ইকবাল কাগজী
একজন এনামুল কবির আমার প্রতি ঠারেঠুরে তাঁর স্বভাবসুলভ অধ্যাপকীয়পনায় পরিপক্ক ভাষার বাহারি ফুলঝুরি ছড়িয়ে সক্রেটিস থেকে ফুকো পর্যন্ত পরিভ্রমণ করতে করতে প্রায়ই অভিযোগাকারে অনুযোগ পল্লবিত করতে পছন্দ করেন যে, আমি নাকি কোনও বই নিয়ে আলোচনায় আগহী নই। অধ্যাপক মহোদয়ের মুখে ফুলচন্দনের গুড়িগুড়ি মিষ্টি বৃষ্টি হোক। অভিযোগ একেবারেই অস্বীকার করছি না, আমার মতো বদখত দুর্মুখের সে-সাহস নেই, থাকার কথাও নয়। কিন্তু তাঁকে (অধ্যাপক মহোদয়কে) কে বোঝাবে যে, আমি দোষৈকদর্শন বিষয়ে পরম পন্ডিত হলেও অদোষৈকদর্শন কিংবা অছিন্দ্রান্বেষণদর্শনে নিতান্ত মূর্খ বটে। তদুপরি আমি উত্তমরূপে পরিজ্ঞাত আছি যে, পারতপক্ষে কানাকে কানা বলতে নেই। এই কারণে বই নিয়ে আলোচনায় প্রবৃত্ত হওয়ার প্রবৃত্তি আমার হয় না। সেধে ঘাড়ে আপদ নয় একেবারে মূর্তিমান বিপদ চড়ানোর ফিকির করা কি নিজের জন্যে শুভঙ্কর কীছু হবে ? লোকে বলে, নিজের বোঝ পাগলেও বোঝে। অপরের লেখা নিয়ে সত্যি সত্যি সত্যিকার সমালোচনা শুরু করলে সত্যিকার অর্থে মূর্তিমান বিপদ আবির্ভূত হবে না সে-নিশ্চয়তা কি অধ্যাপক মহোদয় দিতে পারেন ? উত্তমরূপে পরিজ্ঞাত আছি যে, প্রকৃতপ্রস্তাবে সে-ক্ষমতা তিনি কেন, কেউই রাখেন না, এমনকি কোনও রথীমহারথীরও সে-সামর্থ্য নেই এবং দেশে পচা শামুকের কোনও অভাব নেই, এবম্প্রকার পরিজ্ঞান কার না আছে ?
কিন্তু ইদানিং একটি বিষয় আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জাবড়ে ধরেছে (‘আলিঙ্গন করছে’ ভাবতে অনাপত্তিপ্রযুক্ত)। আমার একজন বিশেষ প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি একটি বই লিখেছেন। বইটিকে তিনি আত্মস্মৃতির প্রসন্ন প্রেরণাসঞ্জাত অনুরঞ্জনের একটি উত্তম উদাহরণ রূপে উপস্থিত করতে আগ্রহী হয়েছেন, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তাঁর প্রয়াসকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু তিনি কতোটা সাফল্য লাভ করেছেন সেটা বিবেচনা করবেন বিদগ্ধ পাঠকেরা, যাঁরা তাঁর সতীর্থ ছিলেন বা কর্মসঙ্গী না হলেও ছিলেন কাছাকাছি, তাঁকে ও তাঁর চারপাশের বাস্তব জগৎকে দেখেছেন সে-জগতের একটি সচিন্ত্য জীবসত্তারূপে। এমনটাই তো হওয়া চাই। এমনটা আরও বেশি করে চাই এই জন্যে যে, বইটি সুনামগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধপূর্ব ও মুক্তিযুদ্ধোত্তর রাজনীতিকে উপজীব্য করে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। তাঁর স্বপ্রজন্মের, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্রযোদ্ধারূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন তেমন বীর মানুষদের আত্মস্মৃতি তো মুক্তিযুদ্ধ ও দেশপ্রেমের প্রেরণাসঞ্জাত কথকতায় পরিপূর্ণ হবে, এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং আরও অধিক স্বাভাবিকভাবেই আশা করা যায়, বইটি আর কীছু না হোক অন্তত ঐতিহাসিক হয়ে উঠবে। এখানে ‘ঐতিহাসিক’ বলতে বুঝে নিতে হবে, ‘সংঘটিত ঘটনাসমূহের বর্ণনা’ প্রকৃতপ্রস্তাবে অর্থাৎ বস্তুতপক্ষে ‘ঘটনা যেমন ঘটেছিল তেমন’ বর্ণিত হবে বা হয়েছে।
এবার প্রসঙ্গের একটু প্রসঙ্গান্তর করছি। বইটি সৌজন্যস্বরূপ আমাকে প্রদানের সময় লেখক একটি শুভসংবাদ পরিবেশন করেছেন। সে-সংবাদটি হলো, এই বইতে এই অধম আমার নামেরও উল্লেখ আছে। শুনেই কী এক ভয়ঙ্কর ভয়ে আমার গা কাঁটা দিয়ে উঠলো। আমি সেই ১৯৬৯ থেকে সুনামগঞ্জে আছি। আজ পর্যন্ত কেউ আমাকে যথার্থ অর্থে বর্ণনা করতে পারেন নি। বর্ণনার গুণে আমাকে কেবল হয় অতিরিক্তি না হয় রিক্ত করে তোলার পারঙ্গমতা প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছেন। অর্থাৎ আমার সম্পর্কে সত্যোচ্চারণ করা কারও পক্ষেই সম্ভব হয়ে উঠে নি, ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় যে-ভাবেই হোক।
একটি ঘটনার বর্ণনা দেই। ধরুন একটি রাজনীতিক নির্বাচনের পর আমাকে জোর করে একটি মঞ্চে উঠিয়ে দেওয়া হলো। নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমাকে মঞ্চে উঠতে হলো। এটি একটি লক্ষ্য করার বিষয় যে, নির্বাচিতজনদের পরিচয়পর্ব অনুষ্ঠানে মঞ্চে উঠার সময় চিরন্তন নিয়মানুসারে শ্রোতা-দর্শকেরা একধরণের স্লোগান তোলেন। আমার আগে যাঁরা মঞ্চে উঠেছেন তাঁদের বেলায় যেমন হয়েছে রেওয়াজ মাফিক আমার বেলায়ও তেমনি স্লোগান উঠলো, ‘কাগজী ভাই এগিয়ে চলো, আমরা আছি তোমার সাথে।’ আমি বললাম, ‘আমি আপনাদের সাথে নেই।’ প্রকৃত ঘটনা তো এটাই যে, এই কমিটিতে আমি থাকতে চাইছিলাম না। আমার সঙ্গে কোনওরূপ আলোচনা না করেই কমিটিতে আমাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এটা আমার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। তারপর লোকমুখে গল্পটি দাঁড়িয়ে গেলো এরকম। অর্থাৎ একধরণের চতুর চাপাবাজ চরিত্রহরণের গল্প ফেঁদে বসলেন, কাগজী মঞ্চে উঠলেন (তাঁকে জোর করে তোলা হলো, সে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হলো) এবং দর্শকশ্রোতারা রেওয়াজ মাফিক স্লোগান তোলতে ভুলে গেলেন। উল্টো কাগজী রেওয়াজের বাইরে গিয়ে বাস্তবেরও বাড়া বাস্তব কথা দর্শকশ্রোতাকে উদ্দেশ্য করে উচ্চারণ করলেন, ‘আপনারা আমার সাথে আছেন ?’ দর্শকশ্রোতা একপায়ে খাড়া। একবাক্যে বললেন, ‘আছি।’ কাগজী বললেন, ‘আমি আপনাদের সাথে নেই।’ তারপর যথারীতি গল্প ফুড়ুৎ। লোকের অভ্যাসই হয় তো এমন যে, হয় বাড়িয়ে বলা, না হয় কমিয়ে বলা, না হয় না-হক একটি অবাস্তব হাস্যকর গল্প ফাঁদা, প্রকারান্তর অন্যের সঙ্গে একধরণের প্রতারণা করা। কিন্তু এবংবিধ অবাস্তব গল্পের শ্রোতারা গল্প শোনতে শোনতে একদম বোকা হয়ে যায় কেন আমার বোধগম্য নয়। বোধ করি বাঙালির বিশ্বাস এবম্প্রকার কল্পলোকের গল্প দিয়ে তৈরি বলেই মিথ্যার বেসাতি এখানে রাজত্ব করে চলে যুগের পর যুগ এবং সত্যি সত্যি সত্য যখন আবির্ভূত হয় তখন খেসারত দেওয়া ছাড়া গত্যান্তর থাকে না। বাঙালির জাতীয় জীবনেও এমন সব প্রতারণার ঘটনা একবারে নেই এমন নয়। জাতিগতভাবে বাঙালিরা এখনও এভাবেই প্রতারিত হয়ে চলেছে। আপাতত সে প্রসঙ্গ যাচ্ছি না, পূর্বপ্রসঙ্গে ফিরে আসি। কীছু কীছু ক্ষেত্রে এইভাবে গল্প ফাঁদা যে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটায় সেটা ভুলে গেলে চলে না, এ বোধটুকু অন্তত যিনি লিখতে বসবেন তাঁর পক্ষে বেমালুম ভুলে বসে থাকা মোটেও সমীচীন নয়। আর জেনে অথবা না-জেনে এই সমীচীনতাকে যদি কেউ লঙ্ঘন করেন, তাঁকে উপেক্ষা করা হয়ে উঠে ভয়ঙ্কর অসমীচীন।
আমাকে যে বইটি সৌজন্যস্বরূপ উপহার দেওয়া হলো সেটিতে আমার নাম আছে। চমৎকার অনুভূতি হওয়ার কথা। কিন্তু হলো না। তার একটা কারণ আছে। আমার বেলায় অবস্থাটা এমন সহজ নয়, একটু বেঁকাতেড়া। কেউ আমাকে নিয়ে কীছু বলতে বা লিখতে গেলে তাঁর বলার বা লিখার বিষয়প্রপঞ্চটি কোনও না কোনওভাবে যথার্থতাকে খোঁজে পায় না, পথ হারিয়ে ফেল। তো কী আর করা ? যখন কীছু একটা লিখার থাকলেও কোথাও কেউ আমার সম্পর্কে কীছু লেখেন না তখন আমি খুব খুশি হই। কিন্তু যখন কেউ কীছু লেখার না থাকলেও কীছু একটা লেখেন, আর লিখতে হলেও লিখতে গিয়ে আসলে ঠিকঠাক কীছু লিখেন না, তখন হতাশ হই। আবার কী আর করা ? এমনটিকেই নিজের ভাগ্য বলে মানি। ঘটনা ব্যপদেশে আমি শতভাগ ঠিক থাকলেও দেখেছি সেখানে আমাকে বেঠিক প্রমাণ করার জন্যে কোনও কোনও আনাড়ি পর্যন্ত উঠে পড়ে লেগে যান। একবার তো এই জনপদের সর্বজনশ্রদ্ধেয় এক পন্ডিত আবুল হোসেন মিলনায়তনের শতলোকের সামনে আমাকে কুম্ভিলকবৃত্তির দোষে দোষী সাব্যস্ত করে আমার বিশেষে একটি গবেষণাধর্মী লেখাকে সমালোচনা করতে কসুর করেন নি। অপমানের চূড়ান্ত আর কাকে বলে ? অথচ লেখাটি প্রস্তুত করতে গিয়ে আমাকে সংশ্লিষ্ট শ’দুয়েক বই ঘাঁটাঘাটি করতে হয়েছিল, উদ্ধৃতির ঠিকুজি দিতে হয়েছিল ষাটটিরও বেশি। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসেছিলাম, বুঝতে পারছিলাম না কী করে আমি চোর হয়ে গেলাম। মূর্তিমান পন্ডিতের শ্রেণিঘৃণা সে-দিন আমাকে তাপিত করেছিল। প্রবল মিথ্যাচারের সবল দু’হাত সে-দিন আমার টুটি টিপে ধরেছিল, আমি এক অণু অক্সিজেনের জন্য ছটফট করেছিলাম। কেউ আমার পাশে ছিল না। এক সময় দাউদ হায়দারের উপলব্ধি ‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ’ চুপি চুপি এসে আমার স্বীয় উপলব্ধির জায়গা দখল করেছিল নিয়েছিল। তবে আমি নিশ্চিত ছিলাম যিনি আমাকে চোর বললেন, তাঁর কোনও লেখা থেকে আমি উদ্ধৃতি উদ্ধার করি নি। এ জন্য কি তিনি না-খুশ হলেন ? ভেবে নিয়েছি, তা তিনি হতেই পারেন। কী আর করা, মানুষ কতো কীছুই তো করে, হিরোসিমা নাগাসাকিতে এ্যাটম ফেলে দেয়। কেউ কীছু করতে পারে না। এমন অনুচিৎ ঘটনা ঘটেই চলে। অনেকেই এমন আছেন ঠিকবেঠিক কিংবা উচৎ অনুচিৎ যা-হোক যাচ্ছেতাই দু’চার কথা লিখেও ফেলেন।
আমার প্রথমেই সন্দেহ হলো, সাধারণত যেমন হয়ে থাকে তেমন হয় নি তো ? লেখক প্রস্থান করতেই খোলে দেখলাম কী লিখেছেন। একেই বলে বোধ করি একবারে ‘যা যা নয় তা’, অর্থাৎ মূর্তিমান অধ্যাস। আমি তো কোন ছার, বয়ার্ণনাটি (বয়ান+বর্ণনা+টি) এমকি বরুণদাকেও (প্রসূনকান্তি রায়) নাটাপ্যাচা করে ছেড়েছে। ছাড়ে নি খোকনদা (নিরঞ্জন চৌধুরী), হুমায়ুন ভাই (হুমায়ুন কবীর চৌধুরী), সৈয়দ কবীর আহমদ এ্যাটভোকেট ও নির্মল ভট্টাচার্যকেও। এই ছয় জনের মধ্যে নির্মল ও আমি ব্যতীত চারজনই বর্তমানে প্রয়াত, ইতিহাসের সাক্ষী লোপাট। আমার বয়ার্ণনাটির সত্য মিথ্যা ইচ্ছে করলে নির্মলের কাছ থেকে জেনে নিতে পারবেন।
লেখক লিখেছেন, “১৯৮৭ সালে আমি বাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং সুনামগঞ্জ জেলা আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক হিসাবে আট ও বাম পাঁচ দলীয় জোটের এরশাদ বিরোধী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের অংশ হিসাবে সারাদেশে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির ধারবাহিকতায় সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা ঘেরাও কর্মসূচি পালনকালে তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির সুনামগঞ্জের শ্রদ্ধেয় নেতা ও এমপি বাবু প্রসূন কান্তি রায় (বরুণ রায়) সহ আমরা ছয়জনকে সুনামগঞ্জ পুলিশ গ্রেফতার করে জেলে প্রেরণ করে। এই সময় আমাদের সাথে ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির নেতা নিরঞ্জন চৌধুরী (খোকন), নির্মল ভট্টাচার্য, ইকবাল হোসেন কাগজী, বেলায়েত হোসেন ও আমি […]সহ আমরা ছয়জনকে ওই দিন সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সম্মুখ থেকে গ্রেফতার করে।” এই উদ্ধৃতি থেকে তাঁর (লেখকের) নামটা মুছে দিলাম। নামটা আমি নিতে চাই না, তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধামিশ্রিত প্রিয়তার অনুরোধে, এতে কোনও কপটতা নেই। তদুপরি আমি জানি তিনি অসুস্থ। তিনি সুস্থ থাকলে কোনও কথা ছিল না, যা ইচ্ছা তা করা যেতো, ছাড় না দিয়ে। কিন্তু এখন এমন কোনও আচরণ করা উচিত নয় যা তাঁর জন্যে সামান্য পরিমাণে হলেও মনক্ষুণœতার কারণ হয়ে উঠে। তিনি (আমার দাদা) সুস্থ থাকুন, দীর্ঘজীবী হোন এই কামনা করি। কিন্তু দাদার সৃষ্ট ঐতিহাসিক অধ্যাসটুকুর নিরসন অনিবার্য, তা নাহলে এই মিথ্যাটা সত্য রূপে চিরকাল অনাগত লোকসমাজকে প্রতারিত করে চলবে।
দাদা, আপনার কাছে বিনীতচিত্তে ক্ষমাপ্রার্থী। না-পারতে এই কাজ করছি এই জন্য যে, আমি চাই এই সত্যভ্রষ্টতা দোষ দূর হোক, সত্য সামনে আসুক। সত্য যতো ছোটই হোক সত্য সত্যই। সমাজের উপর যে-কোনও ভ্রান্তির অবিমৃষ্যকর অত্যাচার চলতে দেওয়া যায় না এবং মিথ্যাকে অপনোদনের কাজে সময়ক্ষেপণ করাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়, তাতে হয়তো লিখে যাবার সময়টাও পাওয়া যাবে না, এমন হতেই পারে, মুহূর্তের কোনও নিশ্চয়তা নেই। তাই তখনই (যখন জানলাম, ‘এই বইতে এই অধম আমার নামেরও উল্লেখ আছে।’) ভেবেছিলাম এ নিয়ে লিখতে হবে।
ইতিহাসকে সংঘটিত ঘটনার সমীপবর্তী হয়ে উঠতে হয়, তানাহলে জাতি অধ্যাসগ্রস্ততার দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভোগে, যুগযুগান্তর ব্যাপী প্রতারিত হয়। অধ্যাস কখনও ইতিহাসের মর্যাদা পেতে পারে না। যেমন ১৯৪৭-এর দ্বিজাতিতত্ত্ব একটি অধ্যাস। এই তত্ত্বনির্ভর জাতিতত্ত্ব পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন জাতিসত্তা ও পূর্ববাংলার বাঙালি জাতিসত্তাকে একত্রে মিশিয়ে দিয়ে একটি খিচুড়ি জাতিসত্তা পাকিস্তানি (অনেকটা ‘বাংলাদেশি’ জাতিসত্তার মতো) তৈরি করে। এই খিচুড়ি জাতিসত্তা ছিল বাঙালি জাতিসত্তার জনগোষ্ঠীর চেতনায় একটি অধ্যাসায়ুধের সফল আক্রমণ। এটি বাঙালিকে অনেক ভোগিয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত করছে অতুলনীয় মাত্রায়। তেকারণে ইতিহাস অধ্যাস হয়ে উঠলে সেটাকে রুখে দেওয়াই উত্তম। ইতিহাসকে বিকৃত করার অধিকার কারও নেই। ঘটনা সে-যতোটাই তুচ্ছ হোক। সুনামগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশ কীছু বই ইতোমধ্যে লেখা হয়েছে। কিন্তু প্রায় প্রত্যেকটির বিরুদ্ধেই ভিন্ন প্রকারপ্রকরণের ঐতিহাসিক বিচ্যুতির অভিযোগ আছে ভিন্ন ভিন্ন জনের পক্ষ থেকে। এই পর্যন্তই। কিন্তু লিখে কেউ তাঁর বয়ান হাজির করছেন না। আর ব্যতিক্রম দু’একজন বাদে যাঁরা কীছু লিখতে আগ্রহী হচ্ছেন তাঁরা শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করছেন যে, তাঁদের কাছে রাইফেল চালানোর চেয়ে কলম চালানো সতিকার অর্থেই কঠিন ও দুঃসাধ্য এবং প্রমাণ করেছেন, যার কাজ তারে সাজে অন্য লোকের লাঠি বাজে।
সেদিন কী বার কী তারিখ ছিল আমার মনে নেই। নির্মল হয় তো বলতে পারবে। রাজনীতিক কী কর্মসূচি ছিল তাও উল্লেখের প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। তখন বেলা বেশ তেতে উঠেছে, মধ্য দুপুরের দিকে ধেয়ে চলেছে দ্রুত। মল্লিকপুরস্থ উপজেলা কার্যালয়ের গেট দিয়ে নেতারা (বরুণদা, খোকনদা, হুমায়ুনভাই, সৈয়দ কবীর) স্মারকলিপি প্রদানের জন্যে ভেতরে প্রবেশ করলেন এবং এদিকে নেতাদের অনুপস্থিতিতে ধূমপানের অবাধ স্বাধীনতা মিলেছে। ছাত্র-অছাত্র ভিন্ন ভিন্ন দলের কর্মীরা সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের পশ্চিম পাশের উপজেলা কার্যালয়ের গেটসংলগ্ন স্টলগুলোতে চাড্ডা জমিয়ে দিল মুহূর্তেই এবং মশগুল হয়ে গেলো। আমি আর নির্মল সড়কের পূর্বপাশের এক কদম গাছের ছায়ায় বসে গুজুরগুজুরে মত্ত হলাম। একদল (৪০/৫০ জন হবে হয় তো) পুলিশ সুনামগঞ্জ থেকে মার্চ করে আমাদের সামন দিয়ে অতিক্রম করতে করতে উপজেলা গেটের ২০/২৫ হাত দূরে থাকতেই একজন পুলিশের উচ্চকণ্ঠ শোনা গেলো, ‘ধর শালাদেরকে’। আর অমনি পুলিশের দলটির মার্চ করার সুশৃঙ্খল সুন্দর সামরিক ভঙ্গিটি হাতের বেঁটে লাঠি উঁচিয়ে একটি ভয়ঙ্কর দ্রুতগতির বিচ্ছিরি দৌড়ে পর্যবশিত হল, চোখের পলকে প্রচ- হিং¯্ররূপ নিয়ে হামলে পড়লো স্টলের জনজট লক্ষ্য করে। কয়েক মুহূর্তের একটা হুলস্তুল কা-। অর্থাৎ কেউ কেউ ধরা পড়লো আর বাকিরা যে যে-দিকে পারলো পালিয়ে গেলো পঙ্গপালের মতো। তারপর সব সুনসান ফাঁকা, কেউ কোত্থাও নেই, খালি হয়ে পড়ে রইলো স্টলের আসনগুলো। যে-কোনও মুহূর্তে ধরা পড়তে পারি। উপায়ান্তর না দেখে আমরা (আমি আর নির্মল) সড়কের পশ্চিমের বনবিভাগের নার্সারিতে গিয়ে আশ্রয় নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে নিরত হলাম। ততক্ষণে পালাতকেরা কালিপুর গ্রাম অতিক্রম করে জলজঙ্গল ভেঙে নতুনপাড়া অভিমুখে সদলবলে যাত্রা করে দিয়েছে আর পুলিশের উদ্দেশ্যে অশ্রাব্য গালিগালাজের তুবড়ি ছুটছে তাদের মুখ থেকে।
কীছুক্ষণ পরেই নেতারা বেরিয়ে এলেন। আমরা তাঁদের সামনে এলাম। দুজনকে ছাড়া আর কাউকে না দেখে তাঁরা অবাক হয়েছিলেন কিনা মনে নেই। তবে কী হয়েছিল শুনতে ব্যগ্র হয়েছিলেন। বরুণদার মধ্যে পুলিশের হাত ফসকে গেছে যারা তাদেরকে খোঁজার ব্যগ্র ব্যস্ততা প্রবল হয়ে উঠলো। তিনি এদিকে ওদিকে ঘুরাঘুরি করতে লাগলেন, আমরা তাঁর পিছে পিছে। কিন্তু শেষমেশ এখানে খোঁজাখুঁজি করা কোনও কাজের কাজ নয় ভেবে এই ছয়জনের দলটি সুনামগঞ্জের দিকে রওয়ানা হলো। আর এদিকে পুলিশের একটি জিপ একটু পর পর পাশ কেটে অতিক্রম করতে লাগলো একবার মল্লিকপুরের দিকে ও আর একবার সুনামগঞ্জের দিকে যাওয়া-আসার অবসরে, বার বার। আমরা যখন তৎকালের চাঁদমারির (বর্তমান জেলা প্রশাসনের কার্যালয়) সামনাটা অতিক্রম করছি (যেখান থেকে তেঘরিয়ার দিকে একটি রাস্তা চলে গেছে বিদ্যুৎ অফিসের দক্ষিণপাশ দিয়ে), তখন মল্লিকপুর থেকে আগত পুলিশের সেই জিপটি আমাদের ছোট্ট মিছিলটির সামনে এসে থামলো এবং ওসি মহোদয় জিপ থেকে নেমে নিরতিশয় বিনয়ের সঙ্গে বরুণদাকে সদলবলে জিপে উঠার আমন্ত্রণ জানালেন, যেনো তিনি তাঁকে সুনামগঞ্জ পর্যন্ত পৌঁছে দিতে চান নিতান্ত সৌজন্য বশত। বরুণদা প্রশ্ন করলেন, “আমরা কি অ্যারেস্ট ?” ওসি কাচুমাচু মুখ করে বললেন, “কী করবো দাদা ? উপরের হুকুম।” আলাপ এই পর্যন্তই। বরাণদা সুবোধ ছেলের মতো জিপে উঠতে উদ্যত হলেন, সকলেই তাঁকে অনুসরণ করলেন। আমি পেছন থেকে সরে পড়লাম রাস্তার পূব পাশে, পথচারি হয়ে হাঁটতে শুরু করলাম শহরের দিকে এবং নির্মল যথারীতি সন্ধান শুরু করেছে, ‘কাগজী ভাই কই ? কাগজী ভাই কই ?’ প্রশ্নপর ব্যাকুলতা প্রকাশ করে। আমি যখন নির্মলের জন্যে আফসোস করছি মনে মনে, ‘জেলে যাবি যা, তো আমাকে টানছিস কেন ? আহাম্মক কোথাকার!’ তখন একজন হোন্ডাওয়ালা আমার পেছন থেকে সামনে এসে পথ আলগে বলছে, “কই যাও?” খেয়াল করে দেখি মূর্তিমান যমের মতো বিখ্যাত ও দুর্দান্ত সালাম দারোগা খাড়া। কী আর করা ? নিরুপায় হয়ে নির্মলের ডাকে সাড়া দিতেই হলো। গাড়িতে উঠতেই হলো।
পরিশেষে একটি বিষয় জানিয়ে রাখছি। সেদিন কত জন রাজনীতিক কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল আমার মনে নেই। তবে ছয়জন (যাঁরা চাঁদমারির সামনে থেকে গ্রেফতার হয়েছিলাম) ছাড়া আরও কেউ কেউ ভিন্ন ভিন্ন স্থান থেকে সেদিন গ্রেফতার হয়েছিলেন, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কারণ সেদিন দুপুরের পর জেলে আমাদের সঙ্গে প্রিয় বেলায়েত ভাইও (ছাত্র ইউনিয়ন নেতা বেলায়েত হোসেন) ছিলেন, সব কীছু ভুলে গেলেও সে-কথা তো ভুলা যায় না, যিনি জেলে আমাদের (নির্মল আর আমার) ব্যায়াম করাকে ‘হটকারী ব্যয়াম’ বলে অভিহিত করেছিলেন।
- বীর মুক্তিযোদ্ধা রুহুল আমিন তালুকদার আর নেই
- নদীতে নিয়োজিত সেন্ট্রিদের বিরুদ্ধে তাহিরপুরে বিক্ষোভ মিছিল


