শাহরিয়ার বিপ্লব
৪/৫ দিন আগের কথা। কাকা কেমন আছেন ? জিজ্ঞেস করতেই লম্বা করে শ্বাস নিয়ে স্বভাবসুলভ হেসে বললেন,‘উনাকে জিগাও। উনার হাতে তো আমার ডেথ সার্টিফিকেট। উনি প্রায়ই আমার ডেথ সার্টিফিকেট দিয়ে দেন’।
সেদিন কথাটার অর্থ বুঝলেও কলিজায় দাগ কাটে নাই। গতকাল শনিবার সারারাত ল্যাব এইডের তিন তলায় বসে যখন ভাবছিলাম এই কথাটি, বুকের ভেতর তখন শুধু নোনা জলের ঢেউ। প্রার্থনা করছিলাম, বিধাতা, মানুষের অমানুষিক ইচ্ছার ডেথ সার্টিফিকেটে স্বাক্ষরটা এত তাড়াতাড়ি দিলে?
সিসিইউর ঘরে একে একে খুলে দেয়া হলো সকল যন্ত্রপাতি। তুলা গুঁজে দেয়া হলো নাকে কানে। যেন ভাটির খালবিল ভরাট করা হলো। ডালপালা বীহিন বটবৃক্ষকে যেন মাটিতে শুইয়ে দেয়া হলো। ঘুমিয়ে পড়লো এক বিশাল জীবন্ত সিংহ।
ছোটবেলার দেখা সেন বাবুকে মিলাতে চাইলাম। ৭৯ সালে আমার আব্বা ছিলেন উনার প্রতিদ্বন্দ্বী। সিলেট-১ আসন ছিল জামালগঞ্জ, দিরাই, শাল্লা মিলে। আমার নানার বাড়ির সব লোক ছিল সেন বাবুর ভক্ত। নানার বাড়ি গিয়ে বুঝলাম, সেনবাবু ওই অঞ্চলের নায়ক। শুধু রাজনীতির নয় সবকিছুতেই উনার প্রচ্ছন্ন প্রভাব। বহুরকম মিথ চালু আছে উনাকে নিয়ে। উনার বিরুদ্ধে আব্বা ইলেকশন করছে জেনেও এই নায়ককে দেখার লোভ সামলাতে পারছিলাম না। একদিন নজরুল ভাইকে নিয়ে শ্যামারচর বাজারে গেলাম সেনবাবুর জনসভায়। দূর থেকে দেখা যায়নি বলে কেউ একজন উনার কাছে নিয়ে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিতেই উনি কোলে বসালেন। আমি তো বিস্মিত,অভিভূত। নায়কের কোলে আমি! কি বাবরী চুল, পাঞ্জাবীর কাজ, হাতের নীচ দিয়ে শালের ভাঁজ, কোনায় চিরল ফুল। নাটকীয় বক্তৃতা। যেন তিনি অভিনয় করছেন। মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। হাঁটার কি স্টাইল। সেনবাবু যেন তরুণদের ক্রেজ।
১৯৯১ সালে নজির ভাইয়ের সাথে সংসদের লিফটে উঠছিলাম। সাথে আরো দুইজন প্রতিমন্ত্রী। লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে যাবে এমন সময় দেখি সেনবাবু লিফটের দিকে আসছেন। লিফটম্যান হয়ত প্রতিমন্ত্রীদের চিনতে পারেন নাই। আমাদের সহ সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আপনারা একটু পরে উঠুন লীডার আগে উঠবেন। ভদ্রলোক প্রতিমন্ত্রী মহোদয় ঠিকই নামলেন। সেনবাবু এসে দেখলেন মন্ত্রীসহ সবাই দাঁড়ানো। বুঝলেন বিষয়টা। লিফটম্যানকে বললেন ‘এই মিয়া আমি অইলাম বিরোধী দলের এমপি, উনারা দুইজন মন্ত্রী। মন্ত্রী মহোদয় বললেন, দাদা আমরা ওয়ান টাইম চাকুরী নিছি, কিন্তু আপনি হইলেন লীডার। লীডার তো সারাজীবনের।’
গত আমলের পার্লামেন্টে কি একটা আইন পাশের পর বিরোধী দল চিৎকার চেঁচামেচি করতে লাগলেন, কালো আইন, কালো আইন বলে। তিনি তখন বললেন, ‘আইন তো কালো অক্ষরেই লেখা হয়। আপনারা চাইলে লাল অক্ষরেও লিখে দিতে পারি। একটু পরেই ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদকে দেখে বললেন, তোমার কালাকোট সব চাইতে বেশি কালা।’
আজ ভাবি চাকুরী করতে পারেন নাই বলেই হয়তো সারাজীবন ক্ষমতার স্বাদ নিতে পারেন নাই এই অভাগা মানুষটি। কেউ বলেন সেনবাবু খুবই সৌভাগ্যবান। আমি বলি খুবই দুর্ভাগা। তা না হলে অনেকে দু’বার একবার এমপি হয়েই মন্ত্রী হতে পারেন, আর সেনবাবু বারবার বিরোধী দলে(!)। সংবিধানের প্রণেতাদের একজন হয়েও এমপি ছাড়া সাংবিধানিক ক্ষমতার বাইরে ছিলেন সারাজীবন। স্পষ্টকথা আর চাটুকারিতাবিহীন রাজনৈতিক চরিত্রের কারণে সারাজীবন উল্টা¯্রােতে নৌকা বাইলেন।
গতবছর ল্যাব এইডে কোন একসময় কাকাকে দেখতে এসেছিলাম। এটেন্ডেন্টের কথা না শুনে উনার রুমে ঢুকে পরায় কাকী খুব রাগ করলেন। পরের দিন আবার দেখতে গেলে কাকা গল্প করে তা পুষিয়ে দিলেন। ‘লাম্বা তালগাছ, দূরের কাছারিঘর, পালের নাও, হুগলা বন এগুলু আমায় টানে। হা ডু ডু খেলতে ইচ্ছা হয়, ডুব দিয়ে হাওরে গোসল করি না কত বছর….স্পীড বোটে যখন যাই, পানির মধ্যে হাত রেখে নেমে পড়তে ইচ্ছা হয়। ঢাকায় শুয়ে মাঝে মাঝে আমি নিজেরে জিগাই, এইডা কি আমি? আসলেই কি আমি?? কাকী থামিয়ে দিলেন। আর না। জোর করে আমাদের বিদায় দিলেন। থাকলে নাকি শুধু গল্প হবে।
আজ। তিনিই গল্প। তাকে নিয়েই গল্প। ভোরের আলো ফুটে এলো। এ এক অন্য ভোরের আকাশ। এ আকাশে সন্ধ্যার ছায়া। অন্যরকম সূর্যোদয় যেন মেঘের চেয়েও কালো। দিরাই শাল্লা শুধু নয় পুরা ভাটি বাংলায় যেন বেদনার সুর। দিরাই শাল্লার আকাশে সূর্য উঠবে- সুর্য ডুববে। রোদ বৃষ্টি ধারাবাহিক চলবে। শীত-বর্ষা আসবে যাবে। কিন্তু এই সূর্য আর উদিত হবে না। এই রোদের সকাল আর আসবে না। এই হিমেল হাওয়া আর বইবে না। এই বৃষ্টি আর ঝরবে না। এই বসন্তের হাওয়া আর কোনদিন মন রাঙাবে না। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত নামের তারকা আর কোনদিন এই আকাশে উদিত হবে না। মানুষ যাবে, মানুষ আসবে। রাজনীতি থাকবে, রাজনীতিবিদও থাকবেন। থাকবেন না শুধু বিষ খাওয়া, বিষে পোড়া এই মানুষটি।
লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় ছাত্রলীগ সুনামগঞ্জ জেলা শাখা।


