আসুন মানবতার জয়গানে উচ্চকিত করি পৃথিবীর অশান্ত বাতাস

সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতিতে-জাতিতে, সম্প্রদায়ে-সম্প্রদায়ে বিভক্তি বিভাজন, রেশারেশি, সহিংসতা তৈরির মাধ্যমে বিশ্বশান্তি বিনষ্ট করার পিছনে বছরের পর বছর ধরে আমেরিকা যেভাবে ইন্ধন জুগিয়ে গেছে এখন সেই আগুন নিজের দেশেই জ্বলতে শুরু করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয় অর্জনের পর দেশটির বিভিন্ন শহরে চলছে বিক্ষোভ। সপ্তাহব্যাপী শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ প্রসমনের কোন লক্ষণ নেই। বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ওবামা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এই বিক্ষোভ দমনে তিনি কোন ধরনের হস্তক্ষেপ করবেন না। তিনি বরং সংগঠন, ভোটাধিকার প্রয়োগ এমনসব ক্ষেত্রে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার জন্য মার্কিনিদের প্রতি নসিহত করেছেন। অন্যদিকে পরাজিত প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন ৮ দিন পর গত বুধবার ওয়াশিংটনে এক সমাবেশে বলেছেন, এই নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রকে গভীরভাবে বিভক্ত করেছে। তিনি বহু জাতি, ধর্ম ও বর্ণের বহুমাত্রিক যুক্তরাষ্ট্রকে আরও ঐক্যবদ্ধ করতে নতুন লড়াইয়ের আহ্বান জানিয়েছেন। সুতরাং বুঝাই যায় একটি জ্বলন্ত উনুনে চাপানো ডেগের উপর আরোহণ করেই ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী জানুয়ারিতে বিশ্বের সবচাইতে ক্ষমতাধর পদটিতে আসীন হতে চলেছেন। তিনি জ্বলন্ত উনুনের আগুন নিভাবেন নাকি আরও উসকে দিবেন এইটিই বর্তমান বিশ্বের শান্তিকামী নাগরিকদের প্রধান জিজ্ঞাসা। তবে বাইরে আগুন লাগালে নিজের ঘর যে সুরক্ষিত থাকে না এই শিক্ষাটি মার্কিন নেতৃত্বের বোধগম্য হলে তাবৎ দুনিয়ার জন্য মঙ্গলজনক হতো। সেটি কি তাঁরা করবেন?
হিংসাদগ্ধ পৃথিবীতে প্রতিদিন বিনা কারণে অসংখ্য মানুষকে মেরে ফেলা হচ্ছে। ¯্রফে বিশ্বাস কিংবা জাতিগত ভেদের কারণে একদল মানুষ আরেক দল মানুষকে হত্যার পৈচাশিক আনন্দে মেতে উঠছে। আমাদের একেবারে গায়ের সাথে লাগা মিয়ানমারে রুহিঙ্গা মুসলমানদের উপর অত্যাচার নির্যাতনের খবরাখবর আসছে। দেশের অভ্যন্তরে হচ্ছে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও উপসনালয়ে হামলা। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে, আফগানিস্থান-পাকিস্তানে অবিরাম রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এই যে বিশ্বব্যাপী উন্মাদনা এর পিছনে অনুঘটকের ভূমিকা পালনের দায় অস্বীকার করতে পারবে না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আশির দশক পর্যন্ত মার্কিনীদের যে উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সাথে সা¤্রাজ্যবাদী বাণিজ্যস্বার্থ সেটি সোভিয়েত পতনের পর হয়ে উঠে কেবলই বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েমের একতরফা প্রদর্শনী। তারা বিশ্বব্যাপী যে ধর্মীয় সস্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর জন্ম দিয়েছিলো সেটি এতোদিনে ফাঙ্কেনস্টাইনের দানব হয়ে খোদ ¯্রষ্টার বুকেই আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জন করে নিয়েছে। সুতরাং এবার মার্কিনিদের লড়তে হচ্ছে নিজের তৈরি দানব সামলাতে। না, তাদের তেমন ক্ষতি হয়নি এতোদিন। রক্ত ঝরেছে, সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে, সভ্যতা ধ্বংস হয়েছে দুনিয়াজোরা। কিন্তু ভিতরে ভিতরে যে  নিজ দেশের ভিতরে ওই দানবের ভ্রুণ অবয়ব ধারণ করে নিজের দেহকে পরিপুষ্ঠ করা শুরু করে দিয়েছে তা টের পাওয়া গেল এখন। বহু জাতি, ধর্ম ও বর্ণ যে দেশে একত্রে বসবাস করতো, যে রাষ্ট্রটি গড়েই উঠেছে বহুমাত্রিক বৈচিত্রকে ধারণ করে আজ সেই দেশে সাম্প্রদায়িক আর বর্ণবাদী চিন্তা চেতনার জয় জয়কার। এটিই কি প্রাকৃতিক প্রতিশোধ?
না, মার্কিন নেতৃত্বের পক্ষে এই অবনমন রোধ করা সম্ভব নয়। তারা সেটি করবেও না। দায়িত্ব নিতে হবে সারা বিশ্বের শান্তিকামী জনতাকে। অশান্তি আর বিভাজনের বিরুদ্ধে শান্তি ও একতার বাণী নিয়ে এক কাতারে দাঁড়িয়ে শক্ত প্রতিরোধবলয় গড়ে তুলতে হবে। নতুবা বিশ্বশান্তি যে বিপন্ন অবস্থায় আজ পতিত সেখান থেকে মানব জাতিকে রক্ষা করা ক্রমশই দূরুহ হয়ে পড়বে। আসুন মানবতার জয়গানে উচ্চকিত করি পৃথিবীর অশান্ত বাতাস।