আব্বারে শেষ দেহা দেখবার লাইগা দেও

ট্রলারডুবিতে ধর্মপাশা উপজেলার ইনাতনগর গ্রামে ভাতিজার লাশের সামনে ফুফুর আহাজারি

এনামুল হক, ইনাতনগর থেকে ফিরে
নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার গুমাই নদীতে ট্রলার ডুবিতে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার মধ্যনগর ইউনিয়নের ইনাতনগর গ্রামের ৭ জনসহ ১০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১জন পুরুষ, ৪ জন নারী ও ৫জন শিশু। বুধবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে এ দূর্ঘটনা ঘটে। ট্রলারডুবিতে এখনো ১৫/১৬ জন নিখোঁজ রয়েছে। নিহতরা হলেন, ইনতানগর গ্রামের ওয়াহাব মিয়ার স্ত্রী লুৎফুন্নাহার (২৬), ছেলে রাকিবুল হাসান (৩), একই গ্রামের হাবিকুল মিয়ার স্ত্রী লাকী আক্তার (৩০), মেয়ে টুম্পা আক্তার (৭), ছেলে জাহিদ হাসান (২), একই গ্রামের আব্দুল ছায়েদের স্ত্রী মাজিদা আক্তার জাবেদা (৫৫), তাঁর নাতী অনিক আহমেদ (৬), ধর্মপাশা উপজেলার পাইকুরাটি ইউনিয়নের জামালপুর গ্রামের আব্দুল করিমের ছেলে সুলতান, জুবায়ের হোসেনের ছেলে মোজাহিদ (৫)
ও নেত্রকোনার সদর উপজেলার মেদনী গ্রামের হামিদা আক্তার (৫০)।
মধ্যনগর থেকে ট্রলারের যাত্রা শুরু ঃ
ধর্মপাশা উপজেলার মধ্যনগর বাজার ঘাট থেকে ওইদিন সকাল ৭টা ২০ মিনিটে একটি যাত্রীবাহী ট্রলার ৩৫/৪০ জন যাত্রী নিয়ে নেত্রকোনার ঠাকুরাকোনার দিকে রওয়ানা দেয়। ট্রলারটি পথিমথ্যে যাত্রী উঠানামা করে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে কলমাকান্দা উপজেলার বড়কাপন ইউনিয়নের রাজনগর গ্রামের সামনে গুমাই নদীতে গেলে বিপরীত দিক আসা একটি বাল্কহেড নৌকার সাথে যাত্রীবাহী ট্রলারটির সংঘর্ষ হলে সাথে সাথে ট্রলারটি ডুবে যায়।
ইনাতনগর গ্রামে শোকের মাতম ঃ
ট্রলার ডুবিতে নিহতদের মধ্যে ৩ জন নারী ও ৪ জন শিশু মধ্যনগর ইউনিয়নের ইনতানগর গ্রামের বাসিন্দা। নিহত ৩ জন নারীই শিশুদের নিয়ে আত্মীয়র বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছিলেন। ঘটনার পর তাদের লাশ উদ্ধার করে গ্রামে নিয়ে গেলে গ্রামসহ পুরো এলাকা শোকে ভারী হয়ে উঠে। নিহতের স্বজনদের আহাজারিতে স্তব্ধ হয়ে গেছে পুরো ইনাতনগর।
নানীর বাড়ি বেড়াতে এসে লাশ হলো অনিক ঃ
নিহত অনিক আহমেদ জনির (৬) বাবা মা দুজনেই ঢাকায় গার্মেন্টসে চাকরী করে। বাবা মায়ের চেয়ে নানীর কাছেই থাকতে পছন্দ করে অনিক। তাই গত কয়েকদিন আগে ইনাতনগর গ্রামে নানীর বাড়ি বেড়াতে এসেছিল সে। ওইদিন সকালে নানীর সাথে ওই ট্রলারে করে খালার বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছিল সে। তার মৃত্যুর খবর পেয়ে বাবা মা ঢাকা থেকে রওয়ানা দিলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ইনাতনগর এসে পৌঁছাতে পারেনি।
স্ত্রী সন্তানকে বাঁচাতে পারেননি ওয়াহাব ঃ
স্ত্রী সন্তানকে বাঁচাতে না পারার যন্ত্রণায় পাগল প্রায় ওয়াহাব মিয়া। স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে পার্শ্ববর্তী ধুবাওলা গ্রামের যাচ্ছিলেন ওয়াহাব মিয়া। ট্রলারডুবির সময় স্ত্রী সন্তানকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারেননি। স্ত্রী ও ছেলে লাশ উদ্ধার হলেও নিখোঁজ রয়েছে ৫ বছর বয়সী মেয়ে মনিরা আক্তার। মনিরাকে বুকের মাঝে শক্ত করে ধরেছিলেন তিনি। কিন্তু তীব্র ¯্রােতে মনিরা তার হাত ছাড়া হয়ে যায়।
বাবা আসার আগে মা ও ভাই-বোনের দাফন নয় ঃ
ইতানগর গ্রামের রিতা আক্তারে মা লাকি আক্তার রিতার খালার বাড়িতে ওই ট্রলারে করে যাচ্ছিলেন। সাথে রিতার এক বোন ও দুই ভাইও ছিল। ভাগ্যক্রমে তৌফিক নামের ভাইটি বেঁচে গেলেও প্রাণ হারিয়েছে মা এবং এক ভাই ও এক বোন। রিতার বাবা চট্টগ্রামে কাজ করেন। মৃত্যুর খবর শুনে তিনি সেখান থেকে রওয়ানা দিলেও বৃহস্পতিবার সকালের আগে ইনাতনগর গ্রামে পৌঁছাতে পারবেন না। মেয়ে রিতা আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে উঠে, ‘আব্বা আওনের আগে মাডি (দাফন) দেওন যাইতোনা। আব্বারে শেষ দেহা দেখবার লাইগা দেও।’
নিহতের স্বজনদের পাশে জেলা প্রশাসন ঃ
এদিকে বুধবার বিকেলে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে প্রত্যেক নিহতের স্বজনদের ২০ হাজার করে ও নেত্রকোনা জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে
১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে।
হাল্কহেড নৌকা চলাচল বন্ধের দাবি এলাকাবাসী ঃ
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক ওইদিন বিকেলে ইনাতনগর গ্রামে অর্থ সহায়তা দিতে এলে স্থানীয় এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে মধ্যনগর নৌপথে বাল্কহেড নৌকা চলাচল বন্ধের জন্য দাবি জানানো হয়। জেলা প্রশাসক জানান, এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রত্যেক যাত্রীবাহী ট্রলারে লাইফ জ্যাকেট রাখার ব্যবস্থা করার জন্য নির্দেশ দেন।