ইকবাল কাগজী
গত বুধবার, ০৯ নভেম্বর ২০১৭। সকাল ১১টা বেজে ২২ মি.। মামুর ফোন। ফোনালাপের সারার্থ হলো, আগামীকাল সন্ধ্যে সাড়ে ছ’টার দিকে উদীচী সুনামগঞ্জ শাখা একটি সঙ্গীতসন্ধ্যার আয়োজন করেছে, নতুন শিল্পকলা একাডেমির হাসন রাজা মিলনায়তনে। তখনই বোধোদয় হয়েছে যে, মরিবাঁচি যেতেই হবে এবং ইচ্ছের বিরুদ্ধে উচ্চগ্রামে শব্দশুনার বিরক্তিবোধের পদতলে নিজেকে নিঃশর্ত সমর্পণ করা ছাড়া কোনও গত্যন্তর থাকবে না। অর্থাৎ শুনতে হবে গান তো নয় কণ্ঠসঙ্গীতের চেয়ে বাড়া যন্ত্রসঙ্গীতের মূর্তিমান কীছু ঘ্যানর ঘ্যানর।
গিয়াসারর্যামিল্যা আশঙ্কা যে মিথ্যা, সেটা মরমে মরমে টের পেয়েছি এবং টের পেয়ে কীছুটা হলেও প্রীত হয়েছি এবং মামুকে মনে মনে অনেক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছি। আমি গান শুনায় কখনও অভ্যস্থ নই এবং মহৎ কোনও শ্রোতাও নই এবং সাঙ্গীতিক ব্যাকরণে একবারেই ক-অক্ষরগোমাংস। তথাপিও সাম্প্রতিক ‘উদীচী ঘরানা’র এই আসরে বসে গান শুনতে শুনতে অন্তত মনে হয়েছে অনেক অনেক দিন পরে তো কীছু গান শুনলাম, যেনো আমি একদা দেদার গান শুনতাম আর এখন গান শুনতে পাই না।
এশহরে মামুর নামে নাম দুয়েকজন থাকতেই পারেন। যে কারও নাম আলমগীর হতেই পারে। এতে অবাক হওয়ারও কীছু দেখি না, বরং সেটাই নিতান্ত স্বাভাবিক। তাঁরা কেউ আমার মামুটি নন। আমার মামু ডাক্তার সালেহ আহমদ আলমগীর একটাই। মুক্তিযোদ্ধার সরকারি সনদপত্রবিহীন এতদাঞ্চলের প্রবাদপ্রতিম মুক্তিযোদ্ধাদের একজন ডক্তার হারিস উদ্দিনের ছেলে, ‘ডাক্তরের পোলা ডাক্তর’। সে আমার বছর দুয়েকের ছোট হলেও বন্ধুত্ব হতে বাধেনি। আমরা পরস্পরকে মামু বলে ডাকি, সে অনেককাল আগে থেকেই। ডাক্তারির বাইরে সে গানবাজনানাটক ইত্যাদি সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছে এই পড়ন্ত বয়সে এসেও। চিকিৎসার সঙ্গে সঙ্গীতের গাঁটছড়ার গিঁট কখন বেঁধে উঠেছে জানি না, তবে তা সম্ভবত তার ছাত্রত্বের সময়ে সম্ভব হয়েছে এবং দিনে দিনে সে গিঁট আরও বেশি করে আঁটো হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। সমাজে সচরাচর এমন সংস্কৃতিমনস্ক মানুষের দেখা মিলে না। মানবপ্রজাতির মধ্যে এঁরা আসলেই দুর্লভ রকমের। কেউ স্বীকার করুক আর না করুক, তাতে কীছু আসে যায় না, আমি জানি আমার মামু আলমগীর একটাই।
আজকাল প্রায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানই এই শিল্পকলা একাডেমির আধুনিক সুবিধাদিসম্পন্ন মিলনায়তনে হচ্ছে। এমন কী যে অনুষ্ঠান হওয়া উচিৎ খোলা অকাশের নীচে শতসহ¯্র আমজনতার সমাবেশে লোকোৎসবের আমেজে ভরপুর পরিসরে, সেসব মহোৎসবকেও এই শিল্পকলা একাডেমির স্বল্পবিস্তৃতির ঘেরাটোপে বন্দি করা হচ্ছে ইদানিং, এমনকি উদীচীর মতো সংগঠন ভবনবন্দি সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার মনোমুগ্ধকর আয়োজন করছে, যখন সমাজের আরও আরও গভীরে, ঘরের বাইরে গিয়ে সাংস্কৃতিক কর্মকা- পরিচালনার গুরুত্ব অতীতের তুলনায় বেড়েছে বহুগুণে। বলতেই হয়, আজকের অনুষ্ঠান উদীচী ঘরানার সঙ্গে যায় না বা খাপ খায় না, বরং এটাকে বলা যায় একধরনের সাংস্কৃতিক বৃত্তাবদ্ধতা বা বন্দিত্ব, যা উদীচীর প্রতিষ্ঠিত ঘরানার আদর্শবিরোধী। বোধ করি সেজন্যই পরিবেশনার সূত্রধর স্বয়ং আলমগীর ‘মাস তিনেক আগে উদীচীর উদ্যোগে এরকম একটি অনুষ্ঠান’ করার উল্লেখ করে বলেছেন, ‘উদীচীর পরিবেশনায় সাধারণত এর আদর্শিক অবস্থানের একটা প্রতিফলন থাকে। দেখলে বা শুনলেই বুঝা যায় এটা উদীচীর পরিবেশনা। এই ঘরানার একটু বাইরে গিয়ে সাজানো হয়েছিল সে অনুষ্ঠানটি। খুব বেশি বাইরে নয়, কেন্দ্র ঠিক রেখে চয়নভূমিটি একটু বিস্তৃত করা হয়েছিল মাত্র। শেকড় অটুট রেখে শাখা প্রশাখার বিস্তার ঘটানোর মতো আর কী।’
আজ যেখানে উদীচী আসর করছে, এই তো কদিন আগে সেখানেই চার লোককবিকে নিয়ে মহাসমারোহে হয়ে গেলো ‘হাওরপাড়ের গল্প’ বলার আসর। সে এক মহোৎসব, যে মহোৎসব এবার কয়েকজন শহুরে শিক্ষিত, যাকে বলে, বিদগ্ধ নাগরিকের মনোরঞ্জনে নিবেদিত হতে পেরেছে কেবল, বৃৃহত্তর সমাজের বৃহৎ অংশ ‘লোকেষু আয়ত’ অর্থে লোকায়তজনের নয়নশ্রবণমনের পরিতৃপ্তি সাধনে কোনওই ভূমিকা রাখতে পারেনি। ‘শিল্পকলা একাডেমির ভেতরে সংঘটিত এই চরিতার্থতা’ চার লোককবিকে অর্থাৎ লোকসংস্কৃতিকে প্রথমেই লোকরহিত করে তুলা হয়েছে এবং প্রকারান্তরে সর্বস্তরের লোকজনের অংশগ্রহণের সুযোগ লাভের অধিকারকে হরণ করা হয়েছে। লোকোৎসবের উন্মুক্ত আকাশের নীচে অনুষ্ঠানের ঐতিহ্যকে এইভাবে গৃহবন্দি করে লোকবিচ্ছিন্ন করে তুলা আর মানুষের সাংস্কৃতিক অধিকারকে খর্ব করা সমার্থক। বরাবরের মতো লোকোৎসবের যে অনুষ্ঠান মুক্তময়দানেই বেশি খোলতাই পায় সে অনুষ্ঠানকে ভবনবন্দি করে খাঁচার পাখি করে তুলার কর্মপ্রয়াসকে আর যাই ভাবা যাক সেটাকে সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার পরিপোষকতার স্বীকৃতি দেওয়া যুক্তি সঙ্গত হবে বলে মনে হয় না। অমর্ত্য সেন বলেছেন, ‘যখন কোনও বিশেষ গোষ্ঠীর সদস্যরা স্বেচ্ছায় তাঁদের পরম্পরাগত জীবনধারা অনুসরণ করতে চান, অথচ সমাজ সেটা তাঁদের করতে দেয় না, তখন সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হয়।’ (পরিচিতি ও হিংসা, অনুবাদ : ভাস্বতী চক্রবর্তী, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা.লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ : জানুয়ারি ২০১৬, পৃষ্ঠা : ১১৮)। সুনামগঞ্জে লোকোৎসব হয় মাঠেময়দানে, এটাই লোকসংস্কৃতিচর্চার ঐতিহ্য। অথচ তা হতে না দিয়ে, তার ধারাবহিকতা লঙ্ঘন করে অনুষ্ঠানস্থল হিসেবে জুবিলি স্কুলের মাঠকে বিবেচনার বাইরে রেখে শিল্পকলা একাডেমির ঘেরাটোপে চার লোককবিকে নিয়ে ‘হাওরপাড়ের গল্প’ বলার আসরটি করা হলো জাঁকজমকের সঙ্গে এবং প্রকারান্তরে হাওরাঞ্চলের জনসাধারণ বলে বিবেচিত জনগোষ্ঠীকে আক্ষরিক অর্থেই পরম্পরাগত সংস্কৃতিচর্চা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হলো, তাতে কারও দ্বিমত থাকার অবকাশ নেই। সাধারণ মানুষজন এবারের লোকোৎসব উপভোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, লোককবিদের ও লোকসঙ্গীত পরিবেশকদের হাজার হাজার ভক্তরা শিল্পকলা একাডেমির বাইরে ছিলেন কেবল নয়, ব্যর্থমনোরথ হয়ে বাইরে থেকে ফিরে গেছেন। এইভাবে সাধারণ মানুষজনকে তাঁদের নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে বিরত করা সরকারি সাংস্কৃতিক কর্ম পরিচালনার ক্ষেত্রে কতোটা যুক্তি সঙ্গত? এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে। তাই বলি, উচিৎ কিংবা বেশিমাত্রায় যথাযথ হবে লোকসংস্কৃতিচর্চার কর্মপ্রয়াসটি লোকসংস্কৃতির ধারকবাহকদের নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেওয়া এবং তাদের নিয়ন্ত্রণে সংঘটিত কর্মকা- যাতে বৃহত্তর সমাজকে কোনওরূপ অসামজিক ও অনিষ্টকর কীছুর সঙ্গে সম্পৃক্ত না করে ফেলে কিংবা এর প্রভাব সমাজকে পিছিয়ে না দেয়, সেটা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে লোকোৎসব প্রতিপালনের ব্যবস্থাকে সার্বিক সহায়তা প্রদান কিন্তু কীছুতেই তেমন নিয়ন্ত্রণ নয়, যে নিয়ন্ত্রণ লোকসংস্কৃতির বিলোপায়নের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় এবং মানুষের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাকে বিঘিœত করে। লোকোৎসবচর্চাকে ভবনবন্দি করে লোকসংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোত জনগোষ্ঠীকে লোকোৎসবে অংশগ্রহণে বিরত থাকার কার্যকর বাস্তবতা তৈরি করা কোনও কাজের কাজ হতে পারে না। তাছাড়া ভুলে গেলে চলবে না আমাদের সংবিধানের ২৩ অনুচ্ছেদে ‘জাতীয় সংস্কৃতি’ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র জনগণের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার রক্ষণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন এবং জাতীয় ভাষা, সাহিত্য ও শিল্পকলাসমূহের এমন পরিপোষণ ও উন্নয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন, যাহাতে সর্বস্তরের জনগণ জাতীয় সংস্কৃতির সমৃদ্ধিতে অবদান রাখিবার ও অংশগ্রহণ করিবার সুযোগ লাভ করিতে পারেন।’
আজ সন্ধ্যা সাতটার দিকে শুরু হলো যে গানের অনুষ্ঠান, সেটির শ্রোতা লোকোৎসবের মতো আমজনতার বিশাল সমাবেশ নয়, সীমিত সংখ্যক শ্রোতা এর উদ্দিষ্ট, যদিও আয়োজক গণমানুষের সংস্কৃতিমনস্ক সংগঠন উদীচী।
আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে উদীচী এ অনুষ্ঠান করে স্বীয় আদর্শ থেকে কীছুটা হলেও সরে গেছে, হয়ে উঠেছে অনেকটা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে ‘হাওরপাড়ের গল্প’ বলার আসরের মতো লোকবিরহিত। লোকের মুখে তো কেউ কুলূপ এঁটে দিয়ে বসে থাকেনি, সেটা তো খোলাই আছে। সুতরাং দুর্মুখ দোষৈকদর্শী কেউ বলে ফেলতে পারে, উদীচী আজকাল প্রশাসনিক আদর্শে বিনোদনের কিংবা প্রশাসনিক সংস্কৃতিচর্চার অনুসারী হয়ে উঠেছে, এটা উদীচীর আদর্শ-ঐতিহ্যানুসারে একধরনের পশ্চাৎপদতা এবং একটু বাঁকা অর্থে আমলাতান্ত্রিকতার আদর্শিক নেওটামি। এইরূপ একদেশদর্শী মন্তব্য সুনামগঞ্জের তথা সারা দেশের বর্তমান সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিতে কতোটা সমীচীন সেটাও একটা প্রশ্নসাপেক্ষ বিষয় বটে। বাংলাদেশের বর্তমান সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিতের নিরিখে অনুষ্ঠানের সূত্রধর কী বলেছেন সেটা অবশ্যই বিবেচনার বাইরে রাখা সমীচীন হবে না। সঙ্কটাপন্ন এই সময়ের তরুণদের চিন্তা মাথায় রেখে তিনি বলেছেন, ‘শঙ্কার বিষয় হচ্ছেÑ বড়ই প্রতিকূল সময় এখন এদের জন্যে। চারদিকে প্রযুক্তিলব্ধ কতরকমের প্রলোভেন, অপসংস্কৃতির নোংরা হাতছানি, সহজ প্রাপ্তিযোগের কত উদাহরণ। পরিবার, শিক্ষালয়, সমাজ, রাজনীতিÑ সর্বত্র মূল্যবোধের ক্রমবর্ধমান ধ্বস। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রসঙ্গে কিছু বলবো না, কিন্তু এর বাইরে জানার বা শেখার আগ্রহ জন্মায়Ñ তেমন অনুকূল পরিবেশই তো পাচ্ছে না এরা। তাই তো সুস্থ চিন্তায়, সঠিক পথে এদেরকে স্থিতু রাখাটাই এখন বড় চ্যলেঞ্জ। প্রতিকূল এই সময়ে তন্ত্র-মন্ত্রের গুরুপাক তত্ত্ব তাদেরকে কতটা আকর্ষণ করে বা সহসাই করবে এ বিষয়েও সন্দেহ আছে বিস্তর। তাই আমার মনে হয়, শুরুতেই খুব গভীরে না গিয়ে নিজের সংস্কৃতির শেকড়টা তাদেরকে চিনানো দরকার। এরপর শেকড়কে কেন্দ্র করে আশপাশে বিচরণ করুক, সমস্যা নেই। শুধু দেখতে হবে পরাশ্রয়ী হয়ে যেন না যায়, নিজের শেকড়কে ভুলে যেন পরগাছা হয়ে না যায়। তাই সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ওদের সাংস্কৃতিক কর্মকা- পরিচালনার ক্ষেত্রটিকে আদর্শিক বলয়ে আবদ্ধ না রেখে আরও একটু বিস্তৃত করা দরকার কি না ভাবা দরকার।’
সত্যিই তো, ‘শুরুতেই খুব গভীরে না গিয়ে নিজের সংস্কৃতির শেকড়টা তাদেরকে চিনানো দরকার।’ কেবল বিপ্লব বিপ্লব করলেই কেবল বিপ্লব হয় না। একাত্তরের মতো বাঙালি জাতির জীবনে এত বড় আর এত মহৎ বিপ্লব আর একটিও হয়নি। তবু সবকীছু পাল্টে যায়নি। পাল্টে যায়নি এজন্য যে, যে-জন্য ও যাদের জন্য যুদ্ধটি হয়েছিল এবং যারা যুদ্ধটি লড়েছিল তাদেরকে তথাকথিত বিপ্লবী নীতিনির্ধারক ক্ষমতাসীনরা ভুলে গিয়েছিলেন। জানা কথা, উদীচী বিপ্লব বিপ্লব করে চিলচিৎকার পাড়লেই বিপ্লব হয়ে যাবে না। বিপ্লব হতে গেলে যাদের জন্য বিপ্লব করা বিপ্লবী প্রক্রিয়ার সঙ্গে সেই সাধারণ মানুষজনের সম্পৃক্ততা চাই, বিপ্লবী প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতার বাইরে তাদের অবস্থান নির্দিষ্ট হয়ে থাকলে উদীচী কেন কোনও সামাজিক-রাজনীতিক শক্তির পক্ষেই বিপ্লব করা সম্ভব নয়, তার নেতৃত্বে যদি স্বয়ং লেনিন কিংবা মাও সেতুংও থাকেন। বিপ্লব সংঘটনের জন্য আগে চাই সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি, রাজনীতিক পরিপক্কতা, পায়ের তলের মাটির ভিত আরও শক্ত হওয়া চাই। বিপ্লবের পেছনে যে সাংস্কৃতিক শক্তি থাকে সে সাংস্কৃতিক উৎস থেকেও মাঝে মাঝে শক্তি চয়ন করে আনতে হয়, বিপ্লবের প্রস্তুতিকে আরও পরিপূর্ণ করার অভিপ্রায়ে। বিপ্লবোত্তর রাশিয়ায় একটি স্কুল পরিদর্শনে গেলে স্কুলের ছাত্ররা যখন লেনিনকে বলে তারা বিপ্লবী কবি মায়াকোভক্সিকে পড়ে তখন তিনি ছাত্রদেরকে বলেছিলেন যে, মায়াকোভক্সির চেয়ে পুশকিন আরও উত্তম। পুশকিনকেও পড়তে হবে। এই সত্যকে অস্বীকার করার কোনও যুক্তি নেই যে, উদীচীকেও তাই পিছন ফিরে তাকাতে হবে, যেতে হবে রবীন্দ্র-নজরুল-বঙ্কিমের কাছে, সামনের কদমটি আরও ঠিকভাবে ফেলাটি নিশ্চিত করার জন্যে পেছনে তাকাতে হবে। আসরের শুরুতেই ‘কী অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লীজননী …।’ গানটি সমবেত কণ্ঠে যখন ছড়িয়ে পড়লো শ্রোতাটইটম্বুর মিলনায়তনের নীরবতায়, তখন মনে হলো, উদীচী তো ‘যে-জন্য ও যাদের জন্য যুদ্ধটি হয়েছিল এবং যারা যুদ্ধটি লড়েছিল’ তাদের কাছেই ফিরে যাচ্ছে, ফিরে যাচ্ছে পল্লীজননীর কাছে, যেখান থেকে তাকে শুরু করতে হবে সেখানে।
কিন্তু মনে রাখতে হবে, সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে উদীচীর শুরুর পর তার অগ্রযাত্রার একটা দীর্ঘ অতীত ও ঐতিহ্য আছে। আর সে সত্যকে মেনে নিলে ‘উদীচীর শুরু’ আর ‘সুনাগঞ্জের উদীচীর শুরু’ দুইটি পৃথক প্রপঞ্চের সূত্রপাত করে এবং সঙ্গত কারণেই আমাদের বিবেচনাকে অন্যভাবে আলোড়িত করে এবং মেনে নিতে হয় যে, সুনামগঞ্জের উদীচীকে পরিপক্ক হয়ে উঠার কারণেই সামনে এক কদম রাখার আগে দুইবার পেছনে কদম ফেলতে হবে। তাছাড়া ‘চারদিকে প্রযুক্তিলব্ধ কতরকমের প্রলোভেন, অপসংস্কৃতির নোংরা হাতছানি, সহজ প্রাপ্তিযোগের কত উদাহরণ’ এইসব থেকেও উদীচীকে বেঁচে থাকতে হবে এবং বাঁচিয়ে রাখতে হবে চারপাশের মানবিক পরিবেশকে। সেটা চটজলদি কীছু একটা হয়ে যাবার বিষয়ও তো নয়ই, এমনকি নয় খুব একটা সহজ কীছু ।
তারপর আর একটি সত্য হলো ‘ঘরের এই বন্দিত্ব’ অচিরেই কাটাতে হবে সুনামগঞ্জের উদীচীকে। ঘরনাকে ঘরবন্দিত্ব থেকে মুক্তি দিতে হবে। মনে রাখতে হবে ঘরবন্দি ঘরনা সামন্ততান্ত্রিক নাটমন্দিরের মতোই কেবল ভূস্বামীর মনোরঞ্জনের জন্য নিবেদিত এবং সাম্প্রতিককালে তার চরিত্র দাঁড়িয়েছে আমলাতান্ত্রিকতার বাইজিগিরি অর্থাৎ প্রকারান্তরে বিপ্লববিরোধী সংস্কৃতির ধারক। এই ঘরবন্দিত্বের সাংগঠনিক দক্ষতাটা উদীচীকে দেখাতেই হবে। ঘরবন্দি হাওরপাড়ের গল্প করার মতো করে সাঙ্গীতিক-সান্ধ্য-আসর করে করে উদীচীকে ‘হারমোনিয়াম পার্টি’ হয়ে যাওয়া মোটেও মানায় না। সংস্কৃতিচর্চার আসরকে মাঠেময়দানে নিয়ে যাওয়ার সময় বাংলাদেশে অনেক আগেই এসে গেছে, সে চর্চা কীভাবে করতে হয় ইতোমধ্যেই দেখিয়েছে উদীচী। তারপরও দোষৈকদর্শী কেউ বলতেই পারে, একরকম পিছিয়ে পড়ার দলে পড়ে গেছে উদীচী। তেমন দোষৈকদর্শীকে বলে রাখা দরকার, নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো। এই পিছিয়ে পড়া উদীচীই এখনও নিজের সাধ্যমতো উচ্চকণ্ঠে প্রগতিশীলতার কথা, শোষণ মুক্তির কথা, সামাজিক বৈষম্য নিরসনের কথা, সমাজ পরিবর্তনের কথা অবিরাম বলে যাচ্ছে। প্রগতিশীল সংস্কৃতিচর্চার তো উদীচীই পথিকৃত।


