‘আমরার হক্কলের পুরান বাড়ি নদী খাইয়ালাইছে’

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
‘নদীর এক পার ভাঙ্গে তো আরেক পার গড়ে, এই তো তার খেলা।’ ¯্রােতস্বীনি সুরমার এমন আগ্রাসী খেলায় দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে জামালগঞ্জের বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষের। প্রলঙ্করী ভাঙ্গনে সর্বস্ব হারিয়েছেন তারা। বাপ-দাদার পুরোনো ভিট বেশ আগেই নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে তাদের। নদীর ভয়াতুর আগ্রাসনে ধসে পড়েছে অনেক সাজানো বাড়ি। কয়েক দফা বাড়ি বাঁধার পরও নদী ভাঙ্গনের ভয়ংকর তা-ব থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না তারা। নদীর কড়াল গ্রাসে ভিটেমাটি হারিয়ে পথে বসেছে অসংখ্য পরিবার। সর্বশেষ টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতাকালীন বর্তমান সরকারের উন্নয়ন অগ্রগতিতে দেশ এগিয়ে গেলেও ভাঙ্গন রোধ করার মতো কেউ এগিয়ে আসেননি বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
জানা যায়, যুগ যুগ ধরে এই আগ্রাসী নদীর সাথে যুদ্ধ করে আসছে সাচনা বাজার ইউনিয়নের নূরপুর ও সাচনা বাজার, জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের সোনাপুর, চাঁনপুর ও মমিনপুর, ফেনারবাঁক ইউনিয়নের গজারিয়া, রামপুর ও আমানীপুর (বর্মণ পাড়া) সহ উপজেলার ১০-১২টি গ্রামের মানুষ। দিন দিন সংশ্লিষ্টদের আশ্বাস-প্রশ্বাস শানিত হলেও ভুক্তভোগীদের ভোগান্তি দূর করতে গ্রহণ করা হয়নি কোন কার্যকরী পদক্ষেপ। এ নিয়ে ক্ষোভ ঝাড়ছেন ভাঙ্গনের বলি কয়েক গ্রামের মানুষ।
ভাঙ্গনের শিকার সাচনা বাজার ইউনিয়নের নূরপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। নদীর তীর ঘেঁষে দোদুল্যমান অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে বেশকয়েকটি বসতভিটা ও বাড়ি। নূরপুর জামে মসজিদ বিল্ডিংয়ের অর্ধেক নদীতে চলে যাওয়ায় সেটি এখন পরিত্যাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। সর্বনাশা সুরমার পানি নামাজের পুরোনো এই স্থাপনাটির নি¤œাংশের মাটি খোদাই করে গ্রাস করে ফেলেছে। তার পাশে দাঁড়ালে ফুলেফেঁপে ওঠা পানির ধাক্কায় ঐ বিল্ডিংটির কাঁপুনি টের পাওয়া যায়। যেকোন সময় ধসে পড়তে পারে মসজিদসহ ঐ গ্রামের অনেকটি বাড়ি-ঘর। গ্রাম ঘুরে নদী ভাঙ্গনের এমন দুর্বিষহ চিত্রই চোখে পড়েছে।
অপরদিকে নদী ভাঙ্গন সরজমিনে দেখতে জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের চাঁনপুর ও সোনাপুর গ্রামে গেলে ভুক্তভোগী মানুষেরা নিজেদের নদীখেকো অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এই প্রতিবেদকের কাছে। বন্যায় নদী ও চারপাশ পানিতে পরিপূর্ণ থাকায় ভাঙ্গনের তীব্রতা দেখা না গেলেও ভুক্তভোগীদের কথায় ভাঙ্গন কতটা ভয়ংকর তা আঁচ করা গেছে। এমনকি নিজেদের বাপ-দাদার ভিটে হারিয়ে নদী ত্রাসের শিকার মানুষেরা কোথায় কিভাবে কতটা কষ্টে আছেন সেই পীড়িত কথাই উঠে আসে তাদের জবানিতে।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, ফেনারবাঁক ইউনিয়নের আমানীপুর (বর্মণ পাড়া) গ্রামটি পুরোটাই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বর্মণ সম্প্রদায় অধ্যুষিত এই গ্রামটিতে অবশিষ্ট বলতে কিছু নেই। ভিটেমাটি হারা ঐ পরিবারগুলো স্থানান্তরিত হয়ে বর্তমানে পার্শ্ববর্তী নতুন একটি গ্রামে (করুণাপুর) মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছে। বছর দুয়েক আগে তাদেরকে সরকারিভাবে কোনরকম ভিট জাগিয়ে দাঁড়ানোর জায়গা করে দেওয়া হলেও দেওয়া হয়নি ঘর বাঁধাসহ আনুষাঙ্গিক কোন সুবিধা। নিজের খরচে সেখানে নামমাত্র ঘর তুলে জীবন ধারণ করে আসছে মাছ শিকারী ২৭টি পরিবার। এর মধ্যে ১০টি পরিবার আছে যারা কর্মসংস্থানের খোঁজে বাড়ি ফেলে শহরে চলে গেছে। আর বাকি পরিবারগুলো মাছ মেরে ও বিক্রি করে প্রচ-ে কষ্টে জীবনধারণ করছে এখানে। তারা ভাঙ্গনের তাড়া খেয়ে নতুন জায়গায় আবাস গড়লেও সেখানেও আছে পানির সাথে যুদ্ধ করার চ্যালেঞ্জ। প্রতি বছরই ডুবে যায় তাদের ভিটেমাটি। ফলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় বলে জানিয়েছেন এখানকার মানুষ।
করুণাপুর গ্রামের জয়মোহন বর্মণ জানিয়েছেন, ‘আমানীপুর সারা গ্রামডাই নদীতে ভাইঙ্গা গেছে। একটা গাছই শুধু আছে। এছাড়া আর কিছু নাই। আমরা এখন করুণাপুর আছি। দুই বছর আগে সরকার থাইক্যা কিছু মাটি ফালাইয়া আমরারে খাড়াইবার জায়গাটা শুধু কইরা দেওয়া হইছে। নিজের টেয়ায় ঘর বাইন্দা এইখানে বাস করতাছি। একটু বেশি পানি হইলেই বাড়িত পানি উইঠ্যা যায়। বর্তমানে আমরা স্কুল বাড়িতে আছি। বাড়িঘর নীচু হওয়ায় পানি উইঠ্যা গেছে।’
নূরপুর গ্রামের মধ্যবয়সী রেজয়ান আহমদ আলম জানিয়েছেন, ‘নদী ভাঙ্গন দেখতে দেখতেই বড় হয়েছি। ছোটবেলায় একবার আব্বাকে দেখেছি বিলীন হওয়া বাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিতে। বোঝ হওয়ার পর থেকে আমি নিজেও ভাঙ্গনের শিকার হয়ে দুইবার বাড়ি বানিয়েছি। ছোট সময়ে দেখা বাড়িঘর যেখানে ছিল সেটা এখন পূর্ণাঙ্গ নদী। অন্ততঃ ৩শ’ হাত ভেঙ্গে বর্তমানে এ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘নদীর কবলে পড়ে বাড়ি তৈরি করতে করতেই আমাদের জীবন পানি হয়ে যাচ্ছে। এদিকে বাড়ি যাচ্ছে নদীতে, অন্যদিকে আবাদী জমি হচ্ছে বাড়ি। দেশে উন্নয়নের জোয়ার বইলেও আমরা নদীগর্ভে বিলীন হতে হতেই শেষ। নজির হোসেন থেকে সোহেল সাব, বর্তমানে রতন এমপি সবাই আশ্বাস-প্রশ্বাসই শুধু দিয়ে গেছেন। আর আমরা শুধু শুনেই যাচ্ছি। বাস্তবে কিছুই হচ্ছে না।’
নূরপুর জামে মসজিদের মোতোয়ালি মো. রইছ মিয়া চৌধুরী ভাঙ্গনকৃত নামাজের স্থানটি দেখিয়ে বলেন, ‘এই বিল্ডিংয়ের প্রায় অর্ধেকটাই পানিতে। পার গর্ত হইয়া বিল্ডিংয়ের ভেতরে পানি খেলতাছে। যেকোন সময় ভাইঙ্গা পইড়া যাইব। নামাজের এই ঘরটা বানবার সময় নদীর তীর থাইক্যা কমপক্ষে দুই আড়াই’শ হাত জাগা রাইখ্যা তারপরে বান্ধা হইছিল। আর এখন নামাজের জায়গা নাই। মক্তবে নামাজ হয়। কয়দিন পরে মসজিদই থাকতো না।’
অশীতিপর এই বৃদ্ধ আরও বলেন, ‘এমন কইরা গ্রামের প্রতিটা বাড়ির মানুষই বিপদে আছে। নদী বাড়ি ভাইঙ্গা নেয়, তেই তারা আবার ঘর বান্ধে। এই বয়সে আমি বেশ কয়েকবারই বাড়ি বানছি। বানতে বানতে মনে হয় কয়েক’শ হাত পিছাইছি। একসময় এই গ্রামই থাকত না। তারপরও সাহায্য করবার লাগি কেউ আগাইয়া আয় না, এইডাই দুঃখ।’
একই গ্রামের মো. আব্দুল মতিন বলেন, ‘ভাঙ্গনে কতখানি ক্ষতি হইছে এইডা আর কইয়া লাভ নাই। নদীর পার দিয়া সড়ক আছিল। এই সড়ক এখন মাঝ নদী। ভাঙ্গনের সাথে যুদ্ধ করতে করতে বুড়া হইছি। এখন আমরার পুয়াপানতে যুদ্ধ করব। কিন্তু কোন সরকারই আমরার উপকার করল না।’
সোনাপুর গ্রামের ভিটেচ্যুত মনোরঞ্জন কর বলেন, ‘এইডা একটা প্রাচীন গ্রাম। কিন্তু প্রাচীনতার সব নদীর পেটে চইলা গেছে। এখন পানিতে নদী ভরাট হওয়ায় কিচ্ছু দেখতে পাইতাছইন না। হুকনার দিন আইলে বুঝতাইন কিভাবে ধ্বংস হইতাছে গ্রাম। আমরা অক্কলের পুরান বাড়ি নদী খাইয়া ফেলাইছে। বর্তমানে যেখানে আছি সেটা সম্পূর্ণ নতুন। সর্বনাইশ্যা এই নদীর কড়াল গ্রাসে গ্রামের বেশির ভাগ মানুষই এখন নিঃস্ব।’
চাঁনপুর গ্রামের গোপেন্দ্র কর আঙ্গুল উচিয়ে বলেন, ‘নদীর ঐপারে চর জাগা যে জায়গাগুলো আছে এগুলো কাগজেপত্রে আমারার রেকর্ডের জায়গা। কিন্তু নদীতে বিলীন হওয়ায় এখন অন্য কেউ ভোগদখল কইরা আছে। আর আমরা এখন আছি পথের ধারে ঘর বাইন্দা।’ একই গ্রামের মো. হারুন মিয়া জানিয়েছেন, ‘এখানে যে পরিবারগুলো আছে সবাই সর্বস্ব হারিয়ে এখন বিলীন হয়ে গেছেন। তাদের বাড়ি বলতে কিছু নাই। অনেকেই ভিটেমাটি হারাইয়া রাস্তা কিংবা খাস জমিতে ঘর বাইন্ধা কোন রকম বাঁইচা আছেন।’
এ ব্যাপারে সংরক্ষিত আসনের (সিলেট-সুনামগঞ্জ) সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামীমা আক্তার খানম বলেন, ‘সম্প্রতি মাননীয় পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী এসে নদী ভাঙ্গন দেখে গেছেন। এ সংক্রান্ত একটি প্রকল্পও হাতে নেওয়া হয়েছে। আমি আশাবাদী, ভাঙ্গন রোধকল্পে যথাসময়েই কাজ শুরু হবে এবং নদী তীরবর্তী মানুষের সমস্যাও সমাধান হবে।’
সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বলেন, ‘এই প্রকল্পের জন্য কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। আশা করি অচিরেই কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।’