‘ঈদ আরক কষ্ট দিয়া গেছে’

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের বানভাসি মানুষেরা কোরবানির ঈদ নয় যেন, আরেক কষ্ট পার করেছেন। ছোট বাচ্চদের নতুন কাপড়ের কান্না সামাল দেওয়া, একইসঙ্গে ঈদের ভালো খাবার-দাবার দিতে না পারার কষ্ট ছিল অনেক পরিবারের মাঝেই। উঁচু সড়ক, আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ঈদ উপলক্ষে কেউ কেউ বাড়ি ফিরেছেন সন্তান সন্ততি নিয়ে। তবে বেশিরভাগেরই চুলোয় আগ্রন জ¦ালাতে পারেন নি এখনো।
সুনামগঞ্জ শহরতলির হাছানবাহার গ্রামের দিনমজুর সাজুল মিয়া ও আনোয়ারা বেগম এর সাত সন্তান। ছয় মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে ছয় মাস হয় দুই মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। ঘরে গলা সমান পানি হলে আশ্রয়কন্দ্রে গিয়ে সন্তান সন্ততিদের নিয়ে জীবন বাঁচিয়েছেন। ঈদের দিন বাড়িতে থাকার আশায় ছেলে- মেয়েদের নিয়ে ঘরে ফিরেছেন এই দম্পত্তি।
ঈদ কিভাবে কাটলো জানতে চাইলে, আনোয়ারা বেগমের উত্তর,‘খাইয়া-বাঁচনের চিন্তাত পড়ছি, ঈদের খবর নিয়া লাভ নাই ভাই, ছোট ছেলেটার (রুহুল আমিন) বয়স সাত, ছোট মেয়েটার (তন্নি) ১০ বছর, কত আছার পটকন (মাটিতে পড়ে কত কাকুতি মিনতি) খাইছে, নয়া কাপড় কিনার লাগি, পরে অনেক বুঝাইয়া-টুজাইয়া কইছি তোর বাপ-কামও যাইতা পাররা না, কাম করতে পারলে দিবানে রে বাবা অখল।’
আনোয়ারা বেগম জানালেন, ঈদের দিন গ্রামের এক আত্মীয় বাড়িতে ছোট একটা গরু কোরবানি দিয়ে কোনভাবে নিয়ত রক্ষা করা হয়েছিল। তারা সামান্য মাংস দিয়েছিল। কোনভাবে এক তরকারি হয়েছে (ছোট ছোট এক পিস এক পিস মাংস দিয়া)। এই এক বেলাই ঈদের দিন খাওয়া হয়েছে।
একই গ্রামের দিনমজুর আলী আহমদ এর পরিবারে ৭০ বছর বয়সি মা ও ১৮ মাসের শিশু সন্তানসহ ৫ জনের সংসার। আলী আহমদ মাকে ঈদের কাপড় কিনে দিতে পারেন নি। আলী আহমদ বললেন, ‘মাইজি (মায়ের) পিড়াপিড়ির লাগি বাইচ্চারে একটা জামা কিইন্না দিছি, ওঠাউ ঈদের কিনা, অন্য বছর গাঁওয়ে ১২-১৩ টা গরু কোরবানি অইতো, সকলেই গোস্ত দিতা, দুই-তিন দিন খাওয়া যাইতো, ই-বছর ৫-৬ টা গরু কোরবানি দিয়া কোন লাখান নিয়ত রক্ষা করা অইছে, এক ছালনের গোস্তও পাইছি না, বন্যার পরে ঈদ আরক কষ্ট দিয়া গেছে ভাই’।
আলী আহমদ জানালেন, কেবল তিনি নয়, হাছনবাহার গ্রামের তাদের হাটির ছালেহ আহমদ, কোরবান মিয়া, চাঁন মিয়া, নুরুল আমিন, খালিক মিয়া, সাজিদুর রহমান, রফিক মিয়াসহ সকলেরই একই অবস্থা। গ্রামের ২৫০ পরিবারের মধ্যে কমপক্ষে ১৬০ পরিবারের অবস্থা একই ধরণের।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার লক্ষণ্রশ্রী ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের ২৪০ বাড়ির মধ্যে হেলেনা, সখিনা, আজিম উদ্দিন, আমিনুল ইসলামের পরিবারসহ ৬০ টি বসতবাড়ি থাকার উপযোগি হয় নি এখনো। ঈদ উপলক্ষে এদের কেউ কেউ বাড়ি ফিরেছেন। গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ সখিনা বেগম তাদের একজন।
সখিনা বাড়ি ফিরলেও ঈদের কোরবানি হয় নি বাড়িতে। বললেন, আগে সকল সন্তানরা মিলে কোরবানি দিতো, এবার হাড়ি, পাতিল, চাল, চুলো কিছুই নেই, কোরবানি দেবারও সামর্থ নেই। ছেলে একটি নতুন কাপড় এনে দিয়েছে, ওটা পড়েছি, সামান্য গোস্ত গ্রামের একজন নৌকা দিয়ে এনে দিয়েছে, কোনভাবে এক তরকারি রান্না করে খাওয়া হয়েছে।
সখিনার পাশে দাঁড়ানো হেলেনা বেগম জানালেন, গেল কোরবানির ঈদে গ্রামে ২০ টি গরু কোরবানি দেওয়া হয়েছিল। এবার তিন পরিবার ছোট গরু কোরবানি দিয়েছে। তারা অন্যদের সামান্য মাংস দিয়েছে। বাচ্চার নতুন কাপড়ছোপড় দেবার চিন্তাও কারো মাথায় ছিল না।
সেনাবাহিনীতে চাকুরি করেন গ্রামের নূর আলম। গ্রামবাসীর এই দুঃসময়ে স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি এসেছেন। বললেন, কোরবানির গোস্তএর চিন্তা করছি না, ভেঙে যাওয়া ঘরবাড়ি মেরামত ও ভেসে যাওয়া আসবাবপত্র ও বাসনকোসনের ব্যবস্থা করে স্বজনদের বাড়ি ফেরানো যায় কি না, সেই চিন্তায় আছি। গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত অন্যরা একইভাবে দুশ্চিন্তায় আছে।
গত ১৬ জুনের ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সুনামগঞ্জের ২৮৮৮ গ্রামের কমপক্ষে ২০০০ গ্রামেই ঈদের দিনে কমেবেশি এমন চিত্র ছিল।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, অন্যান্য সহযোগিতা ছাড়াও ঈদের আগের দিন একলাখ ২০ হাজার মানুষকে ভিজিএফ এর চাল দেওয়া হয়েছে। ঈদের সকাল থেকে নারায়ণগঞ্জের একজন ব্যবসায়ীর সহযোগিতায় একটি বড় গরু এবং তিনি আরেকটি বড় গরু জবাই করে, সঙ্গে চাল, ডাল, তেল, সেমাইয়ের ৫০০ প্যাকেট নিয়ে মানুষের দরজায় দরজায় গিয়ে দিয়ে এসেছেন। তার মন্তব্য সুনামগঞ্জের বেশির ভাগ মানুষের জন্য এবারের ঈদ আনন্দের ছিল না। সরকার নানা রকম সাহায্য নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানোয় কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন তারা।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন শাখার দায়িত্বশীলরা জানান, ঈদের দিনেও ৭০০০ বানভাসি মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে ছিলেন