আলোর পথযাত্রী

অ্যাড. এনাম আহমেদ
আলোর পথযাত্রী এ যে রাত্রি, এখানে থেমো না। না! সলিল চৌধুরীর ভূবন বিখ্যাত গানের কথাগুলোর মতো এখানে না থামার আহবান শুনলো না কামাল । সে থেমে গেল মাত্র পয়তাল্লিশে। অথচ এখন তার জীবনে সর্বোচ্চ গতি থাকার কথা ছিল। আমাদের অত্যন্ত সংবেদনশীল, স্মার্ট বন্ধুটি, যার মুখে সব সময় স্মিত হাসি লেগেই থাকতো, মৃত্যুও তার সেই হাসি ¤øান করতে পারেনি! সে একজন শিক্ষক। সকল শিক্ষকই শিক্ষক নন, কেউ কেউ শিক্ষক। তার শিক্ষকতার দ্যুতি ছড়িতে আছে এ শহরে ও শহরের বাইরে সবখানে। এখনতো অনেক শিক্ষকগণের ক্লাস রুমের ভেতরেই নিয়ন্ত্রণ নেই! কিন্তু কামালের নিয়ন্ত্রণ ছিল স্কুলে, শহরে সর্বত্র। শিক্ষকতাকে সে প্রাণহীন,আলোহীন নিছক চাকুরি মনে করেন নি।উচ্চাকাঙ্খার নামে হৃদয় বা আবেগের উপর অত্যাচার করেননি। এক সংগ্রামী পিতার সন্তান আনিসুর রহমান কামাল। তার পিতা জুবিলী স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও জেলা শিক্ষা অফিসার মো. মকবুল হোসেন স্যার।স্যার নিজে পিতৃহারা হোন মাত্র তিন মাস বয়সে। বাবার কোন স্মৃতি তাঁর ছিল না। বাবা শব্দটি শৈশবে তাকে শেখানোর প্রয়োজন কেউ মনে করেন নি। তিনি প্রথম বাবা ডাকেন আঠাশ বছর বয়সে যখন পুত্র সন্তানের জনক হোন।তার তিন পুত্রের মধ্যে অন্য দুই পুত্র সুনামগঞ্জে না থাকায় মধ্যম পুত্র কামালকেই বেশিবার বাবা বলে ডাকতে পেরেছিলেন।ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সেই বাবা ডাকও স্তিমিত করে দিয়ে কামাল চলে গেল অবেলায়। কামালে জন্ম ১৯৭৫ সালের ১২ ডিসেম্বর নানাবাড়ি ময়মনসিংহ ত্রিশালের ধানীখোলা গ্রামে।মাতার নাম বেগম জোবেদা মকবুল। সে বেড়ে উঠে শহরের ষোলঘর কোলনীতে। পিতা মকবুল হোসেন তখন পরিবার নিয়ে সেখানেই বসবাস করতেন। কামালে শিক্ষাজীবন শুরু হয় রাজগোবিন্দ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ৮২ তে জুবিলীতে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হলে সেখানেই তার সঙ্গে প্রথম পরিচয়। ৪র্থ শ্রেণী থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত সে কখনও দ্বিতীয় হয়নি, উচ্চ মাধ্যমিকে প্রথম বিভাগে পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য ভর্তি হয়। থাকতো মহসিন হলে। আমরা মাঝে মাঝে ঢাকা গেলে তার আবাসিক হল থেকে বেড়িয়ে আসতাম। ঢাবি থেকে কৃতিত্বের সাথে ইংরেজী সাহিত্যে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করে। আমরা পড়াশুনা শেষ করে সুনামগঞ্জে ফিরে এসে শহরে মানসম্পন্ন পড়াশুনার ভাল সুযোগের অপ্রতুলতায় হতাশা হই। তখন ঠিক করি বন্ধুরা মিলে একটি শিক্ষা কেন্দ্র খোলতে। অর্থাৎ মাধ্যমিক পর্যায়ে একাডেমিক কোচিং। এতে শিক্ষার্থীরা একদিকে উপকৃত হবে,অন্যদিকে আমরাও চাকুরি যুদ্ধের প্রস্তুতিমূলক পড়াশুনার সুযোগ পাব।১৯৯৮ সালে “সৃজন শিক্ষা কেন্দ্র” প্রতিষ্ঠিত হলো। কামাল ঢাকা থেকে এসে এতে যোগদিল ২০০০ সালে। তখন শহরের অভিভাবকগণ আমাদের অনুরোধ জানান একটি পূর্ণাঙ্গ স্কুল প্রতিষ্ঠা করার। আমরা প্রতিষ্ঠা করি “সৃজন বিদ্যাপীঠ” নামে প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের।২০০১ সালে কামাল চাদঁপুর জেলার সরকারি হাসান আলী হাইস্কুলে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে। সে সুনামগঞ্জে বদলি হওয়ার চেষ্টা করলে স্কুল কর্তৃপক্ষ কিছুতেই তার মতো দক্ষ ইংরেজি শিক্ষককে ছাড়াতে চায় না। শেষে তার পিতা মকবুল হোসেন স্যারের অসুস্থতা জনিত মানবিক কারণে তাকে সুনামগঞ্জের এস.সি গার্লস হাইস্কুলে চলে আসার ছাড়পত্র দেয়া হয়।আমরা সৃজন কেন্দ্রিক বন্ধুরা তাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য সবাই চাদঁপুরে যাই।সে এক স্বপ্নের মতো সময় গেছে আমাদের! চাদঁপুর বাসস্টেড কামাল ও ইলিশ মাছ আমাদের স্বাগত জানায়। সেখানে তার বাসায় অবস্থানকালে আমাদের নিরস্ত্র কোন কোন বন্ধুর উপর বিষাক্ত কীটপতঙ্গ হামলা চালিয়ে আমাদের রীতিমতো বিপর্যস্ত করে দেয়। এতো প্রতিকূলতার মধ্যেও আমরা বীরের বেশে কামালকে সুনামগঞ্জে নিয়ে আসি । এতো লোকজন গিয়ে তাকে সসম্মানে নিয়ে আসায় সেখানকার ছাত্র-শিক্ষকগণ রীতিমতো হতবাক।
১৪ সালে সে সরকারি জুবিলী স্কুলে চলে এলো । এ আসাও খুব সহজ ছিল না। এস.সি স্কুলের শিক্ষার্থী, কর্তৃপক্ষ কিছুতেই তাকে ছাড়াতে চায় না। আবারও মকবুল হোসেন স্যারের হস্তক্ষেপ! জুবিলীতে আট বছর সে লেখাপড়া করেছে। তার বাবা পঁচিশ বছর এখানে শিক্ষকতা করেছেন। সেই আনন্দ-বেদনার স্মৃতি সে হারাতে চায়নি। স্কুলে যোগদান করেই সে কাজে লেগে যায়। পাঠদানের পাশাপাশি স্কুলের বাস্কেটবল গ্রাউন্ড পাকাকরণ, সৌন্দর্য বর্ধন ইত্যাদিতে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকে। শেষ কয়েক বছর সে শিক্ষার্থীদের টিফিনের দায়িত্বে ছিল। সেখানে নয়ছয় করার যথেষ্ট সুযোগ ছিল। তবে কামাল টিফিনের প্রতিটি পয়সার হিসাব পাই পাই করে দিয়েছে বলে প্রধান শিক্ষক জানিয়েছেন কামালের জানাজায়।২০১১ সালে সে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। তার শ্বশুরবাড়ি দিরাইয়ের ধল গ্রামে যা শাহ আবদুল করিমের গ্রাম হিসেবে পৃথিবী বিখ্যাত। আমরা সবাই বরযাত্রী গেলাম, অনেক মজা করলাম।্ কামাল এমনিতেই লাজুক স্বভাবের। আমাদের কর্মকান্ডে সেদিন আরও কুকড়ে গেল। তার স্ত্রী শেখ ফারজানা সুমা বর্তমানে পৌর কলেজের প্রভাষক। সে ইংল্যান্ডে গেছে দুইবার। একবার শিক্ষকদের সঙ্গে প্রশিক্ষণে আরেকবার শিক্ষার্থীদের নিয়ে। প্রবাসে স্থায়ী হওয়ারও সুযোগ ছিল তার। কিন্তু কোন স্বপ্নিল হাতছানিই তাকে আকৃষ্ট করতে পারে নি। মা-বাবার সংস্পর্শে সুনামগঞ্জে থাকাই ছিল তার সর্বোচ্চ পাওয়া। মাঝে মাঝে বলতো শিক্ষকতা থেকে অবসর নেয়ার পর তার গ্রামের বাড়ি সাউদপাড়া মহেষখলা মধ্যনগরে ফিরে যাবে, খামার করবে। বড়শি দিয়ে মাছ ধরার শখ ছিল তার। সুযোগ পেলেই বড়শি নিয়ে ছুটে যেত মাছ ধরায়। ২০১৫ সালে ভুল চিকিৎসার স্বীকার হয় কামাল। ক্রমশ কিডনি আক্রান্ত হতে থাকে। ভারত গেছে একাধিকবার কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেনি। পরিস্থিতি কিডনি ডায়ালাইসিসের পর্যায়ে চলে আসায় একটি কিডনি প্রতিস্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয় পরিবার থেকে, কিন্তু সে সুযোগ আর পাওয়া যায়নি। একটি সুশিক্ষিত পরিবারের সুসন্তান কামাল। ছয় ভাইবোনের মধ্যে বড়বোন শামীমা আখতার বুলচান্দ স্কুল এন্ড কলেজ অব-বিজনেস ম্যানেজমে›টের সহকারি অধ্যাপক । বড়ভাই মাহবুবুর রহমান আলম বি আই বি এম এর সহযোগি অধ্যাপক। তিনি দেশে-বিদেশে ব্যাংক অফিসার প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন।দ্বিতীয় বোন সালমা আখতার পান্না প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে উদ্যোগতা সৃষ্টি ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্পের সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। ছোটভাই হাফিজুর রহমান নোমান হাঙ্গার প্রজেক্ট,সিলেট অঞ্চলের সমন্বয়ক, ছোটবোন হালিমা আখতার শাবিপ্রবির নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের সহকারি অধ্যাপক। বর্তমানে ইংল্যান্ডে পিএইচ.ডি অধ্যায়নরত। তার জীবনের শেষ দিনও কেটেছে অত্যন্ত ব্যস্ততায়। ঐদিনটিতেও সে মোটামুটি সুস্থ ছিল। বোন পান্নার সাথে গেছে ঢাকার গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে। সেখানকার কিডনি চিকিৎসার সুবিধাগুলো পরখ করেছে। হেপাটাইটিস বি এর কিছুটা আলামত থাকায় সেই টেস্টও দিয়ে এসেছিল গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে। যার রিপোর্ট দেয়ার কথা পরের দিন। কিন্তু সেই পরের দিনটি আর এলোনা তার জীবনে।বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে ওয়েসিস নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছিল। যার উদ্দেশ্য ছিল প্রত্যন্ত গ্রামে জমি কিনে খামার তৈরী করা, সেই কর্মকান্ডটিও সম্পাদনের সময় পেল না। কামালের শবদেহ ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জে পৌঁছালে তার মুখের উপর থেকে যখন কাপড় সরানো হল,তখন তার ভাইবোন চিৎকার করে বিলাপ করছিল, ভাইয়া তো হাসচ্ছে! ভাইয়া তো হাসচ্ছে!! আসলেই তখনো তার মুখে মৃদু হাসি ছিল। জানাজা অনুষ্ঠিত হয় জুবিলী স্কুলের তারই হাতেগড়া বাস্কেটবল গ্রাউন্ডে। সেখানে ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবক,বন্ধুবান্ধবদের ঢল নামে। ছয় বছর আগে বদলি হয়ে আসা এস.সি স্কুলের শিক্ষার্থীরা ও জুবিলী স্কুলে এসে আহাজারি করে হ্যামিলনের এই বাশিঁওয়ালার জন্য।
কামালের একমাত্র সন্তান ছয় বছরের শিশু সাদাত। শবদেহ নিয়ে যখন মাতম চলছে, তখন সাদাত শান্তভাবে হেটেঁ বেড়াচ্ছে।মাঝে মাঝে কাউকে কাউকে শান্তনাও দিচ্ছে এই বলে যে, বাবা অসুস্থ তাই ঘুমুচ্ছে। শুধু কামালের শেষ যাত্রা যখন শুরু হয়,তখন একবার বলেছে বাবা আবার কবে আসবে? সেও তার দাদা মকবুল হোসেন স্যারের মতো পিতৃহীন হলো অল্প বয়সে। সে যেন তার বাপ দাদার মতো সত্যিকারে মানুষ হয়. এটিই আমাদের মতো বন্ধু হারানো অভাগাদের একমাত্র প্রার্থনা। ,