন শুরু করেছে, সেদিন থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই হয়ে উঠেছেন আমাদের নিরন্তর প্রেরণার উৎস। বিশ্বের নানা প্রান্তে অসহিষ্ণুতা, ধর্মীয় মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা যখন বিভাজনের বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে, তখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষা-চিন্তা হতে পারে আলোকবর্তিকা।’
আজ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৭৬তম মৃত্যুবার্ষিকী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাধারে কবি, উপন্যাসিক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক, ভাষাবিদ, চিত্রশিল্পী-গল্পকার। আট বছর বয়সে তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন। ১৮৭৪ সালে ‘তত্ববোধিনী পত্রিকা’য় তার প্রথম লেখা কবিতা ‘অভিলাষ’ প্রকাশিত হয়। অসাধারণ সৃষ্টিশীল লেখক ও সাহিত্যিক হিসেবে সমসাময়িক বিশ্বে তিনি খ্যাতিলাভ করেন। লিখেছেন বাংলা ও ইংরেজী ভাষায়। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় তার সাহিত্যকর্ম অনূদিত হয়েছে। বিভিন্ন দেশের পাঠ্যসূচিতে তার লেখা সংযোজিত হয়েছে। ১৮৭৮ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কবিকাহিনী ’প্রকাশিত হয়। এ সময় থেকেই কবির বিভিন্ন ঘরানার লেখা দেশ-বিদেশে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ পেতে থাকে। ১৯১০ সালে প্রকাশিত হয় তার ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থ। এই কাব্যগ্রন্থের ইংরেজী অনুবাদের জন্য তিনি ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
লেখালেখির পাশাপাশি তিনি ১৯০১ সালে পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর থেকে তিনি সেখানেই বসবাস শুরু করেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ১৯২১ সালে গ্রামোন্নয়নের জন্য ‘শ্রীনিকেতন’ নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিশ্বভারতী’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৯১ সাল থেকে পিতার আদেশে কুষ্টিয়ার শিল্াইদহে, পাবনা, নাটোরে এবং উড়িষ্যায় জমিদারীগুলো তদারকি শুরু করেন কবি। শিলাইদহে তিনি দীর্ঘদিন অতিবাহিত করেন। এখানে জমিদার বাড়িতে তিনি অসংখ্য কবিতা ও গান রচনা করেন। ১৯০১ সালে শিলাইদহ থেকে সপরিবারে কবি বোলপুরে শান্তিনিকেতনে চলে যান। তিনি জীবনে বারো বার বিশ্বভ্রমন করেন। ১৮৭৮ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত পাঁচটি মহাদেশের ত্রিশটিরও বেশি দেশ ভ্রমন করেন।
কবির ওপর প্রকাশিত বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে জানা যায়, রবীন্দ্রনাখ ঠাকুর মূলত কবি। তার মৌলিক কাব্যগ্রন্থ ২৫টি। তবে বাঙালি সমাজে তার জনপ্রিয়তা রয়েছে সংগীতেও। তিনি দুই হাজার গান রচনা করেন। অধিকাংশ গানে সুরারোপ করেন। তার সমগ্র গান ‘গীতবিতান’ গ্রন্থে রয়েছে। কবির লেখা ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ গানটি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। ভারতের জাতীয় সংগীতটিও কবির লেখা। জীবিতকালে তার প্রকাশিত মৌলিক কবিতাগ্রন্থ হচ্ছে ৫২টি, উপন্যাস ১৩, ছোটগল্প’র বই ৯৫টি, প্রবন্ধ ও গদ্যগ্রন্থ ৩৬টি, নাটকের বই ৩৮টি। কবির মৃত্যুর পর ৩৬ খ-ে ‘রবীন্দ্র রচনাবলী ’ প্রকাশ পায়। এ ছাড়া ১৯ খ-ের রয়েছে ‘রবীন্দ্র চিঠিপত্র।’ ১৯২৮ থেকে ১৯৩৯ পর্যন্ত কবির আঁকা চিত্রকর্ম’র সংখ্যা আড়াই হাজারেরও বেশি। এর মধ্যে ১৫৭৪টি চিত্রকর্ম শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবনে সংরক্ষিত আছে। কবির প্রথম চিত্র প্রদর্শনী দক্ষিণ ফ্রান্সের শিল্পীদের উদ্যোগে ১৯২৬ সালে প্যারিসের পিগাল আর্ট গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হয়।
রবীন্দ্রনাথের ঠাকুরের কবিতা ও গানের বাণীসহ সৃষ্টিকর্মের মূলসুর হচ্ছে ভাবগভীরতা, গীতিধর্মিতা, চিত্রররূপময়তা, আত্মচেতনা, ঐতিহ্যপ্রীতি, প্রকৃতিপ্রেম, মানবপ্রেম, স্বদেশপ্রেম, রোমান্টিক, সৌন্দর্যচেতনা, বিশ্বপ্রেম, জীবনদেবতা। রয়েছে ভাব, ভাষা, ছন্দ ও আঙ্গিকের বৈচিত্র্য, বাস্তবচেতনা ও প্রগতিচেতনা। তার গদ্যভাষাও কাব্যিক। তার রচনাসমগ্রে রয়েছে, বাঙালির জীবনবোধ ও ঐতিহ্য সাধনার কালপ্রবাহ। ভারতীয় উপমহাদেশের ধ্রুপদি ও লৌকিক সংস্কৃতি এবং পাশ্চাত্য বিজ্ঞানচেতনা ও শিল্পদর্শন তার রচনায় গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে। কথাসাহিত্য ও প্রবন্ধগুলোতে রয়েছে সমাজ, রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে নিজস্ব মতামত ও মানুষের আকাংখার প্রতিফলন। প্রগতিশীল, শিক্ষিত দেশ ও জাতি এবং বিশ্ব গঠনের বাণীও অধিকাংশ কর্মে পরিস্ফূট হয়েছে। এসব কারণে কবির জন্মের পর দেড় শতাধিক বছর অতিক্রান্ত হলেও তার সৃষ্টিকর্ম দেশ-বিদেশে আজও সমধিক সমাদৃত রয়েছে বলে রবীন্দ্র গবেষকরা বিভিন্ন পুস্তকে মতামত রেখেছেন।