পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আফছর উদ্দিনকে জেলা থেকে প্রত্যাহার করাকে জেলার বিশিষ্টজনরা স্রেফ আইওয়াশ হিসেবে বিবেচনা করছেন। আমাদের প্রশাসনের জাতীয় চরিত্র এবং এবংবিধ নানা অভিজ্ঞতা মানুষকে এরকম ভাবতে সহায়তা করছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু বিষয়টিকে কি আমরা এরকম ভাবেই বিবেচনা করব? সবচাইতে বড় কথা হলো এবারের বিশাল হাওর দুর্নীতির প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা ইতোমধ্যে তিন সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটিও গঠন করেছেন। দুদকের এই পদক্ষেপটি সবিশেষ প্রণিধানযোগ্য। প্রশাসনের একটি সাধারণ নিয়ম হলো কারও বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তাকে অকুস্থল থেকে সরিয়ে নেয়া হয় সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে। নির্বাহী প্রকৌশলী আফছার উদ্দিনকে প্রত্যাহার করার বিষয়টিকে বরং আপাতত আমরা ওই দৃষ্টিকোণ থেকেই গ্রহণ করতে চাই। নতুবা একটি উদ্যোগকে প্রথমেই সন্দেহের চোখে দেখাটা সংশ্লিষ্টদের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।
তবে আফছর উদ্দিনকে প্রত্যাহার করাটা পাউবোর একটি মামুলি পদক্ষেপ, একথা বলতেই হবে। কারণ তিনি যে কথিত বিশাল দুর্নীতির একেবারে মূল অংশীজন সেই বিষয়টি প্রমাণিত হয়ে গেছে। স্বয়ং দুদক গত দুই বছরে ২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ হওয়ার কথা বলেছে। এরকম অবস্থায় তাকে প্রত্যাহারের পরিবর্তে সাময়িক বরখাস্থ করাটাই পাউবোর সমীচীন কাজ হতো। এটি তারা করেন নি। এই না করা থেকে তাদের স্বজন পালনের বিষয়টি সকলের সামনে চলে এসেছে। জনগণ বলে থাকেন বাঁধ দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত টাকার অংশ বিশেষ নানা স্থানে বণ্টন হতে হতে উঁচু পর্যায়েও যায়। মানুষ মনে করেন আফছার উদ্দিনের আপাত রেহাই পাওয়ার বিষয়টি ওই ভাগ-বণ্টকের প্রতিদান মাত্র। সত্যিই যদি আফছর উদ্দিন অথবা তাদের সিলেটস্থ প্রধান প্রকৌশলী, এসওগণ এবং অতিঅবশ্যই রাঘব-বোয়াল খ্যাত ঠিকাদার ও চুনোপুঁটি পিআইসিরা দুর্নীতির বিশাল দায় থেকে রেহাই পেয়ে যান তাহলে সেটি দেশের দুর্নীতিনিরোধী কাঠামোটিকেই ভেঙ্গে দিবে। সরকার ও দুদক কি এটি হতে দিবে? দেখার বিষয় বটে।
স্থানীয় আইনজীবীরা এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আইনজীবী সমিতি নিশ্চয়ই শীঘ্রই জনস্বার্থে এরকম মামলা করে সকলের প্রশংসাভাজন হবেন। তাঁরা যদি এরকম মামলা করেন অন্যদিকে দুদকের অনুসন্ধানও যদি নিরপেক্ষ হয় তাহলে এবার তাদের পার পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফসল হারিয়ে জেলার ২৫ লক্ষ কৃষক এখন দুর্নীতিবাজদের বিচারের দিকে তাকিয়ে আছে। যদি সঠিক বিচার হয় তাহলে ফসল হারানোর তীব্র যন্ত্রণার মাঝেও তাঁরা সামান্য স্বস্তি পেতে পারেন। এক্ষেত্রে দুদক ও সরকারকে দুর্নীতিবাজদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাকে উপেক্ষা করার মতো সক্ষমতা দেখাতে হবে। এখানে দুর্নীতিবাজদের নানা পক্ষ সর্বশক্তি দিয়ে তদন্তকে বেপথু করতে চাইবে, বাধাগ্রস্ত করতে চাইবে। এদের টাকা ও প্রভাবের কোন কমতি নেই। রয়েছে রাজনৈতিক ছত্রছায়া। এর সবই তারা নিজেদের রক্ষায় নিয়োজিত করবে। এত শক্তিশালী বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে দুদক যদি সুষ্ঠু তদন্ত করতে পারে তাহলে তাঁরা জেলাবাসীর আস্থাধন্য হতে পারবেন। দুদকের সাম্প্রতিক কিছু কর্মকা- আমাদেরকে আশান্বিত করে।
আফছর উদ্দিন নামের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক ভয়ালদর্শন দুর্নীতিবাজের চেহারার আড়ালে অন্য দুর্নীতিবাজরা যাতে হারিয়ে না যায় সেটি সমান গুরুত্বপূর্ণ। দেশকে যে বা যারা দুর্নীতির মৃগয়াক্ষেত্রে পরিণত করতে চায় তাদের চিনে রাখতে হবে মানুষকে। এদের বিষদাঁত ভাঙার কাজ করতে হবে রাষ্ট্রকে। প্রতিনিয়ত দুর্নীতির কারণে আমাদের দেশটি বিধ্বস্থ হচ্ছে। দেশটিকে বাঁচাতে হবে, নিয়ে যেতে হবে সামনের দিকে। এইটিই আসল কথা।

