আলু ও তেলের দাম নাগালের বাইরে

আসাদ মনি
ক্রমেই বাড়ছে আলুর দাম। সঙ্গী তেলও। লাগামহীনভাবে বেড়ে চলেছে এ দুটি পণ্যের দাম। দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্ষোভ ছড়িয়েছে মানুষের মধ্যে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিটি পাইকারি ও খুচরা দোকানে প্রতি কেজি আলুর দাম এখন ৫০ টাকা। যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। পাম ওয়েল লিটার প্রতি বেড়েছে ১৫ টাকা। অযৌক্তিকভাবে দাম বেড়ে যাওয়ায় বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারি সংস্থা জেলা কৃষি বিপণন অধিদপ্তর রয়েছে নিরব। নিয়মিত বাজার মনিটরের দায়িত্ব থাকলেও জনবল সংকটের কারণে নিয়মিত বাজার পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন না বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ফলে নিত্য প্রয়োজনীয় ভোগ্য পণ্যের দাম নির্ধারণ থেকে শুরু করে বর্তমান বাজারে আলু ও পাম ওয়েলের দাম কত রয়েছে জানেন না অফিসের কেউ।
জানা যায়, ১ মাস আগেও বাজারে আলুর দাম ছিলো প্রতি কেজি ৩০ টাকা। মাস ঘুরতে না ঘুরতে প্রায় দ্বিগুণ দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়াও সয়াবিন তেলের দাম ১৫ দিন আগেও ছিলো লিটার প্রতি ৭৫ টাকা। এখন সেটি ৯০ টাকা ধরে বিক্রি হচ্ছে। দাম বৃদ্ধির তালিকায় রয়েছে পুষ্টি কোম্পানির ফ্যামেলি সয়াবিন তেল, ফ্রেশ কোম্পানির পিওর সয়াবিন তেল ও তীর কোম্পানির ন্যাচারাল সয়াবিন তেল।
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, কৃষি বিপণন আইন অনুযায়ী নির্ধারিত দর না মানলে এক বছরের কারাদ- বা এক লাখ টাকা জরিমানা করা যেতে পারে। যৌক্তিক দামে প্রয়োজনীয় ভোগ্য পণ্য বিক্রির আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন। তবুও সুফল মিলছে না।
বৃহস্পতিবার সরজমিনে বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রতি কেজি গোল আলু জেলা সদরে ৪৫ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অন্যান্য উপজেলায় ৫০ থেকে ৫২ টাকায় বিক্রি হয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়াও সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছে লিটার প্রতি ৯০ টাকায়।
সাধারণ ক্রেতারা বলছেন, করোনা মহামারিকে কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু পাইকারি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট তৈরি করে বাজারে ভোগ্য পণ্যের দাম বাড়িয়েছে। বড় বড় খুচরা ব্যবসায়ীরা আগে এই ভোগ্য পণ্য মজুদ রেখেছেন। তারাও এই সুযোগে আগের ক্রয়কৃত পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। সরকারি প্রতিষ্ঠান যাদের বাজার নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব তারা সেটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। ফলে নি¤œ আয়ের মানুষের সংসার চালাতে হিমসিম খেতে হচ্ছে।
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, প্রতি বস্তা আলু তারা ২৫শ’ থেকে ২৭শ’ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে। ৬০ কেজি প্রতি বস্তা হলেও পাওয়া যায় ৫৮ কেজি। এজন্য তারা ৫০ টাকা কেজি ধরে আলু বিক্রি করছেন। সয়াবিন তেলও কোম্পানির এস.ও থেকে অতিরিক্ত দামে কিনতে হচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়েই তারা ৯০ টাকা লিটারে সয়াবিন তেল বিক্রি করছেন।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কাঠইর ইউনিয়নের জগজীবনপুর গ্রামের বাসিন্দা দিনমজুর মো. বাহার মিয়া। বেকারির পণ্য শহরের বিভিন্ন দোকানে ডেলিভারি দেন। প্রতিদিন রোজগার হয় তার ২০০-২৫০ টাকা।
তিনি বলেন, আমরা কম আয়ের মানুষ, তরকারি অন্য কিছু না কিনতে পারলেও আলু প্রতিদিন কিনি। কিছু না হোক আলুর ভর্তা করে ভাত খাওয়া যায়। এখন সে আলুর দাম বেড়ে গেছে। গতকাল আমাদের গ্রামের বাজারে এক কেজি আলু কিনেছি ৫০ টাকা দিয়ে। দোকানদার বলেছে, আজকে ৫০ টাকায় নিয়ে নিন, কাল থেকে ৬০ টাকায় কিনতে হবে।
একই ধরণের কথা বললেন পৌরসভার কালিপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. উকিল মিয়া। তিনি বলেন, ছোট একটি টং দোকান দিয়ে কোনো রকম সংসার চালাই। দাম বাড়ায় বিপদে পরেছি। শাকসবজির দাম বাড়লে খাওয়া ছেড়ে দিতাম। কিন্তু আলু ও তেল ছাড়া গরিব মানুষ কি খাবে? তেল খাওয়া ছাড়লেও আলু ছাড়া সম্ভব নয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুষ্টি কোম্পানির ফ্যামেলি সয়াবিন তেলের পাইকারি সরবরাহক (এম.ও) বলেন, সয়াবিন তেলের ৪ টি কোম্পানি সিন্ডিকেট করে ১৫ দিনের ভেতর ১৫ টাকা লিটার প্রতি দাম বৃদ্ধি করেছে। ১৫ দিন আগেও এই তেলের মূল ছিলো ৭৫ টাকা।
জগন্নাথবাড়ি রোডের রোকেয়া স্টোরের খুচরা ব্যবসায়ী শুভ দেব বলেন, গত ১৩ তারিখ ২ বস্তা আলু ২৭শ’ টাকা দরে এনেছি। ১ সপ্তাহ আগেও বস্তা প্রতি ১৯শ’ টাকা ছিল। তাই আমরা ৫০ টাকা কেজি প্রতি বিক্রি করছি।
একই এলাকার খুচরা ব্যবসায়ী রুবেল রায় বলেন, আমরা গতকাল ২৬শ’ টাকা ধরে আলুর বস্তা কিনেছি। আমি আজ ৪৫-৪৬ টাকা দরে কেজি প্রতি বিক্রি করছি।
পাইকারী ব্যবসায়ী অসীম রায় বলেন, আমি রংপুর, রাজশাহী ও ঠাকুরগাঁও থেকে আলু কিনে আনি। যাদের কাছ থেকে পাইকারী দরে কিনি তারা সিন্ডিকেট করে আলুর দাম বৃদ্ধি করেছে। যে আলু ২৫শ’ থেকে ২৭ শ’ টাকা ধরে কিনতে হচ্ছে এখন, সে আলু ২ মাস আগেও ১২শ’ টাকা দরে কিনে এনেছি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের (০৮৭১- ৬১৬৪৫) অফিসে ফোন দিয়ে জানতে চাইলে একজন কর্মচারি জানান, বাজার নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা আব্দুল খালেক বাজার মনিটরিং করছেন। উনার সঙ্গে আলাপ করতে বলেন তিনি।
জেলা বাজার নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা আব্দুল খালেক’র কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অমি চাকরি থেকে অবসরে চলে গেছি।’
এখন কে বাজার মনিটরিংয়ের দায়িত্বে আছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অন রিকুয়েস্টে আমি মাঝে মধ্যে কাজ করি। তবে এখন ছুটিতে রয়েছি। বাজার সম্পর্কে জানতে অফিস সহকারি রুহুল আমিন কে ফোন দেন।’ রুহুল আমিনের কাছ থেকে বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানা যাবে বলেন এই কর্মকর্তা।
অফিস সহকারি রুহুল আমিন বলেন, আমার গত মাসের ১৩ তারিখে করোনা পজেটিভ ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে কাজ করতে পারছি না। বাজারের আলু ও তেলের দাম কত সে ব্যাপারে আমি কিচ্ছু জানি না।