ইউসুফ শোকে কাতর জামালগঞ্জ এ শূন্যতা পূরণ হবার নয়

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
জামালগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ইউসুফ আল আজাদ নেই। তাই মৃতপ্রায় জামালগঞ্জ উপজেলা পরিষদ ও সাচনা বাজারের অলিগলি। বাজারস্থ তাঁর বাসভবনের সামন ও ভেতরের অতি পরিচিতি বস্তুগুলো যেন হণ্যে হয়ে খুঁজছে প্রিয় মানুষটিকে। শোকে কাতর মানুষগুলো কেমন জানি ছন্নছাড়া হয়ে পড়েছে। বাকরুদ্ধ প্রকৃতির গায়েও হারানোর পাংসুটে ভাব ফুটে উঠছে। সর্বত্র যেন এক শূন্যতা দেখা দিয়েছে।
সদা হাস্যরসে পরিপূর্ণ প্রবল সংস্কৃতিমনা ইউসুফের শূন্যতা কুকড়ে খাচ্ছে উপজেলার সর্বস্তরের মানুষকে। এখনও সেই স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে পারছে না জামালগঞ্জের হাট-বাজার ও পথঘাট। সাধারণ মানুষের অতি আপনজন নির্লোভ সজ্জন বিনয়ী মানুষটির আচমকা চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছেন না কেউই। নেভানো যাচ্ছে না অগণিত হৃদয়ের দুঃখদহন। তাঁর মৃত্যুতে বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তিবিশেষের পক্ষ থেকে সাচনা বাজার ও জামালগঞ্জে শোক ব্যানার টানানো হয়েছে।
গত ১০ জানুয়ারি জামালগঞ্জে স্মরণকালের সর্ববৃহৎ এই জানাযা জানান দিয়েছে ইউসুফ আল আজাদের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা। কতটুকু জনপ্রিয় হলে উপচেপড়া মানুষে ছেয়ে যায় বিস্তীর্ণ মাঠের জানাযাস্থল। মাঠ থেকে ক্ষেতের আল পর্যন্ত গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে মানুষ দু’হাত তুলে তাঁর জন্য প্রার্থনা করেছেন। উপজেলার সর্বাধিক জনপ্রিয় এ মানুষটি ওইদিন সাচনা বাজারস্থ মসজিদের পার্শ্ববর্তী পিতা আব্দুর রহমানের কবরের পাশে চিরশয্যায় শায়িত হন। এর মাধ্যমে জামালগঞ্জের কিংবদন্তীতুল্য একটি বর্ণাঢ্য জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটল।
গত ৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলে হাওর রক্ষা বাঁধ নিয়ে সদ্যপ্রয়াত ইউসুফ আল আজাদের সাথে সর্বশেষ কথা হয় এই প্রতিবেদকের। প্রায় পাঁচ মিনিটের কথোপকথনে হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কৌতুকের সুরে তিনি বলেছিলেন, ‘কম পানি কা মাল, ধরিয়া মে ঢাল।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘হাওরের দিকে তাকান, কৃষক-কৃষাণী কাঁদছেন, কর্তৃপক্ষ একটু সাবধান। একটা ফসল, একবার মারা গেলে এই বছর আর অন্যকোন ফসল ফলানো সম্ভব নয়। দয়া করে হাওরটাকে রক্ষা করেন।’ সেই প্রতিবাদী বক্তব্য আর শুনতে পারবে না উপজেলাবাসী।
প্রয়াত ইউসুফ আল আজাদকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তাঁর অন্যতম সহচর সাচনা বাজার বনিক সমিতির সহ সভাপতি চিত্ত রঞ্জন পাল বলেন, ‘আমরা আপাদমস্তক একজন অসাম্প্রদায়িক সাদা মনের মানুষকে হারিয়েছি। সুখে-দুঃখে একসাথে কাটিয়েছি। তাঁর সাথে অনেক আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছি।’
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম নবী হোসেন বলেন, ‘অভিভাবকহারা হয়ে পড়েছে জামালগঞ্জ। ব্যক্তি হিসেবে তিনি কতটুকু জনপ্রিয় ও ভালো মানুষ ছিলেন, তাঁর জানাযায় অংশগ্রহণকারী মানুষের ঢলই তা প্রমাণ করে। কেউ একবার কিংবা দুইবার জনপ্রতিনিধি হতে পারেন, কিন্তু ব্যক্তি ইউসুফ এমন একজন মানুষ ছিলেন যাঁকে বার বার ভোট দিয়ে মানুষ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করেছেন। তাঁর অভাব কখনও পূরণ হবে না।’
মুক্তিযোদ্ধা মো. শফিকুল ইসলাম (কলমদর) বলেন, ‘উপজেলাবাসী তাদের ভালোবাসার প্রিয় মানুষটিকে হারিয়েছে। যাদের ভোটে তিনি বারবার জনপ্রতিনিধি হয়েছেন তারা আজ অভিভাবকশূন্য হয়ে গেল। তাঁর সহযোদ্ধা হিসেবে নিজেকে শূন্য মনে হচ্ছে। বুকের ভেতর থেকে কি যেন একটা খসে পড়েছে। সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসার ঋণ কখনও শোধ করা যাবে না।’
বিগত উপজেলা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি রেজাউল করিম শামীম বলেন, ‘উপজেলাবাসী দীর্ঘদিনের জনপ্রতিনিধি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান এক মুক্তিযোদ্ধাকে হারিয়েছে। তাঁর সাদাসিধে জীবনাচরণ মানুষকে বেশ আকৃষ্ট করত। এর মাঝেই বেঁচে থাকবেন তিনি।’
সংরক্ষিত আসনের (সুনামগঞ্জ-সিলেট) সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামীমা আক্তার খানম বলেন, ‘ইউসুফ আল আজাদ ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক। তাঁর ধর্ম ছিল মানবধর্ম। আপাদমস্তক একজন মানবতাবাদী অসাম্প্রদায়িক মানুষ ছিলেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে আমরা বিশাল শূন্যতার মুখোমুখি হয়ে গেছি। এই শূন্যতা পূরণ হবার নয়।’
উল্লেখ্য, গত রবিবার সকাল সাড়ে ১১টায় সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।