‘ইবার ক্ষেত করতাম পারতামনায়’

বিশেষ প্রতিনিধি
হাওরের পানি এবার আগেভাগে নেমে যাচ্ছে। একারণে অনেক বোরো জমি এবছর চাষাবাদ নাও হতে পারে। কৃষকরা বলছেন, গেল জুনের ভয়াবহ বন্যায় জমি-খালে ডুবায় বেশি পলি পড়েছে, পানি আটকে রাখার বাঁধও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, একারণে পানি সহজেই নীচের দিকে নেমে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বশীলরাও একই ধরণের মন্তব্য করেছেন। আবহাওয়াবিদরা অবশ্য বলেছেন, ভাটিতে পানি নেই, এজন্য উজানের পানি দ্রুত নামছে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের দেখার হাওরের উপরের দাইর এলাকার বেশিরভাগ জমিতে গেল বোরো মৌসুমে চাষাবাদ হয়েছে। এবার উপরের দাইর এলাকার জমিতে জমি রোপণের কোন ব্যবস্থা নেই। ওখানকার জমি শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। জমির মাটিতে ফাটল ধরেছে।
রোববার দেখার হাওরে সরেজমিনে গিয়ে চাষাবাদে অপেক্ষাকৃত কম কৃষককে দেখা গেছে। উপরের দাইর এলাকায় এই সময়ে অন্যান্য বছর যে পরিমাণ কৃষক চাষাবাদে থাকতেন, এবার কেন কম জানতে চাইলে হাওরপাড়ের জালালপুর গ্রামের কৃষক সৈয়দ আব্দুল জলিল বললেন,‘অন্যান্য বছর ফাল্গুন মাস পর্যন্ত ক্ষেতও পানি আছিল (ছিল), ইবার (এবার) আশি^ন মাসেই পানি নাই, হাওরের বড় দাইর, পাইলের দাইর, উপরের দাইর ভরাট অইগেছে (হয়ে গেছে), পূর্বপাগলার আফারের বাঁধ বন্যার পানিয়ে (পানিতে) নিচা (নিচু) অইগেছে (হয়ে গেছে), ইতার লাগি (এজন্য) হাওরের পানি গেছেগি (পানি নেমে গেছে), তিন কিয়ার (এক একর) ক্ষেত (জমি) আছিল (ছিল), ইবার ক্ষেত করতাম পারতাম নায় (পারবো না)।’
এমন হতাশা কেবল দেখার হাওরপাড়ের আব্দুল জলিলের নয়। জেলার বেশির ভাগ হাওরের অপেক্ষাকৃত উঁচু জমির হাজার হাজার কৃষকের।
একই এলকার কৃষক এনামুল করিম জানালেন, হাওরে পানি দ্রুত কমে যাওয়ায় চাষাবাদে কৃষকরা উৎসাহ হারিয়েছেন। নদী খাল ভরাট হয়ে শুকিয়ে গেছে। সেচ দেবারও ব্যবস্থা নেই। একারণে বেশির ভাগ জমি পতিত থাকবে (চাষাবাদ হবে না)।
জেলার সুনামগঞ্জ সদর, শান্তিগঞ্জ ও দোয়ারাবাজার উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত দেখার হাওর। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দোয়ারাবাজার ও শান্তিগঞ্জ উপজেলা অংশের দেখার হাওরেও একই অবস্থা।
দেখার হাওর ছাড়াও জেলার বিশ^ম্ভরপুরের করচা, আঙ্গারুলি, জামালগঞ্জের হালি, তাহিরপুরের শনি, মাটিয়ান, দিরাই-শাল্লার ছায়া, কালিকোটা, জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওরসহ বড় হাওরগুলো থেকে এবার পানি দ্রুত নামছে। এ কারণে কৃষকদের মধ্যে চাষাবাদ নিয়ে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে।
বিশ^ম্ভরপুরের কৃষক নেতা স্বপন কুমার বর্মণ বললেন, দুই বছর আগে একবার এমন অবস্থা হয়েছিল। অনেক জমি পতিতও ছিল (চাষাবাদ হয় নি)। এবারও এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জামালগঞ্জের হালির হাওরপাড়ের বদরপুরের কৃষক খোকন মিয়া বললেন, ঢলের পানিতে হালির হাওরপাড়ের আহসানপুরের বাঁধে ভাঙন ও ছাতিধরা স্লুইসগেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ওই পথ দিয়ে পানি সুরমা নদীতে নেমে যাচ্ছে। ধানের চারা এখনো রোপণের উপযোগী হয় নি। এই অবস্থায় পানি নামলে বিপদ হবে। জমি পতিত থাকতে পারে। এই কৃষকের পরামর্শ এখনোই (দুয়েক দিনের মধ্যে) পানি আটকানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বললেন, কৃষকরা জানিয়েছেন, পানি গেল বছরের চেয়ে তিন চার দিন আগে এবার নামতে শুরু হয়েছে। তবে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সেচের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সিলেট অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমেও সেচের ব্যবস্থা করা হবে। আশা করছি চাষাবাদ বিঘিœত হবে না।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বললেন, বন্যায় বিভিন্ন জায়গায় বাঁধ ভেঙেছে। বাঁধ নীচু হয়েছে। এজন্য কোন কোন স্থান দিয়ে পানি নদীতে যাচ্ছে। পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য পরিকল্পিত প্রকল্প নেওয়া জরুরি। হাওরের উপর স্টাডি হচ্ছে। কোন হাওরে পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, যেমন কোথাও রাবারড্যাম, কোন হাওরে রেগুলেটর আবার কোথাও লাগবে পাইপ আউটলেট। এসব উন্নয়ন পরিকল্পিতভাবে হলে এই সমস্যা থাকবে না। পানি প্রয়োজন মোতাবেক আটকানো ও ছাড়া যাবে।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী বললেন, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে দীর্ঘ মেয়াদী খড়া ছিল। ভাটির দিকে বৃষ্টি কম হওয়ায় মেঘনা বেসিনের ডাউনের দিকে অন্যান্য বছরের চেয়ে পানি কম আছে। এজন্য পানি দ্রুত নামছে। অন্যদিকে উজানেও বৃষ্টি হচ্ছে না। তবে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে (২৭ ডিসেম্বর) বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।