আশুরার গুরুত্ব ও তাৎপর্য

হোসেন তওফিক চৌধুরী
ইসলামী বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মুহররম। মুহররম মাসের ১০ তারিখে অনেকগুলো তাৎপর্যমন্ডিত ঘটনা সংঘটিত হওয়ার দিনটি ইসলামের ইতিহাসে অসাধারণ গুরুত্বে গুরুত্বপূর্ণ। আর এই দিনটি আশুরা নামে অভিহিত। আশুরার মরতবা ও মাহাত্ম্য অপরিসীম। এই দিনে শুধু কারবালার মর্মান্তিক ও হৃদয় বিদারক ঘটনাই সংঘটিত হয়নি, ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে হযরত হুসাইন (রহ:) শাহাদাত বরণ করার শোকাবহ ঘটনা এই দিনটিকে একটি অনন্য ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দান করে। পৃথিবী যতদিন থাকবে ততদিন মানুষ গভীর শোকÑ শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় এই দিনটিকে স্মরণ করবে। কোন মহাপ্লাবনেও এই দিনের শোকাবহ ঘটনা মানুষ বিস্মৃত হবে না। স্থুল দৃষ্টিতে কারবালায় ইয়াজিদের জয় হলেও প্রকৃত বিজয় হয়েছে হযরত হুসাইন (রহ:) এর। সত্য ও ন্যায়ই বিজয় মুকুট    লাভ করে। কারবালার নির্মম ও নৃশংস হত্যাকা-ে মুসলিম উম্মাহ যেভাবে শোকাতুর হয়েছে এবং যে রূপ নানাভাবে ও নানা রূপে শোক প্রকাশ করেছে, মাতম করেছে এর কোন নজির ইতিহাসে নেই। এই ঘটনায় হযরত হুসাইন (রহ:) ইতিহাসের স্মরণীয়-বরণীয় ও মৃত্যুঞ্জয়ী চিরঞ্জীব হয়েছেন আর ইয়াজিদ হয়েছে ধিকৃত। আজও মানুষ কারবালার ঘটনার জন্য ফুঁসে উঠে। এই দিনে যেসব ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে তার মধ্যে লাওহ, পাহাড় পর্বত এই আশুরার দিনেই সৃষ্টি হয়েছে। হযরত আদম (আ:) এর সৃষ্টি এই দিনেই। এই দিনেই তাঁকে বেহেশতে স্থান দেয়া হয়েছে। আবার এ দিনেই তাঁকে বেহেশত থেকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে। হযরত ইব্রাহিম (আ:) এইদিনে ভূমিষ্ট হয়েছেন এবং এ দিনেই হযরত তাঁর পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ:) কে কোরবানী করতে নিয়েছিলেন। নুহ (আ:) এ দিনেই মহাপ্লাবনের হাত থেকে রক্ষা পাবার পর জাহাজ থেকে পৃথিবীর মাটিতে অবতরণ করেন। হযরত ইদ্রিছ (আ:) সুদীর্ঘ রোগভোগের পর এ দিনেই মুক্ত হয়েছেন। হযরত ইউনূস (আ:) মাছের পেট থেকে এ দিনেই রক্ষা পান। হযরত ইব্রাহিম (আ:) নমরুদের প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুন্ডে ৪০ দিন অবস্থানে পর আল্লাহর অপার রহমত ও কুদরতে সহাস্যে বেরিয়ে আসেন। আর এ দিনেই হযরত মুসা (আ:) ফেরাউনের বন্দিদশা থেকে উদ্ধার করেছিলেন বনী ইসরাইল সম্প্রদায়কে এবং ফেরাউন তার বিশাল সৈন্যবাহিনী সহ লোহিত সাগরে সলিল সমাধি লাভ করে। এ দিনেই হযরত ইশা (আ:) কে আল্লাহ পাক তাঁর শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করেন এবং সশরীরে তাঁকে আসমানে উঠিয়ে নেন। এ দিনেই হযরত দাউদ (আ:) ক্ষমা লাভ করেন এবং হযরত সোলায়মান (আ:) এ দিনেই তাঁর হারানো রাজত্ব পুনরায় লাভ করেছেন। কেয়ামত সংঘটিত হবে এই আশুরার দিন শুক্রবারে। ওলিকুল শিরোমনি গাউসুল আজম আবদুল কাদির জিলানী (রহ:) রচিত ‘গুণিয়াতত্ব ত্বালিবীন’ পুস্তকের মতে এই দিনে আখেরী নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তাফা (দ:) এর পবিত্র রুহ মোবারক সৃষ্টি করা হয়েছিলো বলে ৩২৮ পৃষ্ঠায় এই তথ্য লিপিবদ্ধ আছে। আশুরার দিনেই উল্লেখিত তাৎপর্যমন্ডিত ঘটনাগুলো সংগঠিত হওয়ায় এ দিনটি একটি অনন্য ও বৈশিষ্ট্য লাভ করেছে। সর্বশেষ ঘটনা হচ্ছে কারবালা ময়দানের নির্মম, নৃশংস ও হৃদয়বিদারক ঘঁনা। গুরুত্বেও পরিপ্রেক্ষিতেই ইহুদীরাও এ দিনে সিয়াম পালন করত। এভাবে যতগুলো ঘঁনা আশুরার দিনে সংগঠিত হয়েছে সবগুলোই সমগ্র উম্মার জন্য। গোটা মানবম-লিরজন্য ছিল এই সব রহমত স্বরূপ। কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সিয়াম ইহুদিরা কেবল আশুরার দিনেই সিয়াম পালন করতো। ইহুদিদেও সিয়াম পালনের সাথে পার্থক্য নির্ণয়ের জন্য নবী করিম (স:) আশুরার দিবসের সাথে নবম দিবসেও অর্থাৎ ৯ ও ১০ই মহরম সিয়াম পালনের নির্দেশ প্রদান করেন। এই সিয়াম পালন অত্যন্ত বরকতময়। সবশেষে কবির ভাষায় বলতে হয় ‘ ফিরে এলো আজ সেই মুহররম মাহিনা, ত্যাগ চাই মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না।
তথ্যসূত্র:
১।  হযরত আব্দুল কাদির জিলানী কৃত ‘গুনিয়াতত্ব ত্বালিবিনের’ বাংলা অনুবাদ এ এন এম ইমদাদউল্লা ৩২৫-৩২৮ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।
২। ইসলামী একাডেমীর মাসিক পত্রিকা অগ্রপথিকের ১৩’শ বর্ষ প্রথম সংখ্যা, জানুয়ারি ১৯৯৮ পৃষ্ঠা ২৯৮ পৃষ্ঠা ২৪৮, ২৪৯, ২৫০।
লেখক: সিনিয়র আইনজীবী ও কলামিষ্ট।